রেজাউল রেজা >>>আমন ধান উঠেছে মাসখানেক আগে। ভালো ফলনের পরেও গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতিকেজি চালের পেছনে ভোক্তার খরচ বেড়েছে ৪ থেকে ৬ টাকা। এলাকা ও দোকান ভেদে খরচ আরও বেশি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, চালের বাজারে ভোটের প্রভাব কাটেনি। তবে খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমনের ভরা মৌসুমে এ হারে দাম বাড়া অস্বাভাবিক। এবারে নির্বাচন ঘিরে অসাধু ব্যবসায়ীরা বেশি করে মজুদ করেছে। বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও মিলগুলো সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করছে। এ সুযোগে আগের কেনা চালও বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। এই চিত্র উঠে এসেছে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অভিযানে।
গত বৃহস্পতিবার রাজধানীতে অভিযান চালায় খাদ্য মন্ত্রণালয়। যাত্রাবাড়ীর দিদার রাইস এজেন্সিতে দেখা যায়, এরফান মিনিকেট চাল ৬৯ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ম্যানেজার রবিউল হোসেন চালান দেখিয়ে বলেন, ১৫ জানুয়ারি এ চাল ৬৫ টাকা কেজি দরে কেনা হয়েছে। পরিবহণসহ অন্যান্য খরচের পর ৬৯ টাকা বিক্রি করা হচ্ছে।
অভিযানে থাকা কর্মকর্তারা আগের চালান দেখতে চাইলে বেরিয়ে আসে থলের বিড়াল। কিছুদিন আগের চালানে দেখা যায়, ৬১ টাকা কেজি দরে কেনা চাল এখনো গুদামে ভর্তি। সেগুলোও ৬৯ টাকা বিক্রি হচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটিকে মৌখিকভাবে সতর্ক করে ৬৫ টাকা দরে বিক্রিতে বাধ্য করা হয়। মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. লুৎফর রহমান বলেন, প্রথমবার হওয়ায় আমরা সতর্ক করেছি। পরবর্তীতে আবার অনিয়ম পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ঘটনার পরও যাত্রাবাড়ী চাল আড়ত মালিক সমিতির সভাপতি মঞ্জুর আলম দাবি করেছেন, ‘দাম আমাদের হাতে বাড়ছে না।’ তিনি বলেন, ‘চালের মোকামে দাম বেড়েছে। ফলে এখানেও তার প্রভাব পড়েছে। মোকামে দাম কমলে এখানেও আপনা থেকে কমে যাবে।’
সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এক মাসের ব্যবধানে সরু চালের দাম ৫ দশমিক ৩৮, মাঝারি চাল প্রায় ৩ শতাংশ এবং মোট চালের দাম প্রায় ৪ শতাংশ বেড়েছে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ বলছে, গতকাল শুক্রবার রাজধানীর বাজারে প্রতি কেজি সরু চাল (মিনিকেট ও নাজিরশাইল) ৬২ থেকে ৭৫ টাকা, মাঝারি চাল (পাইজাম ও লতা) ৫২ থেকে ৫৬ টাকা এবং মোটা চাল (স্বর্ণা ও চায়না ইরি) ৫০ থেকে ৫২ টাকায় বিক্রি হয়েছে। গত মাসে যা ছিল যথাক্রমে ৬০ থেকে ৭০ টাকা, ৫০ থেকে ৫৫ টাকা এবং ৪৮ থেকে ৫০ টাকা।
রাজধানীর সেগুনবাগিচা, যাত্রাবাড়ী, হাতিরপুল বাজারসহ কয়েকটি খুচরা দোকান ঘুরে ভিন্ন চিত্র মিলেছে। এসব বাজারে সরু মিনিকেট চালের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৭৪ টাকা পর্যন্ত। সপ্তাহ দুয়েক আগে যা ছিল ৬৫ থেকে ৬৮ টাকা। অর্থাৎ কেজিতে ৬ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মাঝারি বিআর-২৮ চালের কেজিতে ৪ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়ে ৫৬ থেকে ৬০ টাকা বিক্রি হচ্ছে এবং মোটা স্বর্ণা চালের কেজিতে ৩ টাকা পর্যন্ত বেড়ে সর্বোচ্চ ৫৫ টাকাতেও বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে ইতোমধ্যে ব্যবসায়ীদের কঠোর বার্তা দিয়েছেন তিন মন্ত্রী। মজুদদারদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলে হুশিয়ারি দিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী উপাধ্যক্ষ ড. মোঃ আব্দুস শহীদ। একই হুশিয়ারি দিয়েছেন বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম টিটু। আর খাদ্যমন্ত্রী সাধনচন্দ্র মজুমদার বলেছেন, প্রয়োজনে মজুদদারির বিরুদ্ধে ক্রাশ প্রোগ্রাম পরিচালনা করা হবে। একই সঙ্গে চার দিনের মধ্যে চালের দাম কমিয়ে আনতে বলেছেন তিনি।
কিন্তু বাজারে চালের দামে উত্তাপ কমছে না। মিলাররা এখনো বাড়তি দামে বিক্রি করছেন বলে জানিয়েছেন রাজধানীর পাইকারি ব্যবসায়ীরা। কারওয়ানবাজারের লাকসাম ট্রেডার্সের ব্যবসায়ী মোশারফ হোসেন বলেন, আমরা তো কমে পাচ্ছি না। আজ খোঁজ নিয়েছি, দামে কোনো হেরফের হয়নি। কোনো কোনো মিলার কমালেও তা ১-২ টাকা। কিন্তু নির্বাচনের পর দাম তো বেড়েছে ৬-৭ টাকা। প্রতিবার এমনটাই হয়। বাড়ে ৬ টাকা কমে ১ টাকা। বরিশাল রাইছ এজেন্সির ব্যবসায়ী হাসিব বলেন, নতুন করে চাল কেনা বন্ধ রেখেছি। কারণ অভিযান হলে উল্টো বিপদে পড়তে হয়। কম দামে পেলে তখন কিনব।
পাইকারি ব্যবসায়ী জানান, কৃষক থেকে স্থানীয় মধ্যস্বত্বভোগী, মিল মালিক, আড়ত, রাজধানীর পাইকারসহ ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে পাঁচ হাত বদল হয়। এর মধ্যে নানা মারপ্যাঁচে দাম বেড়ে যায়। আগে বড় কয়েকটি মিল বাজার নিয়ন্ত্রণ করত। এখন বড় কয়েকটি করপোরেট প্রতিষ্ঠান বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।
চালের বাজারে অস্থিরতা ঠেকাতে এসব প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণের কোনো বিকল্প দেখছেন না ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান। তিনি বলেন, চালের বাজারে এখন যেটা করা হচ্ছে সেটা তদারকি মাত্র। সরবরাহ ব্যবস্থার একেবারে গোড়া থেকে শুরু করে সব পর্যায়ে সরকারের নজরদারি থাকতে হবে। প্রয়োজনে আমদানিতে যেতে হবে। সেখানে শুল্ক ছাড় দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি মুদ্রাস্ফীতি কমাতে মুদ্রানীতি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নীতিতেও নজর দিতে হবে।
তবে মিল মালিকরা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, ধানের দাম বেশি হলে কৃষক লাভবান হয়। বাংলাদেশ অটো, মেজর ও হাসকিং মিল মালিক সমিতির সিনিয়র সহসভাপতি লায়েক আলী বলেন, গত মৌসুমের থেকে এবার ধানের দাম বস্তাপ্রতি (৪০ কেজি) অন্তত ২০০ টাকা দাম বেড়েছে। এই কারণে চালের বাজার চড়া রয়েছে। তিনি আরও বলেন, এবার আমার ধান সংগ্রহ কম। বৈঠকে মন্ত্রী দাম কমাতে বলেছেন। মিলাররা চেষ্টা করছেন।
মন্তব্য