আব্দুল্লাহহ্ আল মারুফ।। নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন কিংবা প্রযুক্তির অগ্রগতিই যথেষ্ট নয়, বরং এর জন্য মানুষের বিবেক, মানবিকতা ও নৈতিক মূল্যবোধের জাগরণ অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তিনি বলেন, শুধু পেশাগত পরিচয় বা পদ-পদবি নয়, সমাজ গঠনে মানুষ হিসেবে প্রত্যেকের নিজস্ব দায়িত্ব পালন করা জরুরি। প্রযুক্তির এই দ্রুত বিকাশের যুগে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব টিকে আছে তার মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের ওপরই।
শনিবার (১৩ জুন)চট্টগ্রাম কলেজ অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ স্কাউটস, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন জেলা আয়োজিত নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে স্কাউটিংয়ের ভূমিকা” শীর্ষক প্রতিষ্ঠান প্রধানদের এক উদ্বুদ্ধকরণ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডিসি জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, সমকালীন সমাজে মানুষ প্রতিনিয়ত এক অন্ধ প্রতিযোগিতায় দৌড়াচ্ছে। এই ইঁদুরদৌড়ে আমরা আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ-নৈতিকতা ও মানবিকতা হারিয়ে ফেলছি। তিনি প্রকৃতির উদাহরণ টেনে বলেন,সূর্যের তাপ, চাঁদের আলো কিংবা সমুদ্রের গর্জন না থাকলে যেমন তাদের কোনো কার্যকারিতা থাকে না, ঠিক তেমনি মানুষের ভেতর যদি মানবিকতা না থাকে, তবে মানুষ হিসেবে তার অস্তিত্বের কোনো মূল্য থাকে না।
স্কাউট আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা রবার্ট ব্যাডেন-পাওয়েলের দর্শন স্মরণ করে জেলা প্রশাসক বলেন, যুদ্ধবিদ্ধস্ত পৃথিবীতে বিবেকবান ও দায়িত্বশীল নাগরিক গড়ার লক্ষ্যেই স্কাউটিংয়ের সূচনা হয়েছিল, যা আজকের প্রেক্ষাপটেও সমান প্রাসঙ্গিক। আলবার্ট আইন্সটাইনের একটি বিখ্যাত উক্তি উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেন যে, পৃথিবী কেবল খারাপ মানুষের কর্মের জন্য ধ্বংস হয় না, বরং ভালো মানুষেরা যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিশ্চুপ থাকে, তখনই বিপর্যয় নেমে আসে।
শিক্ষকদের সমাজের দর্পণ উল্লেখ করে তিনি বলেন,আজকের শিক্ষার্থীরা শুধু পাঠ্যবই পড়ে শেখে না, তারা শিক্ষকদের আচার-আচরণ ও জীবনবোধও অনুকরণ করে। তাই আমাদের নিজেদের এমনভাবে উপস্থাপন করতে হবে, যেন সন্তানরা আমাদের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।
দেশের খনিজ সম্পদের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা হলো দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী। ১৮ কোটি মানুষের ৩৬ কোটি হাতকে যদি দক্ষতার পাশাপাশি নৈতিক ও মানবিক শিক্ষায় বলীয়ান করা যায়, তবেই দেশ এগিয়ে যাবে।
মেধাপাচার (ব্রেন ড্রেন) প্রসঙ্গে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, দেশের প্রতিভাবান তরুণরা উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে বিদেশ গিয়ে আর ফিরছেন না। এই প্রবণতা বন্ধ করতে হলে দেশের ভেতরেই এমন একটি ইতিবাচক ও সম্ভাবনাময় পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে তরুণরা স্বাচ্ছন্দ্যে তাদের মেধা দেশের কল্যাণে বিলিয়ে দিতে পারে।
প্রযুক্তির চ্যালেঞ্জ ও সামাজিক প্রতিরোধ
প্রযুক্তির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে মানুষের নৈতিক স্খলনের সমালোচনা করে ডিসি বলেন, মানুষ যদি তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়, তবে প্রযুক্তি একদিন মানুষের ওপর আধিপত্য বিস্তার করবে। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে মানুষের চেয়ে প্রযুক্তির দেওয়া তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা বেশি হয়ে উঠছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মানুষের বিবেক ও সততাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
মাদক ও সামাজিক অপরাধের বিস্তার রোধে তিনি বলেন, কেবল কঠোর আইন বা পুলিশি তৎপরতা দিয়ে সমাজ থেকে অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ, সর্বস্তরের জনসচেতনতা এবং পারিবারিক পর্যায়ে নৈতিক শিক্ষার প্রসার। প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সততার সাথে দায়িত্ব পালন করলে ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন দ্রুত বাস্তবায়ন হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন স্কাউটসের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শরীফ উদ্দিনের সভাপতিত্বে এবং সহ-সভাপতি সিদ্দিক আহমদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ মোজাহেদুল ইসলাম চৌধুরী, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবদুল আজিজ এবং জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফিরোজ আহমদ। সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের জেলা সম্পাদক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে স্কাউটিং কার্যক্রমে বিশেষ ও গৌরবোজ্জ্বল অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ-বাংলাদেশ ব্যাংক কলোনি স্কাউট গ্রুপ, জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া মহিলা কামিল মাদ্রাসা এবং আলহাজ্ব এয়াকুব আলী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজকে বিশেষ সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।


মন্তব্য