১৬ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২রা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ |
আন্তর্জাতিক:
লেবাননে ইসরাইলি হামলা ৩ স্বাস্থ্যকর্মীসহ নিহত ৫ জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব কে লড়াইয়ে ৪ শীর্ষ প্রার্থী মধ্যপ্রাচ্য সংকটে বিপাকে ভারতের বিমান খাত: জ্বালানির আকাশচুম্বী দামে বন্ধ হওয়ার শঙ্কা দেশের সব বিমানবন্দরে সর্বোচ্চ সতর্কতা, জোরদার করা হয়েছে নজরদারি লাহোর থেকে যাতি উমরা স্মৃতির অলিন্দে পাঞ্জাবের আতিথ্য তুরস্কের কাছে ১০০ কোটি ডলার ও সুন্দরী স্ত্রী চাইলেন উগান্ডার সেনাপ্রধান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে কোনো সীমাবদ্ধতা মানবে না ইরান।। ইসরায়েলি ও মার্কিন বিমান হামলায় আহত ইরানি নেতা কামাল খারাজির মৃত্যু নিখোঁজ পাইলট উদ্ধারের আড়ালে ইউরেনিয়াম চুরির চেষ্টা ছিল বলে অভিযোগ ইরানের ইরানকে ট্রাম্পের আলটিমেটাম ৪৮ ঘণ্টায় হরমুজ না খুললে নামবে নরক
     
             

পলাশী ট্রাজেডি ও ভারত উপমহাদেশের ভৌগোলিক বিভাজন

  বাংলাদেশ সংবাদ প্রতিদিন

রিপোর্ট:কলামিস্ট অধ্যাপক শাব্বির আহমদ
————————————————
২৩ জুন ঐতিহাসিক পলাশী ট্রাজেডি দিবস। ভারতীয় উপমহাদেশের বর্তমান বিভাজিত ভৌগোলিক অভ্যুদয়ের একেবারে গোড়ায় আছে পলাশীর ঐতিহাসিক যুদ্ধ। ১৭৫৭ সাালে পলাশীর আম্রকাননে সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ বণিক সংগঠন ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সাথে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজুদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতার সূর্ষ অস্তমিত হতে শুরু করে। মুঘল সম্রাট আর নবাবদের অনুগ্রহ ও কৃপায় এদেশে বাণিজ্য করতে আসা বৃটিশ বেনিয়ারা যুদ্ধ জয়ের পর বণিকের মানদন্ড থেকে রাজদন্ডে রূপান্তরিত হয়ে নিজেরাই অনুগ্রহ বিতরণের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। একের পর এক প্রায় সবক’টি রাজ্য দখল শেষে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে শেষ মোঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফরকে রেঙ্গুনে নির্বাসনে পাঠানোর মাধ্যমে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অদম্য ইচ্ছার ষোলকলা পূর্ণ হয়। পলাশী বিপর্যয়ের পর সাড়ে সাতশত বছর ধরে ভারত শাসনকারী মুসলমানরা হতাশাজনক,দিশাহারা ও দুর্দশাগ্রস্ত জাতিতে পরিণত হয়।

অবশ্য ভারতবর্ষে ইংরেজদের সাম্রাজ্য বিস্তারে মুঘল সম্রাটরা কম দায়ী ছিলেননা। বাংলার নবাবরা স্বাধীনভাবে শাসন পরিচালনা করলেও রীতিমাফিক দিল্লিতে মুঘল সম্রাটের কাছে রাজস্ব পাঠাতে হতো। তবেই সুবেদারির সনদ পেতেন। ১৬৫১ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট শাহজাহানের সময় বাংলার শাসনকর্তা শাহ সুজা মাত্র তিন হাজার টাকা বাৎসরিক করের মাধ্যমে ইংরেজদের বাংলার সর্বত্র বাণিজ্য করার অধিকার দিয়েছিলেন। শাহ সুজার দেয়া এই বিশাল প্রাপ্তিতে ইংরেজরা শুধু রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছই হয়নি; কূটকৌশলী এবং স্বার্থান্বেষী ইংরেজ বাণিজ্যের ছত্রছায়ায় বিভিন্ন স্থানে বাণিজ্য কুঠির পাশাপাশি সেখানে গোপনে দুর্গ নির্মাণ ও অস্ত্রশস্ত্রের মজুদও আরম্ভ করেছিল। ইংরেজদের এসব কার্যকলাপের খবর দিল্লীর সম্রাট আওরঙ্গজেবের কাছে পৌঁছলে তাঁর নির্দেশে ইংরেজদের সুযোগ-সুবিধা অনেকাংশে রহিত করা হয়। সুবেদার শায়েস্তা খাঁন তো ইংরেজদের কোণঠাসা করেই রেখেছিলেন। কিন্তু সব দিন তো আর সমান যায় না। ১৭১২ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজদের বাণিজ্যের দুয়ার ফের খুলে যায়। দিল্লীর সম্রাট ফররুখশিয়র হ্যামিল্টন নামক এক ইংরেজ চিকিৎসকের চিকিৎসায় জটিল রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ায় যারপরনাই সন্তুষ্ট হয়ে তার অনুরোধে পূর্বের ন্যায় বার্ষিক মাত্র তিন হাজার টাকার বিনিময়ে ইংরেজরা বাংলায় অবাধ বাণিজ্যের সুবিধা লাভ করে। বাণিজ্যের ঐশ্চর্য ইংরেজদের মুঠোবন্দী হবার ফলে তাদের চোখে রঙ্গিন স্বপ্ন জাগে মুর্শিদাবাদের মসনদের দিকে। মুসলমান শাসকদের রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক অদূরদর্শিতা এবং অপরিপক্ষ কূটনীতির সুযোগে ইংরেজ বেনিয়াদের এদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে মাথা গলানোর সুযোগ করে দেয়।
পৃথিবীর ইতিহাসের জঘন্যতম বিশ্বাসঘাতকতার সাক্ষী হয়ে আছে পলাশীর যুদ্ধ। আর এই ষড়যন্ত্রের কুশীলব ছিলেন নবাবের প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলী খান। সাথে ছিল জগৎশেঠ, ঘষেটি বেগম, রাজ বল্লভ, ইয়ার লতিফ ও উমিচাঁদ গংরা। নির্লজ্জের মত ইংরেজদের আজ্ঞাবহ হয়ে নবাব হিসেবে মসনদে বসলেও মূলতঃ মীর জাফরকে ইংরেজদের অবজ্ঞা আর দেশীয়দের ঘৃণার পাত্র হিসেবেই বাকি জীবন কাটাতে হয়। এক পর্যায়ে বনিবনা না হওয়ায় মীর জাফরকে সরিয়ে তারই জামাতা মীর কাশেমকে ক্ষমতায় বসানো হয়। মীর কাশেমের সঙ্গে দ্বন্দ্ব শুরু হলে ইংরেজরা মীর কাশেমকে সরিয়ে দেন। এ সময় বিশ্বাসঘাতক মীর জাফর নির্লজ্জের মতো আবারও ইংরেজদের আজ্ঞাবহ নবাব হিসেবে মসনদে বসেন। ১৭ জানুয়ারি, ১৭৬৫ সালে ৭৪ বছর বয়সে মীর জাফরের জাগতিক মৃত্যু ঘটলেও আসলেই কি মরেছেন মীর জাফর? যে কোনো বেঈমান বা বিশ্বাসঘাতককে গালি দিতে ব্যবহৃত হয় ‘মীর জাফর’ শব্দটি। তাই বলা হয় মরেও বেঁচে আছেন মীর জাফর মানুষের মুখে মুখে। তবে একটি জঘন্য গালি হিসেবে। কোন বাঙালিই তার সন্তানের নাম ‘মীর জাফর’ রাখে না।
ঐতিহাসিকদের মতে মাত্র তিন হাজার সৈন্য নিয়ে রবার্ট ক্লাইভের বাহিনীর কাছে নবাবের ১৮ হাজার অশ্বারোহী ও ৫০ হাজার পদাতিক বিশাল বাহিনীর পরাজয় অবিশ্বাস্য এবং এটি ছিল মূলতঃ প্রহসন। প্রধান সেনাপতি মীর জাফরের নেতৃত্বে নবাবের সৈন্যনাবাহিনী যুদ্ধ করলে ইংরেজ সৈন্য নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতো এবং ইতিহাস অন্যভাবে লিখিত হতো। ঐতিহাসিকরা আরো মনে করেন, রবার্ট ক্লাইভ শুধু মীরজাফরের বেইমানীর উপর ভরসা করেই যুদ্ধে আসেনি। সে যুদ্ধে এসেছিলো বাঙালীর মানসিকতা নিখুঁতভাবে আন্দাজ করে। সে জানতো, মীরজাফরকে টোপ দিলে গিলবে এবং সে আরো জানতো, যুদ্ধশেষে জনসম্মুখে নবাবের পাছায় লাথি দিলেও এই জাতি বিনোদনে দাঁত কেলাবে অথবা হা করে সব চেয়ে চেয়ে দেখবে। অনেকে বলে থাকেন, বাঙালী জাতির কদাকার মানসিকতা সবচেয়ে নিখুঁতভাবে মাপতে পারা ইতিহাসের প্রথম ব্যক্তিটির নাম রবার্ট ক্লাইভ। রবার্ট ক্লাইভ তার ব্যক্তিগত ডায়েরীতে লিখেছিল, “নবাবকে যখন ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল অপমান করতে করতে তখন দাঁড়িয়ে থেকে যারা এসব প্রত্যক্ষ করেছিল তারা যদি একটি করেও ঢিল ছুড়ত তবে তাকে ( ক্লাইভ) করুণ পরাজয় বরণ করতে হতো”। প্রকৃতপক্ষে পলাশীর যুদ্ধে বাংলার নবাব সিরাজুদ্দৌলা পরাজিত হননি, পরাজিত হয়েছিল বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার জনগণ।

পলাশী যুদ্ধ হয়েছে আজ থেকে প্রায় ২৬২ বছর আগে। এর মাঝে গঙ্গা-ভাগীরথী দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে, ইতিহাস বিকৃত করার চেষ্টাও হয়েছে অনেক। মীর জাফরের বংশধর বাংলার পরবর্তী নবাব ও ব্রিটিশরা মিলে দেশী-বিদেশী ফরমায়েসী লেখক ও তথাকথিত গবেষক দিয়ে ইতিহাস মুছে ফেলার কসরতও কম হয়নি। সিরাজুদ্দৌলার চরিত্রে কলঙ্ক লেপন করে কলকাতায় একটা মনুমেন্টও তৈরি করা হয়েছিল। অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত তাঁর “সিরাজুদ্দৌলা” (১৮৯৮) শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থে যুক্তি-প্রমাণ দিয়ে মনুমেন্ট তৈরি শাসকগোষ্ঠীর মিথ্যা প্রচার বলে প্রমাণ করেন। পরবর্তিতে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর উদ্যোগে ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে ২৩ শে জুন প্রথম পলাশী দিবস উদযাপিত হয় কলকাতায়। সাথে ছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং মওলানা আকরম খাঁ। ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে বাঙালি হিন্দু-মুসলিমের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ফলে ইংরেজরা বাধ্য হয় ওই হলওয়ে মনুমেন্ট তুলে নিতে।
মুর্শিদাবাদে আজও মীর জাফরকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা হয়। সেটার প্রমাণ পেয়েছিলাম ২০১৯ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে মুর্শিদাবাদ ভ্রমনকালে। উদ্দেশ্য ছিল নবাব সিরাজুদ্দৌলার সমাধি দর্শন ও বাংলার তদানীন্তন রাজধানী মুর্শিদাবাদের ঐতিহাসিক প্রত্নরূপ অবলোকন। সফরসঙ্গীর পীড়াপীড়িতে অনিচ্ছা সত্বেও মীরজাফরের বাড়ি ও কবর দেখতে নিকটস্থ জাফরাগঞ্জে যাই। গাড়ি থেকে নামতেই এক টুরিস্ট গাইডের শিকারে পরিণত হই। ঐতিহাসিক স্থাপনার ধারাবিবরণী তুলে ধরার বিনিময়ে টুরিস্টদের কাছ থেকে টুপাইস কামানোই ওদের পেশা। জাফরাগঞ্জে বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আজ্ঞাবহ মীর জাফর এবং তৎ পরবর্তী বেশ কয়েকজন নবাবের বেশ কয়েকটি আলীশান রাজপ্রাসাদ দেখলাম, যা বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পুরাকীর্তি হিসেবে সংরক্ষিত। গাইডের অনর্গল বর্ণনায় মীর জাফর এবং তৎ পরবর্তী নবাবদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ দেখে বিস্মিত হচ্ছিলাম। এই প্রথম কারো মুখে মীর জাফরের তারিফ! সবশেষে মীর জাফরের কবরের সামনে গিয়ে তার গুণকীর্তন শুরু করে দিলে রাগে ক্ষোভে নিজেকে সংবরণ করতে না পেরে এই বিশ্বাসঘাতকের কবরে থুথু ছিটিয়ে মনের জ্বালা মিটাতে গিয়ে গাইডের কোপানলে পড়ি। কে জানত ওই বেটা মীর জাফরের বংশধর; নাম তার মীর তাওকির। ‘বিদেশ বিপ্যাঁচ’- এই কথা ভুলে গাইডের সাথে তুমুল বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ি। তার সাথে যোগ দিল স্থানীয় আরো কয়েকজন। ইত্যবসরে পাশে থাকা তিনজন পুলিশ এসে বিষয়টি অবগত হয়ে গাইড এবং তার সাঙ্গপাঙ্গদের ধমক দিয়ে সরিয়ে দেন এবং আমাদের ডেকে তাঁদের গাড়িতে উঠার অনুরোধ করেন। গাড়িতে উঠেই আইনের মারপ্যাঁচে আটকে যাবার ভয়ে তটস্থ হই। ‘অনুপম শেখর’ নামে এসআই পদমর্যাদার ঐ পুলিশ কর্মকর্তার মুখে মীর জাফরের প্রতি আমার ক্ষোভের ভূঁয়সী প্রশংসা শুনে সম্বিৎ ফিরে পেলাম। তিনি জানালেন, নবাব আলীবর্দী খান ও নবাব সিরাজুদ্দৌলার স্মৃতি বিজড়িত খোশবাগ তথা মতিঝিল এলাকার বাসিন্দারা সিরাজুদ্দৌলাকে নিয়ে গর্ব করে আর জাফরাগঞ্জের অধিবাসীরা মীর জাফরের ভক্ত। তিনি আরো জানালেন, ভারতে টুরিস্টদের যথেষ্ট সুরক্ষা দেওয়া হলেও থুথু নিক্ষেপের বিষয়টি স্থানীয়দের মাঝে জানাজানি হলে আমার জন্য বিপদের সম্ভবনা ছিল। ভাগ্যিস, আমরা আপনাদের পাশে ছিলাম। বহরমপুর স্টেশনে এনে আমাদের গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়ে আন্তরিকতার সাথে বিদায় দিলেন। আজকের দিনে সেই পুলিশ কর্মকর্তা নদীয়া জেলার বাসিন্দা অনুপম শেখরকে খুব বেশী মনে পড়ছে।

নবাব সিরাজুদ্দৌলার চরিত্রে কালিমা লেপনের চেষ্টা করেও পারা যায়নি। নানা গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, তিনি ছিলেন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক, প্রজাবৎসল নবাব। চরম ভারতবিদ্বেষী বর্ণবাদী রবার্ট ক্লাইভের কুটচাল এবং কিছু বিশ্বাসঘাতকের
গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে পলাশীর প্রান্তরে তাঁর পতনের মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাধীনতাসূর্যের
অস্ত ঘটে। একইসঙ্গে পুরো ভারতে ইংরেজ
সাম্রাজ্যবাদের পথ মসৃণ হয়ে যায়। সেদিন যদি
সবাই সিরাজের পাশে থেকে ইংরেজদের
বিরুদ্ধে লড়তেন, তাহলে উপমহাদেশের ভৌগোলিক বিভাজন হতো না।

লেখক পরিচিতিঃ শিক্ষক, কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক।

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন

You cannot copy content of this page