আনোয়ার হোসেন,কিশোরগঞ্জ (নীলফামারী)প্রতিনিধি >>> কালের বির্বতনে ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় নানা রং,বাহারি ডিজাইনের প্লাস্টিক- লোহা-স্টিল-মেলামাইন পণ্যের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্যবাহী মাটি ও সিলভরের হাঁড়ি-পাতিল ঝুলিয়ে রাখার অপরিহার্য উপকরণ শিকা। এটি পল্লি গ্রামের নারীদের হাতে বুননের লোকজ ঐতিহ্য ও লোক কুটির শিল্পের একটি অন্যতম নিদর্শন এবং গৃহস্থালির বহুল কাজে ব্যবহৃত ঐতিহ্যবাহী উপকরণ। যা একসময় গ্রামীণ জীবনে শিকা একটি অপরিহার্য উপকরণ ছিল। আর সরঞ্জামবিহীন যুগে গ্রামবাংলার প্রতিটি ঘরে এর ব্যাপক কদর ও ব্যবহার ছিল। এ শিকা মূলত এক ধরনের কারুকাজ খচিত পাটের আঁশের তৈরি থলেসদৃশ্য ঝুলন্ত তাক।এটি ঘরের বেড়ায় ও সিলিংয়ে ঝুলিয়ে ব্যবহার করার একটি জনপ্রিয় ও নিরাপদ মাধ্যম ছিল। কিন্তু সময়ের বির্বতনে রান্নার ঘরে ঘরে আধুনিক সরঞ্জাম চলে আসায় এর কদর নেই বললেও চলে। অঞ্চল ভেদে বিভিন্ন নামকরণ করা হলেও নীলফামারীর কিশোরগঞ্জে ‘শিকিয়া’ নামে পরিচিত, যা গ্রামবাংলার সংসার অনুরাগী ও শিল্পমনা নারীরা সোনালি আঁশ ও নানা রং-বেরংয়ের কাপড় ও কাগজের টুকরোর সংমিশ্রণে রকমারী শিকা তৈরির একমাত্র কারিগর ছিল। এ শিকার থলে স্তর বাই স্তর মাটি ও সিলভরের হাঁড়ি-পাতিলের রান্নার সরঞ্জাম ও খাদ্যসামগ্রী, শস্যদানাসহ গৃহস্থালি নানা জিনিসপত্র পরিপাটি ও নিরাপদে ঝুলিয়ে সংরক্ষণ করা হতো। এর বিশেষ গুরুত্ব হিসেবে রান্না করা খাদ্যসামগ্রীর হাঁড়ি-পাতিল শিকায় ঝুলিয়ে রাখায় কুকুর, বিড়াল, মশা-মাছি, তেলাপোকা, টিকটিকির উপদ্রুব থেকে নিরাপদ রাখার অন্যতম মাধ্যমও ছিল। এছাড়া পরিবহনে শিকার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।সেই সময়ে পলিথিন ও শপিং ব্যাগের প্রচলন না থাকায় নতুন আত্মীয় স্বজন-কনে-জামাতা ও বেয়াই-বিয়ানির বাড়িতে মাটির খুঁটি-থালায় গরু-মহিষের দইসহ মিষ্টি, মাণ্ডা-মিঠাই এ শিকায় ঝুলিয়ে হাতে কিংবা বাইসাইকেলের হাতলে পরিবহন করে নিয়ে যাওয়া হতো। শুধু কি তাই, শিকায় ফুলের টবসহ নানা নান্দনিক জিনিস ঝুলিয়ে রিসোর্ট, ঘর ও বারেন্দার সৌন্দর্যবর্ধনে এর জুড়ি মেলাভার, যা শহর জীবনে এখনো এরকমের দৃশ্য চোখে পড়ে। এতে প্রতীয়মান হয় যে, বাঙালির প্রাত্যহিক জীবনে শিকার ভূমিকা ও গুরুত্ব অপরিসীম। জানা গেছে, একসময় গ্রামীণ নারীরা ঘর সংসার সামলিয়ে অবসরে মনের মাধুরী মিশিয়ে সুক্ষ হাতের নিখুঁত গাঁথুনির শৈপ্লিক ছোঁয়ায় সোনালি আঁশ দিয়ে চুলের বেনীর মতো পাকিয়ে ও স্তর বাই স্তরে গিঁট দিয়ে থলের মতো বুনন করত সাধারণসহ নানা আকারের নানা রং-বেরঙের দৃষ্টিনন্দন শিকা। আর প্রতিটি ঘরে ঘরে এর ব্যবহার ছিল চোখে পড়ার মতো।নারীরা বর্ষকালের ঘরবন্দি জীবনে শিকা বুননের কর্মযঞ্জে মেতে উঠত। অনেক নিম্নআয়ের মানুষ এ কুটির ও হস্তশিল্পের ওপর নির্ভর করে সচ্ছলভাবে সংসার চালাত। এখন আধুনিক প্রযুক্তির যুগে আরএফএলসহ বিভিন্ন নামিদামি কোম্পানির রং-বাহারি প্লাস্টিক-লোহা, স্টিলে আলমিরা, র্যাক-তাকের ভিড়ে শিকা এখন সত্যিকারের শিকায় উঠে গেছে। ঠাঁই হয়েছে লোক জাদু ঘরে ও বইয়ের পাতার প্রচ্ছেদে প্রচ্ছেদে। এতে এক গ্রাম তো দূরে থাক, কুড়ি গ্রামেও এর দেখা মেলাভার। কালেভদ্রে এর দেখা মেলে উপজেলার প্রত্যন্ত ইউনিয়ন রণচন্ডি বাফলা গ্রামের বাসিন্দা গৃহবধূ মায়া বেগমের বসত ঘরে। এ সময় দেখা গেছে, ওই বসতঘরের আড়ার সঙ্গে ঝুলছে প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের হাঁড়ি ও হস্তশিল্পের ২টি শিকা।তিনি বলেন, ছোট্ট বেলায় দেখেছি দাদি-নানিরা পাটের আঁশ দিয়ে শিকা তৈরি করে তাতে মাটির হাঁড়ি-পাতিলসহ গৃহস্থালি নানা জিনিস সযত্নে সংরক্ষণ সাজিয়ে রাখত। আগে যেমন ছিল পাটের আবাদ, তেমনি ছিল ঘরে ঘরে এর ব্যবহার। এখন পাটের আবাদ তেমন না থাকার পাশাপাশি সংসারের ব্যস্ততার কারণে শিকা তৈরি করা হয় না। অন্যদিকে বিভিন্ন কোম্পানির স্টিল-লোহা, প্লাস্টিকের আলমিরা, র্যাক, তাক সহজলভ্য ও সহজ কিস্তিতে হাতের দোরগোড়ায় মেলায় সবাই ঝুঁকছে সেদিকে। আধুনিকতার জোয়ারে মানুষ এখন শিকা তৈরিতে সময় ব্যয় না করে ওই পণ্যে সামগ্রী ব্যবহারে মেতে উঠেছে। যে শিকা ছাড়া হাঁড়ি-পাতিল ঝুলিয়ে রাখার বিকল্প কোনো চিন্তাই করা যেত না, সেই শিকার অস্তিত্ব আজ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর ব্যাপার। যতই হোক, এ শিকা গ্রামীণ সমাজ সংস্কৃতির একটি অপরিহার্য উপকরণ ও নারী শিকড়ের একটি ঐতিহ্যের অংশ, যা স্মৃতি ও ঐহিত্য হিসেবে আজও ধরে রাখছি।এ বিষয়ে উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির সভাপতি ইউএনও প্রীতম সাহা বলেন, গ্রামীণ শিল্পমনা নারীরা নানা হস্তশিল্পের মাঝে শিকা বা শিকা তৈরির অন্যতম কারিগর। নানা শিল্প কর্মের মাঝে লুকিয়ে আছে বাঙালি নারী সমাজের বৈচিত্র্যময় স্মৃতি। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় তাদের মেধা মননে গড়া নানা লোকজ ঐতিহ্যের সঙ্গে শিকাও হারিয়ে যাচ্ছে। তবে শিকাসহ তাদের নানা হস্তশিল্প কর্ম যাতে হারিয়ে না যায়, এজন্য উপজেলা মহিলা অধিদপ্তরে আওতায় কুটির শিল্পের সঙ্গে জড়িত নারীদের নানা ট্রেডে প্রশিক্ষণ ও উদ্ধুদ্ধ করা হচ্ছে। আগামী প্রজন্মকে এর সঙ্গে পরিচয় ঘটাতে তা সংরক্ষণের যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণসহ বিভিন্ন উৎসবে পার্বণে মেলার আয়োজন করে শুধু শিকা নয়, নানা হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য তুলে ধরা হবে।


মন্তব্য