রিপোর্ট আব্দুল্লাহ আল মারুফ।।মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন বারুদ আর আগুনের দখলে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরান-ইসরায়েল ও মার্কিন সংঘাত আজ পঞ্চম দিনে পদার্পণ করেছে। পাল্টাপাল্টি হামলায় পুরো অঞ্চল এখন এক ভয়াবহ মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে। তেল আবিব এবং ওয়াশিংটনের দাবি, ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা চিরতরে গুঁড়িয়ে দিতেই এই যৌথ অভিযান।
সবচেয়ে বড় চাঞ্চল্যকর খবরটি আসছে তেহরান থেকে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমের দাবি অনুযায়ী, তেহরানে সর্বোচ্চ নেতার বাসভবনে চালানো সুনির্দিষ্ট হামলায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন। যদিও ইরান প্রাথমিকভাবে বিষয়টি গোপন রাখার চেষ্টা করেছিল, তবে বর্তমানে ইরানি রাষ্ট্রীয় মাধ্যমেও তার মৃত্যুর খবর প্রচার করা হচ্ছে। ক্ষমতার এই শূন্যতা পূরণে তার পুত্র মোজতবা খামেনি অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব নিতে পারেন বলে গুঞ্জন ছড়িয়েছে।
এপিক ফিউরি’ ও ‘রোয়ারিং লায়ন’
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF) এবং মার্কিন নৌবাহিনী যৌথভাবে ইরানের কৌশলগত স্থাপনাগুলোতে মুহুর্মুহু হামলা চালাচ্ছে।গত ১২০ ঘণ্টায় ইসরায়েলি বিমান বাহিনী অন্তত ১,৬০০টির বেশি বিমান হামলা (Sorties) পরিচালনা করেছে।তেহরানের প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেস, সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সদর দপ্তর এবং গুরুত্বপূর্ণ ড্রোন উৎপাদন কেন্দ্রগুলো মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন স্পষ্ট করেছে যে, ইরানের ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন এবং পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ থামবে না।ইরানের পাল্টা আঘাত: ‘অপারেশন ট্রু প্রমিস ৪’
চাপের মুখে থাকলেও ইরান তাদের সর্বশক্তি দিয়ে পাল্টা লড়াই চালাচ্ছে। দেশটির রিভোল্যুশনারি গার্ডস (IRGC) ‘অপারেশন ট্রু প্রমিস ৪’ এর আওতায় ইসরায়েলের মূল ভূখণ্ড এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে কয়েকশ ড্রোন ও ব্যালিস্টিক মিসাইল ছুড়েছে। এছাড়া কুয়েত ও সৌদি আরবে অবস্থিত মার্কিন কূটনৈতিক মিশনগুলোতেও বিচ্ছিন্ন হামলার খবর পাওয়া গেছে।বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি সংকট যুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে বিশ্ববাজারে। ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় ধস নেমেছে। ব্যারেল প্রতি তেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোর আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা, যার প্রভাব ইতিমধ্যে এশিয়া ও ইউরোপের বাজারে পড়তে শুরু করেছে।প্রক্সি যুদ্ধ ও আঞ্চলিক বিস্তার যুদ্ধ এখন আর ইরান-ইসরায়েল সীমান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। উত্তর দিক থেকে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে রকেট বৃষ্টি শুরু করলে ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে স্থল অভিযান শুরু করে।
ওমান, বাহরাইন এবং কুয়েতের বিভিন্ন অবকাঠামোতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার খবর পাওয়া গেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।মানবিক পরিস্থিতি ও জাতিসংঘের উদ্বেগ জাতিসংঘের মহাসচিব এক জরুরি বিবৃতিতে জানিয়েছেন, এই পাঁচ দিনের যুদ্ধে কয়েক হাজার সামরিক ও বেসামরিক প্রাণহানি ঘটেছে। কয়েক লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। সংস্থাটি অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানালেও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
তেহরানে বর্তমানে একটি ‘অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিল’ গঠনের প্রক্রিয়া চলছে বলে শোনা যাচ্ছে। তবে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি বলছে, লড়াই আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। মার্কিন ও ইসরায়েলি জোট তাদের লক্ষ্য অর্জনে অনড়, অন্যদিকে ইরানও তাদের অস্তিত্ব রক্ষায় শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়েছে।


মন্তব্য