আব্দুল্লাহ আল মারুফ চট্টগ্রাম >>> টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর জনজীবন স্বাভাবিক হওয়ার আভাস মিললেও, পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে আসছে ক্ষতচিহ্ন। উপজেলাজুড়ে রাস্তাঘাট, কৃষিজমি, মাছের ঘের ও ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র এখন স্পষ্ট। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রাথমিক হিসেবে, এই বন্যায় উপজেলায় মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১২৬ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর তথ্যমতে, নলুয়া, আমিলাইষ, পশ্চিম ঢেমশা, চরতি, বাজালিয়া, কেঁওচিয়া, এওচিয়াসহ অন্তত ১২টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় গৃহহীন ও নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন বহু মানুষ।সবচেয়ে বেশি আঘাত এসেছে কৃষি ও মৎস্য খাতে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১ হাজার ৯০ হেক্টর আউশ ধান, ৭০ হেক্টর আমনের বীজতলা এবং ৮৫০ হেক্টর শাকসবজি মিলিয়ে মোট ১৬ হাজার ৫০০-এর বেশি কৃষক চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এ খাতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৬০ কোটি টাকা।অন্যদিকে, মৎস্য চাষিরা পড়েছেন মহাবিপদে। ৩ হাজার ৫৭৫টি পুকুর ও দীঘির মাছ ভেসে যাওয়ায় প্রায় ৩৭ কোটি ৫০ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা। এওচিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা ও ভুক্তভোগী সাংবাদিক আব্দুল্লাহ আল মারুফ জানান, বন্যার পানিতে তার মাছের প্রজেক্টের ১১ লাখ টাকার মাছ ভেসে গেছে। তিনি বলেন, আমার সম্বল বলতে ছিল এই প্রজেক্টটি। মাছ ভেসে যাওয়ায় আমি এখন নিঃস্ব। সরকারি ক্ষতিপূরণ না পেলে ঘুরে দাঁড়ানো অসম্ভব।সড়ক ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রাথমিক হিসেবে, অন্তত ২৫ কিলোমিটার সড়ক, ৪০টি অভ্যন্তরীণ প্রধান সড়ক, পাঁচটি কালভার্ট ও একটি খালের বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ১৫ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অনেক সড়কের কার্পেটিং উঠে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। কিছু এলাকায় কালভার্টের সংযোগ সড়ক ধসে পড়ায় এখনো বাঁশের সাঁকো দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন স্থানীয়রা।এছাড়াও, বন্যায় আটটি গরু, ২৭টি ছাগলসহ দুই হাজারের বেশি হাঁস-মুরগি মারা গেছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় সাড়ে ১০ কোটি টাকা। ৩৫টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ২৫টি মাদ্রাসা ও চারটি কলেজের ভবনও বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে শিক্ষা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, “বিভিন্ন দপ্তর প্রাথমিক তালিকা তৈরি করেছে। কিছু এলাকায় এখনো পানি থাকায় চূড়ান্ত হিসাব করতে সময় লাগছে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, মৎস্যচাষি ও পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনের আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও অবকাঠামো দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।স্থানীয় ভুক্তভোগীরা জানান, সরকারি প্রণোদনা ও দ্রুত পুনর্বাসন সহায়তা ছাড়া কৃষিজীবী ও মৎস্যচাষিদের পক্ষে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা চূড়ান্ত করে সহায়তা প্রদানের দাবি জানিয়েছেন তারা।


মন্তব্য