ফুটবল বিশ্বকাপের জমকালো আয়োজনের আড়ালে যে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা সম্প্রতি এফবিআই এবং আন্তর্জাতিক পুলিশ সহযোগিতা কেন্দ্রের (আইপিসিসি) ফাঁস হওয়া গোপন নথিতে উঠে এসেছে। টুর্নামেন্টজুড়ে প্রতিদিনের নিরাপত্তা প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অনেক তারকা খেলোয়াড়, কোচ ও ম্যাচ পরিচালনাকারীরা প্রাণনাশের হুমকি ও নানা ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন।
তালিকায় সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে ছিলেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক লিওনেল মেসি। আর্জেন্টিনা-জর্ডান ম্যাচের দিন টেক্সাসের ডালাস বিমানবন্দরে এক ব্যক্তি ফোন করে দাবি করেন, তিনি ও তাঁর দুই সঙ্গী হাতে বানানো বোমা ও এআর-১৫ রাইফেল নিয়ে স্টেডিয়ামে হামলার পরিকল্পনা করছেন। পুলিশের নথিতে বলা হয়, ওই ব্যক্তির মূল লক্ষ্য ছিলেন মেসি। এছাড়া মিসরের বিপক্ষে ম্যাচের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক ব্যবহারকারী আটলান্টা স্টেডিয়ামে বোমা হামলার হুমকি দিয়ে মেসিকে উড়িয়ে দেওয়ার কথা লিখেছিলেন। ম্যাচ চলাকালীনও স্টেডিয়ামের ডাস্টবিনে বোমা থাকার ভুয়া খবর ছড়িয়ে পড়লে বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত কুকুর দিয়ে তল্লাশি চালাতে হয়।
পর্তুগালের তারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোও পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে হয়রানির শিকার হয়েছেন। গত ১৪ জুন ফিফার এক কর্মী রোনালদোর নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন। ১৬ জুন হিউস্টনে পর্তুগাল দলের হোটেলে রোনালদোর গতিবিধি পর্যবেক্ষণকারী এক ব্যক্তিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। এছাড়া টরন্টোতে এক অনুরাগী রোনালদোর লিফটে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করেন এবং মায়ামিতেও তাঁকে ঘিরে ধরার ঘটনা ঘটে। পর্তুগাল-ক্রোয়েশিয়া ম্যাচে এক দর্শক মাঠে ঢুকে রোনালদোর জার্সি পরা অবস্থায় ধরা পড়েন।
মাঠের পারফরম্যান্স নিয়ে ক্ষোভের জেরেও অনেক খেলোয়াড়কে প্রাণনাশের হুমকি পেতে হয়েছে। রিয়াল মাদ্রিদের কিলিয়ান এমবাপ্পে প্যারাগুয়ের গোলরক্ষকের সঙ্গে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ার পর প্যারাগুয়ের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে কটূক্তির শিকার হন। ৫ ও ৬ জুলাই দেশটিতে তাঁর প্রতিকৃতি পোড়ানো হয়। একইভাবে, সহজ গোলের সুযোগ নষ্ট করায় আতলেতিকো মাদ্রিদের স্ট্রাইকার আলেকজান্ডার সরলথ ও তাঁর স্ত্রীকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। পেনাল্টি মিসের কারণে কলম্বিয়ার জামিনটন ক্যাম্পাজ দেশে ফিরতে পারেননি এবং ফরাসি ডিফেন্ডার লুকাস দিনিয়েও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েন।
সবচেয়ে করুণ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়া দল। প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায়ের পর কোচ হং মাইওং-বো ও পুরো দলকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়, যার ফলে তাঁদের বিমানবন্দর পর্যন্ত কড়া পুলিশ প্রহরায় নিয়ে যেতে হয়েছিল। রেফারিদের অবস্থাও ছিল ভয়াবহ। আর্জেন্টিনা ও মিসরের মধ্যকার ম্যাচের পর ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ার ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপে প্রায় ছয় হাজার হুমকিমূলক বার্তা পান, যার বেশিরভাগই ছিল মিসরীয় নাগরিকদের পাঠানো।
লেতেক্সিয়ারের পাশাপাশি ওই ম্যাচে ভিএআর দায়িত্বে থাকা ফরাসি রেফারি উইলি দেলাজোদকেও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। পরিস্থিতি এতটাই জটিল আকার ধারণ করে যে, ফ্রান্সে এই দুই রেফারির বাড়ি ও তাঁদের স্বজনদের নিরাপত্তার জন্য আলাদা পুলিশি পাহারা বসাতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই ও অংশ নেওয়া দেশগুলোর পুলিশ বাহিনীকে নিয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক পুলিশ সহযোগিতা কেন্দ্র (আইপিসিসি) বিশ্বকাপজুড়ে প্রতিদিন নিরাপত্তাবিষয়ক প্রতিবেদন তৈরি করেছে।
ম্যাচ চলার সময়ও পুলিশ হেডকোয়ার্টারে ফোন আসে।
গত ১৪ জুন ফিফার এক কর্মী পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন, এক সন্দেহভাজন ব্যক্তি রোনালদোর থাকার ব্যবস্থা সম্পর্কে গভীর ‘খোঁজখবর’ নিচ্ছেন।
বিশ্বকাপ শেষ হয়ে গেছে সপ্তাহ তিনেক হতে চলল।
কিন্তু এর রঙিন সব স্মৃতি যেন এখনো টাটকা।
গ্যালারিতে উন্মাদনা, মাঠে পারফরম্যান্সের ঝলক আর জয়ের পর উল্লাস।
কিন্তু এই জমকালো আলোর নিচে যে থমথমে অন্ধকার জমে ছিল, ফুটবল–বিশ্ব তা হয়তো এতটা টের পায়নি।
ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরের নিরাপত্তাব্যবস্থা যেন ঝুলছিল একটা সুতায়।
সেই গোপন নথির একটি অংশ প্রকাশ করেছে স্পেনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম প্রেনসা ইবেরিকার অনুসন্ধানী অপরাধবিষয়ক চ্যানেল।
আর্জেন্টিনার আরেকটি ম্যাচের আগেও ছড়িয়েছিল বোমাতঙ্ক।
নিজের শরীরে চারটা বোমা বেঁধে উড়িয়ে দেব মেসিকে।’
আর্জেন্টিনার মহাতারকাকে ঘিরে যখন বোমাতঙ্ক, তখন পর্তুগালের তারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ভুগেছেন লাগাতার হয়রানির আতঙ্কে।
নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে আটকে দেন।
পরে ওই ব্যক্তি জানান, তিনি সিআর সেভেনের সঙ্গে একটি সেলফি তুলতে চেয়েছিলেন।
পেনাল্টি মিস করার পর কলম্বিয়ার ফুটবলার জামিনটন ক্যাম্পাজ বিশ্বকাপ শেষে সতীর্থদের সঙ্গে দেশে ফিরতেও পারেননি।
এসব বার্তার সিংহভাগই ছিল মিসরীয় নাগরিকদের কাছ থেকে।
সূত্র: প্রথম আলো


মন্তব্য