আনোয়ার হোসেন,কিশোরগঞ্জ (নীলফামারী)প্রতিনিধি:
কালের বিবর্তনে ও প্রযুক্তির ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে প্রাচীন বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের ওজন পরিমাপক দাঁড়িপাল্লা ও নানা ওজনের লোহার পাথর-বাটখারা। ইতিহাস মতে প্রাচীন বাংলায় মুদ্রা ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রচলিত’ বিনিময় প্রথায় পণ্য দিয়ে পণ্য বদলের প্রধান মাধ্যম ছিল এ দাঁড়িপাল্লা।এ দাঁড়িপাল্লার সাহায্য ধান, চাল,ডাল,লবণ বা সবজি নিখুঁতভাবে মেপে লেনদেন করা হতো।পরবর্তীতে বিভিন্ন শাসনামলে গ্রামীণ কৃষি ও বাজার অর্থনীতিতে দাঁড়িপাল্লার সাথে ৬০ ও ৮০ ওজনের লোহার সের,পোয়া’,’ছটাক পাথর(বাটখারার)আবির্ভাব ঘটে।পর্যায়ক্রমে এসব পরিমাপক পাথর দীর্ঘকাল টিকে থাকর পর সর্বশেষে আন্তর্জাতিক মানের কেজি’র গ্রাম-কিলোগ্রাম অন্তর্ভুক্ত হয়। আর প্রযুক্তিবিহীন যুগে গ্রামবাংলার অনাঞ্চলের ন্যায় নীলফামারীর কিশোরগঞ্জে হাট-বাজারে,গ্রামীণ ব্যবসায়, মুদি দোকানে এবং গৃহস্থ পরিবারে প্রাচীনামলের দাঁড়িপাল্লা ও লোহার পাথরের আনা-ছটাক,সের-মণ এবং কেজির গ্রাম-কিলোগ্রামের মাধ্যমে যাবতীয় পণ্য সামগ্রী ক্রয়-বিক্রয় করা হতো।স্বর্ণের দোকানে ছিল উমাচরণ কর্মকারের কাটা-নিক্তি ও তামা-কাসার পাথর রতি। কিন্তু সময়ের বির্বতনে ও প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এর স্থান দখল করেছে ছোট-বড় ডিজিটাল ও ইলেকট্রনিক(স্কেল)মেশিন। বর্তমানে এ মেশিনের বাটন চেপে অতি সহজে ও দ্রুততার সহিত সকল ধরণের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান,গৃহস্থ পরিবারে, ক্ষেতে-খামারে ও ভ্রাম্যমান দোকানসহ সর্বত্রই ওজন পরিমাপ করে পণ্য সামগ্রী ক্রয়-বিক্রয় করা হচ্ছে। এ ডিজিটাল মেশিনে ওজনের পাশাপাশি সরাসরি টাকার হিসাবও চলে আসে। যা সাধারণ দাঁড়িপাল্লায় আলাদাভাবে হিসাব করতে হয় এবং হাত দিয়ে দাঁড়িপাল্লা উঁচিয়ে ধরে ওজন করা বেশ কষ্টসাধ্য। আর ডিজিটাল স্কেল বা মেশিনে পণ্য রেখে দিলেই চলে। যা একই সঙ্গে দ্রুত ওজন নির্ণয় ও হিসাব মিলিয়ে দেওয়ার যাদুকারী যন্ত্র হওয়ায় বর্তমান প্রজন্ম ঝুঁকছেন আধুনিক যুগের ডিজিটাল মেশিনের ব্যবহারে। এতে প্রাচীন বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের বাঁশ-বেতের তৈরি দাঁড়িপাল্লা এবং বিশ্ব কর্মার নিক্তি-কাটা,লোহার গ্রাম পাথর ব্যবহারের চল হারিয়ে যাচ্ছে।পরিমান মত কাঠের গোলাকার দন্ড হল দাঁড়ি। সঠিক মাপ নির্ণয়ের জন্য এ দাঁড়ির উপের একটি কাটা থাকে যা দন্ডের মাঝখানে সংযুক্ত পাট-সুতলির মোটা হাতল হল নতনি বা কাটা। বাঁশ-বেত ও টিন দিয়ে তৈরি গোলাকার পাত্রকে পাল্লা বলা হয়।এর চার কোনে পাটের রশি-দাঁড়ির দু’কোণে বেঁধে ওজন পরিমাপক দাঁড়িপাল্লা তৈরি করা হয়। আর গ্রামবাংলার বাঁশ শিল্পের কারিগররা নিপুণ হাতে বাঁশের পাতি-কাঠি ও বেত দিয়ে তৈরি করতো পাল্লা ও কাঠ মিস্ত্রীর হাতে কাঠ দিয়ে দাঁড়ি এবং কামার শিল্পের কারিগরের তৈরি তামা,লোহা পাথর বা বাটখারা।এর উপর নির্ভর করে চলতো ৩শিল্পের শ্রমওজীবি কারিগরের জীবন জীবিকা। এ পেশায় রসদ খুঁজে না পাওয়ায় কিছু বেচে থাকা প্রবীণ কারিগর ভিড়েছেন অন্য পেশায়। যে সনাতনী দাঁড়িপাল্লা ছাড়া ওজন নির্ণয়ে চিন্তাই করা যেতনা,এখন দশ শতবর্ষী হাট-বাজারসহ দশ গ্রামেও চোখে মেলাটা ভাগ্যের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।কালেভদ্রে এ সনাতনী ওজন পরিমাপের দেখা মেলে উপজেলার বাহাগিলী ইউনিয়নের উত্তর দুরাকুটি কবিরাজ পাড়া গ্রামের প্রবীণ আদা ব্যবসায়ী বল্টু মামুদের বাড়িতে। তিনি আজও পুরনো ঐতিহ্যবাহী দাঁড়িপাল্লা ও নানা ওজনের পাথর ধরে রেখে ব্যবসায়ীকসহ কৃষি পণ্য সামগ্রী ক্রয়-বিক্রয় করছেন। বল্টু মামুদ বলেন,আমার মরহুম পিতা নমের উদ্দিন দাঁড়িপাল্লা দিয়ে আদার ব্যবসা করে সংসার চালাতেন।তার হাত ধরে শেখা আদার ব্যবসা ও রেখে যাওয়া স্মৃতি বিজড়িত দাঁড়িপাল্লার ঐতিহ্য হিসেবে আজও ধরে রেখেছি। বর্তমান যুগের ডিজিটাল মেশিনের বাটন চেপে স্বল্প সময়ে অধিক জিনিস পরিমাপ করা গেলেও ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক চার্জ ছাড়া চলেনা। আছে যান্ত্রিক নানা ত্রুটিও। কিন্তু হাতের সাহায্য মাপা দাঁড়িপাল্লা সময় সাপেক্ষ হলেও একটি নির্ভেজাল পরিমাপক মাধ্যম। দাঁড়িপাল্লা শুধু একটি ওজন মাপার যন্ত্র নয়,বরং এর সঙ্গে মিশে আছে বাংলার বাজার সংস্কৃতি,গ্রামীণ অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের দীর্ঘ ইতিহাস।অথচ আজ আধুনিকতার জোয়ারে গা ভাসাতে গিয়ে দীর্ঘ ইতিহাস সমৃদ্ধ সনাতনী পরিমাপক মাধ্যমগুলো কালের অতলগহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে।এতে নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই এখন দাঁড়িপাল্লা কেবল বইয়ের ছবি কিংবা পুরোনো দিনের গল্প হয়ে উঠছে। উত্তর দুরাকুটি পশ্চিম পাড়া গ্রামের প্রবীণ ব্যাক্তি জরিয়াল হোসেন বলেন,এক সময়ে ক্রয়-বিক্রয় বা বিনিময় ব্যবস্থায় ছিল বিভিন্ন আকৃতির ধাতব পাত্র ও সংখ্যা গননা করে। পরে লোকায়েত জ্ঞানের দাঁড়িপাল্লা আর অনুমান করা সিল-পাথরের প্রচলন শুরু হয়।পরবর্তীতে ৬০এর ওজনের আনা,ছটাক সেরসহ বিভিন্ন লোহার পাথরের আবির্ভাব ঘটে। যা ৩০ সেরে ১ মন। এর পর ৮০ ওজনের বিভিন্ন লোহার পাথর। যা ৪০ সেরে ১ মন।কিছু দিন আগেও ব্যবহার ছিল হাতের সাহায়্যে মাপা দাঁড়িপাল্লা ও গ্রাম-কিলোগ্রামের লোহার পাথর। যা ৪০কেজিতে ১ মন। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে পর্যায়ক্রমে এসব পরিমাপক যন্ত্রের ব্যবহার ছিল লম্বা সময় ধরে।কিন্তু দিন যতই যাচ্ছে ততই যেন বাঙ্গালী জীবনে এঁটেসেটে বসছে আধুনিকতার ধারা।এতে বাঙালির হাজার বছরের ব্যবসা-বাণিজ্যের স্মৃতি বিজড়িত এই দাঁড়িপাল্লা ও লোহার পাথর এখন কেবলই লোকসংস্কৃতির জাদুঘর কিংবা স্মৃতির পাতায় স্থান করে নিচ্ছে।এ ঐতিহ্য রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসা দরকার। তা না হলে সৃষ্টিশীল বাঙ্গালীর আত্মপরিচয় চিরতরে হারিয়ে যাবে। অপর দিকে কিশোরগঞ্জ সদর ইউনিয়নের বাজেডুমরিয়া গ্রামের প্রবীণ ব্যাক্তি বলেন, দাঁড়িপাল্লা ও বাটখারা শুধু পণ্য মাপার উপকরণ ছিল না, এগুলো ছিল গ্রামীণ হাটের সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের একটি অবিছেদ্য অংশ। যা একসময় সাপ্তাহিক গ্রামীণ হাট-বাজারে ঢুকলেই চোখে পড়তো হাটের অলিগলিতে ধান,চাল আটা-ময়দাসহ নানা নিত্য পণ্য সামগ্রী নিয়ে সারিবদ্ধভাবে বসে থাকা বিক্রেতাদের। আর তাদের সামনে সাজানো থাকত দাঁড়িপাল্লা আর নানা আকারের বাটখারা। দাঁড়িপাল্লায় এসব পণ্য ওজন আর বাটখারার টুংটাং শব্দে মুখর হয়ে উঠতো পুরো হাট। সব মিলিয়ে তৈরি হতো প্রাণবন্ত এক পরিবেশ।কিন্তু কালের বিবর্তনে বদলে গেছে সেই হাটের চিত্র।এখন সর্বত্রই ডিজিটাল ওজন মেশিনের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে বহু কালের ঐতিহ্যবাহী দাঁড়িপাল্লা ও বাটখারা। ফলে হাটের সেই পরিচিত দাঁড়িপাল্লা ও বাটখারার টুংটাং শব্দও এখন নতুন প্রজন্মের কাছে অনেকটাই স্মৃতির গল্প।উপজেলা শহরের পুরনো গালামাল ও সার ব্যবসায়ী রাজিব কুন্ড বলেন,কিছু দিন আগেও প্রতিটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে দাঁড়িপাল্লার ব্যবহার ছিল। এখন আর নেই।আধুনিক যুগে এখন সব দোকানে ডিজিটাল মেশিনে ওজন নির্ণয় করা হচ্ছে।ডিজিটাল যন্ত্রে দ্রুত ওজন করা যায় এবং হিসাবও সহজ। তাই সময় ও শ্রম বাঁচাতে আধুনিক যন্ত্রের দিকে ঝুঁকছেন সবাই। ফলে বাংলার হাট-বাজার ও গ্রামীণ অর্থনীতির সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ কেবল স্মৃতির পাতায় ঠাঁই নিচ্ছে। এখন শুধু পহেলা বৈশাখ বা বিশ্বকর্মার পুজোতে বের করা হয় ফুল-জল দেওয়ার জন্য।
উপজেলা কৃষি র্কমকর্ডা লোকমান আলম বলেন,ওজনে কারচুপি রোধে ডিজিটাল মেশিনের প্রচলন বেড়েছে।ডিজিটাল মেশিনে খুব দ্রুত ও নির্ভুলভাবে ওজন মাপা যায়,যেখানে দাঁড়িপাল্লায় হিসাব করতে ও কাঁটা মেলাতে সময় বেশি লাগে। যা আধুনিকতার ছোঁয়ায় মানুষ সময় সাশ্রয়ী ডিজিটাল মেশিনের বাটন টিপে এক নিমিষে ভারি থেকে হালকা সব ধরনের পণ্য সামগ্রীর ওজন নির্ণয় করে কেনা-বেচা করছেন।এতে বাঙালির অর্থনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘ সময় জুড়ে থাকাঐতিহ্যবাহী পরিমাপক গুলোর ব্যবহার শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে।


মন্তব্য