মো: আমজাদ হোসেন,সংবাদকর্মী >>> প্রযুক্তির অগ্রগতির এই যুগে ইন্টারনেট মানুষের জীবনকে সহজ, গতিশীল ও আধুনিক করেছে। কিন্তু এর অপব্যবহার সমাজে নতুন নতুন সংকটের জন্ম দিচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম উদ্বেগজনক সামাজিক সমস্যা হলো অনলাইন জুয়ার বিস্তার। বিশেষ করে তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ এই ভয়াবহ আসক্তির শিকার হয়ে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে বিপর্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছে।স্মার্টফোন ও উচ্চগতির ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে অনলাইন জুয়ার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম এখন হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও প্ল্যাটফর্ম ও বিভিন্ন ওয়েবসাইটে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে তরুণদের প্রলুব্ধ করা হচ্ছে। ‘কম সময়ে বেশি লাভ’, ‘ঘরে বসেই আয়’ কিংবা ‘নিশ্চিত জয়ের কৌশল’—এ ধরনের বিভ্রান্তিকর প্রচারণা অনেককে সহজেই জুয়ার জগতে টেনে নিচ্ছে।প্রথমে বিনোদন বা কৌতূহলবশত শুরু হলেও ধীরে ধীরে এটি আসক্তিতে পরিণত হয়। অনেক শিক্ষার্থী ও তরুণ নিজেদের সঞ্চয়, পরিবারের টাকা কিংবা ধার করা অর্থ অনলাইন জুয়ায় ব্যয় করে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। কেউ কেউ ঋণের বোঝা সামলাতে না পেরে মানসিক অবসাদে ভুগছে, আবার অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক কলহ, বিচ্ছেদ এবং অপরাধপ্রবণতার ঘটনাও ঘটছে।অনলাইন জুয়ার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো এটি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অর্থ হারানোর হতাশা, দ্রুত লাভের আশায় বারবার চেষ্টা, ব্যর্থতার চাপ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা একজন মানুষকে ধীরে ধীরে মানসিকভাবে দুর্বল করে তোলে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, জুয়া আসক্তি বিষণ্নতা, উদ্বেগ এবং আত্মহত্যার ঝুঁকি পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে।শুধু ব্যক্তি বা পরিবার নয়, অনলাইন জুয়ার কারণে জাতীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অধিকাংশ অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্ম বিদেশ থেকে পরিচালিত হওয়ায় বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। অর্থ পাচারের একটি বড় মাধ্যম হিসেবেও অনলাইন জুয়া এখন আলোচনায় এসেছে। ফলে এটি সামাজিক সমস্যার পাশাপাশি অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।সরকার বিভিন্ন সময়ে অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছে এবং অসংখ্য ওয়েবসাইট বন্ধ করেছে। কিন্তু প্রযুক্তির অপব্যবহার ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের কারণে এসব প্ল্যাটফর্ম নতুন নামে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠছে। তাই কেবল সাইট বন্ধ করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি।এই সংকট মোকাবিলায় পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিভাবকদের সন্তানদের অনলাইন কার্যক্রম সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল সচেতনতা ও প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহারের বিষয়ে শিক্ষাদান বাড়াতে হবে। পাশাপাশি তরুণদের জন্য খেলাধুলা, সংস্কৃতি চর্চা, স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ড এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে।বাংলাদেশের তরুণরাই আগামী দিনের উন্নয়ন ও নেতৃত্বের মূল শক্তি। তাদের যদি অনলাইন জুয়ার মতো ধ্বংসাত্মক আসক্তি গ্রাস করে, তাহলে ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্র—সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই এখনই সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করে অনলাইন জুয়ার বিস্তার রোধ করতে হবে। সচেতনতা, আইন প্রয়োগ এবং সামাজিক প্রতিরোধের মাধ্যমেই গড়ে উঠতে পারে একটি সুস্থ, নিরাপদ ও দায়িত্বশীল ডিজিটাল সমাজ।তরুণদের রক্ষা করা মানেই দেশের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা। আর সেই লক্ষ্যেই অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে এখনই সর্বাত্মক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা সময়ের দাবি।


মন্তব্য