আব্দুল্লাহ্ আল মারুফ।। ডিজিটাল ভূমি সেবার যুগেও পুরোনো তদবির ও বকশিশ’ সংস্কৃতি থেকে বের হতে পারেনি চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলা ভূমি অফিস। নামজারি (মিউটেশন)মিস মামলা, খাজনা প্রদান, খতিয়ান তামিল কিংবা অবিকল নকল উত্তোলন-প্রতিটি সেবার ক্ষেত্রেই ‘চা-নাস্তার খরচ বা বকশিশের’ নামে চলছে ওপেন সিক্রেট ঘুষ বাণিজ্য। অনলাইনে আবেদনের নিয়ম থাকলেও সংশ্লিষ্ট টেবিলের কর্মকর্তাদের ‘সন্তুষ্ট’ না করলে ফাইল নড়ে না বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ। ফলে ডিজিটাল সেবার সুফল থেকে বঞ্চিত হয়ে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করছেন সাধারণ মানুষ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকার ভূমি সেবাকে সহজ করতে অনলাইন ব্যবস্থা চালু করলেও লোহাগাড়া ভূমি অফিসে মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। নিয়ম অনুযায়ী অনলাইনে আবেদনের পর নির্ধারিত সময়ে ফাইলের অগ্রগতি হওয়ার কথা থাকলেও, কাগজপত্রে কোনো ত্রুটি না থাকলেও মাসের পর মাস ফাইল আটকে রাখা হয়। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট টেবিলে যোগাযোগ করা হলে পরোক্ষভাবে অর্থ দাবি করা হয়। টাকা দিলে ফাইল দ্রুত ওপরের টেবিলে পাঠানো হয়, আর টাকা না দিলে ফাইল ধুলোবালি মেখে পড়ে থাকে মাসের পর মাস।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,অনলাইনে নামজারির আবেদন করার পর কয়েক সপ্তাহ কেটে গেলেও কোনো অগ্রগতি দেখিনি। অফিসে খোঁজ নিতে গেলে সরাসরি বলা হয়-তদবির’ করলে দ্রুত হবে, নাহলে সময় লাগবে। এখানে তদবির মানেই হলো টাকা।
সরেজমিনে লোহাগাড়া উপজেলা ভূমি অফিসে গিয়ে দেখা যায়, আধুনগর, চুনতি ও পদুয়া ইউনিয়ন থেকে আসা সাধারণ মানুষ দালালের খপ্পরে পড়ে দিশেহারা। নিজের জমির নামজারি করতে এসে হয়রানির শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত একজন মুন্সীর (দালাল) শরণাপন্ন হতে বাধ্য হয়েছেন এক বৃদ্ধ।
একই চিত্র প্রবাসীদের ক্ষেত্রেও। কুয়েত প্রবাসী ফৌজুল কবির বলেন,ভেবেছিলাম প্রবাস থেকে এসে নিজের কাজ নিজেই করতে পারব। কিন্তু না পেরে শেষ পর্যন্ত একজন মুন্সী ধরেছি। ভূমি অফিসের কোনো পরিবর্তন নেই, সব আগের পুরোনো ছন্দেই চলছে।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী একটি নামজারির নির্ধারিত ফি মাত্র ১ হাজার ১৫০ টাকা। কিন্তু লোহাগাড়া ভূমি অফিসে দালাল বা মুন্সীদের সিন্ডিকেট ছাড়া একটি সাধারণ নামজারি করা প্রায় অসম্ভব। একটি সাধারণ ফাইলের জন্য গ্রাহককে গুনতে হচ্ছে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। আর জমি সংক্রান্ত কোনো জটিলতা বা মিস মামলা থাকলে সেই ব্যয়ের অঙ্ক ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, এই বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ অফিসের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়। এমনকি সহকারী কমিশনারের (ভূমি) নাম ভাঙিয়েও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে কিছু কর্মচারীর বিরুদ্ধে।
কবির আহমদ নামে এক স্থানীয় কৃষক বলেন,নিজের সম্পত্তি ছেলেদের নামে দানপত্র করার পর ভেবেছিলাম নিয়মমতো নামজারি হয়ে যাবে। কিন্তু দালাল ছাড়া ফাইল এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে যায় না। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য এটা অত্যন্ত হতাশাজনক।
এমনকি স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরাও এই হয়রানি থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। সংবাদকর্মী মুহাম্মদ মারুফ নিজের খতিয়ান সংশোধনের আবেদন করে মাসের পর মাস ঘোরার পর বাধ্য হয়ে ‘যোগাযোগের’ মাধ্যমে কাজ করিয়েছেন বলে জানান। খতিয়ান তামিলের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয় বলে তার অভিযোগ।
ফাইল আটকে থাকার বিষয়ে অফিসের কর্মচারী রবিউল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি কাজের ব্যস্ততার অজুহাত দিয়ে বলেন,আমরা নানা কাজে ব্যস্ত থাকি। প্রতিদিন সব ফাইল স্যারের টেবিলে নেওয়া সম্ভব হয় না। যারা এসে খোঁজখবর নেন (তদবির করেন), তাদের ফাইলগুলো আগে পাঠানো হয়।
ঘুষ ও অনিয়মের সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার কাম কানুনগো নূরে আলম। তিনি দাবি করেন,এখানে কোনো ধরনের অবৈধ টাকা লেনদেনের সুযোগ নেই। আমরা সরকারি বিধি অনুযায়ী কাজ করছি। অনেকে অন্যায্য আবদার নিয়ে আসেন, যা পূরণ না হলে তারা অপপ্রচার চালান।
সার্বিক বিষয়ে লোহাগাড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মং এছেন বলেন,ভূমি অফিসে ঘুষ বা বকশিশ নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পেলে আমরা তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেব। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জনগণের সেবা নিশ্চিত করতে সবাইকে কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তবে সাধারণ সেবাপ্রার্থীদের দাবি, কেবল মৌখিক আশ্বাস নয়, ডিজিটাল ভূমি সেবার প্রকৃত সুফল নিশ্চিত করতে হলে মাঠপর্যায়ে কঠোর মনিটরিং, জবাবদিহিতা এবং দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।


মন্তব্য