মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম রূপগঞ্জ,নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি।
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে আগামী ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হতে যাচ্ছে শারদীয় দুর্গোৎসব। উপজেলার তারাব, ভুলতা, সাওঘাট, গোলাকান্দাইল, মুড়াপাড়া, বানিয়াদি, কাঞ্চন, পিতলগঞ্জ ও পূর্বাচলসহ বিভিন্ন এলাকায় এবার ৫৬টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। উৎসবকে ঘিরে প্রতিমা নির্মাণ, প্যান্ডেল তৈরি, আলোকসজ্জা ও আনুষঙ্গিক প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন মৃৎশিল্পী ও পূজা উদযাপন কমিটির সদস্যরা। অন্যদিকে, পূজামণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা এবং প্রশাসনিক মনিটরিংয়ের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।তবে কয়েক দিনের বৃষ্টিতে প্রতিমা তৈরির কাজে কিছুটা বিঘ্ন ঘটেছে। মাটি শুকাতে বিলম্ব হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে বাড়তি শ্রম দিতে হচ্ছে কারিগরদের। এমন পরিস্থিতিতেও সময়মতো প্রতিমা প্রস্তুত এবং উৎসবের আয়োজন সম্পন্ন করতে আশাবাদী শিল্পী ও আয়োজকেরা। বৃষ্টিতে প্রতিমা তৈরিতে বাড়তি চাপ*উপজেলার বিভিন্ন প্রতিমা তৈরির কর্মশালা ঘুরে দেখা যায়, কোথাও বাঁশ ও খড় দিয়ে প্রতিমার কাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে, কোথাও চলছে মাটির প্রলেপ দেওয়ার কাজ। কোনো কোনো কর্মশালায় মাটির কাজ শেষে প্রতিমার মুখাবয়ব, সূক্ষ্ম কারুকাজ, রং ও অলংকার সংযোজনের প্রস্তুতি চলছে। সময়মতো প্রতিমা সরবরাহ নিশ্চিত করতে অনেক কারিগরকে দিন-রাত পরিশ্রম করতে হচ্ছে।মৃৎশিল্পীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিমা নির্মাণ একটি ধারাবাহিক ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। প্রথমে বাঁশ ও খড় দিয়ে কাঠামো তৈরি করা হয়। এরপর কয়েক ধাপে মাটি প্রয়োগ করে দেবদেবীর অবয়ব গড়ে তোলা হয়। মাটি যথাযথভাবে শুকানোর পর সূক্ষ্ম কারুকাজ, রং, অলংকার ও সাজসজ্জার কাজ সম্পন্ন করা হয়। সবশেষে আঁকা হয় দেবীর চোখ-মুখ। প্রতিটি ধাপে আবহাওয়া, কারিগরি দক্ষতা ও পর্যাপ্ত সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।মৃৎশিল্পী শ্যামল পাল বলেন, “আমি আর আমার ভাই মিলে এবার ১৭টি প্রতিমা তৈরির কাজ করছি। অনেক জায়গায় শুরুতে পূজার আয়োজন নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত বদলানোয় কাজ বেড়ে গেছে। আমরা চেষ্টা করছি সময়মতো সব প্রতিমার কাজ শেষ করতে।”কারিগর পরিমল পাল বলেন, “বৃষ্টির কারণে কয়েক দিন কাজ পিছিয়ে গেছে। এখন রাত-দিন মিলিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। ঘুম কম হলেও মন ভরে যাচ্ছে। প্রতিমার চোখ-মুখে যখন প্রাণ আসে, তখন সব কষ্ট ভুলে যাই।”শিল্পী কাজল পালের ভাষ্য, একটি প্রতিমা তৈরি করতে সাধারণত চার থেকে পাঁচ দিন সময় লাগে। কাঠামো নির্মাণ থেকে শুরু করে মাটি শুকানো, রং করা ও সাজসজ্জা—প্রতিটি পর্যায়ে সতর্কতা প্রয়োজন। পূজার নির্ধারিত সময়ের আগেই সব প্রতিমার কাজ শেষ করতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি। ৫৬ মণ্ডপে সাজসজ্জা, বাড়ছে উৎসবের আমেজ*দুর্গোৎসব সামনে রেখে রূপগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় পূজামণ্ডপের অবকাঠামোগত প্রস্তুতি দ্রুত এগিয়ে চলছে। কোথাও বাঁশের কাঠামোর ওপর প্যান্ডেল তৈরি হচ্ছে, কোথাও বসানো হচ্ছে বৈদ্যুতিক বাতি ও আলোকসজ্জার সরঞ্জাম। পাশাপাশি মাইক, দর্শনার্থীদের চলাচলের ব্যবস্থা এবং ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পরিচালনার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছেন আয়োজকেরা।পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ সড়কের আশপাশের মণ্ডপগুলোতে উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছে। পূজাকে কেন্দ্র করে নতুন পোশাক কেনাকাটা, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ এবং মণ্ডপ পরিদর্শনের পরিকল্পনা করছেন অনেকে। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বয়স্কদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে উৎসাহ।তবে উৎসবের প্রস্তুতির পাশাপাশি দর্শনার্থীদের নিরাপদ চলাচল, ভিড় ব্যবস্থাপনা, বৈদ্যুতিক সংযোগের নিরাপত্তা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বড় জনসমাগমের সময় এসব ক্ষেত্রে আয়োজক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত তৎপরতা প্রয়োজন। সিসিটিভি, আনসার ও স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে নজরদারি*দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্ন রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম আব্দুল্লাহ বিন শফিক।তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি আনসার সদস্য, স্বেচ্ছাসেবক ও জনপ্রতিনিধিরা সার্বক্ষণিক নজরদারিতে থাকবেন। প্রতিটি পূজামণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে এবং নিয়মিত মনিটরিং করা হবে।ইউএনও আরও জানান, আজান ও নামাজের সময়ের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্মান বজায় রেখে পূজা-অর্চনা পরিচালনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড কিংবা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে শুধু ক্যামেরা স্থাপন নয়, সেগুলোর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সক্রিয় উপস্থিতি এবং অভিযোগ বা জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। উৎসব চলাকালে এসব ব্যবস্থার বাস্তবায়ন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।রূপগঞ্জ উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বিধান কৃষ্ণ রায় বলেন, উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। সবার সহযোগিতায় শান্তিপূর্ণ ও আনন্দঘন পরিবেশে দুর্গোৎসব উদ্যাপন করতে পারবেন বলে তাঁরা আশাবাদী।* ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠী, ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমী*ধর্মীয় পঞ্জিকা অনুযায়ী, ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীর পূজা এবং অন্যান্য ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাবে পাঁচ দিনের উৎসব। ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের দুর্গোৎসব।দুর্গোৎসব সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। দেবী দুর্গার আগমনকে অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। রূপগঞ্জের পূজারিরা ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও সামাজিক বন্ধন জোরদারের প্রত্যাশা করছেন। তাঁদের আশা, সব সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতায় এবারের দুর্গোৎসব আনন্দমুখর, নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হবে।





মন্তব্য