আব্দুল্লাহ আল মারুফ।। চট্টগ্রাম: ঈদের আনন্দ মানেই নতুন জামা, সেমাইয়ের সুবাস আর পরম আপনজনের সান্নিধ্য। কিন্তু যাদের ডাকার মতো কেউ নেই, সেই পরিচয়হীন শিশুদের ঈদের দিনটি কেমন কাটে? সেই নিভৃত শিশুদের এক চিলতে হাসি উপহার দিতে ঈদের সকালে চট্টগ্রামের রউফাবাদ এলাকার ‘সরকারি ছোটমনি নিবাস’-এ হাজির হলেন মানবিক জেলা প্রশাসক (ডিসি) জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তাঁর আগমনে মুহূর্তেই বিষণ্ণ সেই কক্ষগুলো মুখরিত হয়ে ওঠে আনন্দের কলকাকলিতে।
রউফাবাদের এই নিবাসের দেয়ালে রঙিন আঁকিবুঁকি, এক কোণে ছড়ানো খেলনা আর ছোট ছোট বিছানা। এখানে বড় হচ্ছে ১৬টি শিশু, যাদের অনেকেরই নেই কোনো পারিবারিক পরিচয়। কেউ কুড়িয়ে পাওয়া, কেউবা আইনি মারপ্যাঁচে বিচ্ছন্ন। তাদের কাছে ঈদ মানে অন্য দশটা দিনের মতোই, যদি না বাইরের কেউ মমতার হাত বাড়িয়ে দেয়।
শনিবার (২১ মার্চ) সকালে ডিসি জাহিদুল ইসলাম মিঞা যখন উপহারের ব্যাগ নিয়ে ভেতরে ঢুকলেন, তখন যেন দাপ্তরিক পরিচয় দরজার ওপাশেই পড়ে রইল। সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন নতুন জামা, সুস্বাদু ফল আর ঝকঝকে নতুন নোটের সালামি।
শিশুরা প্রথমে কিছুটা জড়তা নিয়ে তাকিয়ে থাকলেও, জেলা প্রশাসকের আন্তরিকতায় দ্রুতই সেই দূরত্ব ঘুচে যায়। ছোট ছোট আঙুলে নতুন টাকা ধরার আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে সবার মাঝে। তবে দিনের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী মুহূর্তটি তৈরি হয় যখন জেলা প্রশাসক দুই শিশুকে কোলে তুলে নেন।
পাচার মামলার শিকার ইসরাত জাহান রক্সির সন্তান, যাকে গত বছরের জুনে এখানে আনা হয়। ২০২৪ সালে জন্ম নেওয়া এই শিশুটি তার বাবার পরিচয় জানে না।
ফেনীর সোনাগাজী থেকে পাচারকারীদের হাত থেকে উদ্ধার হওয়া মাত্র দুই মাস বয়সী এক শিশু।নিজের দুই সন্তানের মতোই পরম মমতায় তাদের বুকে জড়িয়ে ধরেন ডিসি। অনিশ্চিত অন্ধকার থেকে আসা এই শিশু দুটির জন্য সেই মুহূর্তটি ছিল নিঃশর্ত স্নেহের এক বিরল উদাহরণ।
প্রশাসনের আড়ালে এক দরদী মানুষ
ছোটমনি নিবাসের অফিস সহকারী নূর জাহান আপ্লুত কণ্ঠে বলেন,
“অনেকেই আসেন, কিন্তু এভাবে সময় দেন না। ঈদের দিন পরিবার ছেড়ে এখানে এসে শিশুদের কোলে নেওয়া—এটা আমরা আগে কখনো দেখি নাই। উনার চোখের মমতা বলে দিচ্ছিল তিনি এখানে প্রশাসক হিসেবে নন, একজন বাবা হিসেবে এসেছেন।”
ঘরের একপাশে যখন নতুন জামা নিয়ে শিশুদের উল্লাস, অন্যপাশে তখন এক নীরব প্রশান্তি। ১৬ জন শিশুর প্রত্যেকেই হয়তো কোনো না কোনো অনিশ্চয়তা নিয়ে এখানে এসেছিল, কিন্তু চট্টগ্রামের এই ছোটমনি নিবাসে তারা শিখছে নতুন করে বাঁচতে।
জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞার এই উদ্যোগ প্রমাণ করল, পদের চেয়েও বড় পরিচয় মানুষ। যেখানে কোনো প্রশ্ন নেই, কোনো বিচার নেই—আছে শুধু নিরাপদ একটি কোল। উৎসবের এই দিনে পরিচয়হীন শিশুদের কাছে তিনিই হয়ে উঠলেন সবচেয়ে বড় আশ্রয়।


মন্তব্য