আব্দুল্লাহ আল মারুফ।। রাঙামাটি কাপ্তাই হ্রদে পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে নেমে যাওয়ায় রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে অবস্থিত কর্ণফুলী পানিবিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন চরম সংকটে পড়েছে। পানির অভাবে কেন্দ্রের মোট পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে চারটিই বন্ধ করে দিতে হয়েছে। বর্তমানে মাত্র একটি ইউনিট থেকে নামমাত্র বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে, যা কেন্দ্রের মোট সক্ষমতার তুলনায় নগণ্য।
২৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন এই কেন্দ্রে বর্তমানে কেবল ১টি ইউনিট চালু রাখা সম্ভব হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানায়, চালু থাকা ওই ইউনিটটি থেকে বর্তমানে মাত্র ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। অথচ গত সপ্তাহ পর্যন্ত দুটি ইউনিট চালু রাখা সম্ভব হয়েছিল। হ্রদের পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাওয়ায় গত মঙ্গলবার আরও একটি ইউনিট বন্ধ করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
কেন্দ্রের প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কাপ্তাই হ্রদের পানি পরিমাপের নির্ধারিত স্কেল বা ‘রুলকার্ভ’ অনুযায়ী বর্তমানে হ্রদে পানির স্তর থাকার কথা ছিল ৮৩.৮০ ফুট (মিন সি লেভেল-এমএসএল)। কিন্তু গত বুধবার সকালে পানির স্তর রেকর্ড করা হয়েছে মাত্র ৭৭.৪৭ ফুট। অর্থাৎ হ্রদে বর্তমানে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৬ ফুটেরও বেশি পানি কম রয়েছে।
কাপ্তাই ও রাঙামাটি এলাকার সাধারণ গ্রাহকরা বিদ্যুৎ বিভ্রাট নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মো. আমিনুল ইসলাম বলেন,এমনিতেই গরম বাড়ছে, তার ওপর বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় আমরা ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ার ভয়ে আছি। কাপ্তাই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওপর এই অঞ্চলের মানুষের অনেক আশা। উৎপাদন এভাবে কমতে থাকলে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়বে। আমরা চাই সরকার বিকল্প কোনো উপায়ে হলেও এই বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতি রাখুক।
হ্রদের পানি কমে যাওয়ায় কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, বিপাকে পড়েছেন হ্রদনির্ভর কয়েক হাজার জেলে। কাপ্তাই হ্রদের মৎস্যজীবী অনিল দাস তার দুর্ভোগ তুলে ধরে বলেন,হ্রদে পানি কমে যাওয়ায় মাছ গভীর পানিতে চলে গেছে, অনেক জায়গায় চর জেগে ওঠায় জাল ফেলতে পারছি না। আবার পানি কমে যাওয়ায় ইঞ্জিনচালিত নৌকা চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পানি নেই মানে আমাদের পেটেও ভাত নেই। হ্রদ শুকিয়ে যাওয়ায় আমাদের রুটি-রুজিতে টান পড়েছে। আমরা এখন আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি, বৃষ্টি না নামলে আমাদের না খেয়ে থাকার দশা হবে।
বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন,চলতি শুষ্ক মৌসুমে বৃষ্টিপাত না হওয়ায় কাপ্তাই হ্রদের পানির স্তর দ্রুতগতিতে কমে যাচ্ছে। পানির লেভেল রুলকার্ভের নিচে নেমে যাওয়ায় আমরা বড় ধরনের সংকটে পড়েছি। এভাবে পানি কমতে থাকলে এবং দ্রুত বৃষ্টি না হলে অবশিষ্ট একটি ইউনিটের উৎপাদনও যেকোনো সময় বন্ধ করে দিতে হতে পারে। আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি, তবে প্রাকৃতিক বৃষ্টিপাত ছাড়া এই সংকট উত্তরণের আর কোনো বিকল্প পথ আমাদের হাতে নেই।
শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই এমন পরিস্থিতি বিদ্যুৎ সরবরাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে হ্রদের পানির ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় মৎস্য চাষি এবং নৌ-চলাচলেও এর বিরূপ প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আবহাওয়া অফিস সূত্রে বড় ধরনের বৃষ্টির কোনো পূর্বাভাস না পাওয়া পর্যন্ত এই সংকট অব্যাহত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


মন্তব্য