মোঃ দিদারুল ইসলাম, চট্টগ্রাম >>> চট্টগ্রাম নগরের টাইগারপাস-লালখান বাজার এলাকায় জুলাই আন্দোলনের গ্রাফিতি অপসারণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। একই সঙ্গে সিএমপি এক গণবিজ্ঞপ্তি জারী করে জিইসি মোড় থেকে দেওয়ানহাট ফ্লাইওভার পর্যন্ত সব ধরনের সভা-সমাবেশ, মিছিল ও মিটিং নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শান্তি-শৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা বজায় রাখার স্বার্থে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ, ১৯৭৮-এর ৩০ ধারার ক্ষমতাবলে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী, ১৮ মে থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। আদেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানানো হয়।সোমবার (১৮ মে) সকালে সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলীর সই করা এক গণবিজ্ঞপ্তিতে এ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এতে বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ওই এলাকায় সব ধরনের সভা-সমাবেশ, মিছিল ও মিটিং নিষিদ্ধ থাকবে।সকাল থেকেই টাইগারপাস থেকে লালখান বাজার ও আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত সতর্ক অবস্থানে দেখা যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। সরেজমিনে দেখা যায়, টাইগারপাস মোড়ে পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অবস্থান নিয়েছেন সদস্যরা। এলাকায় সাধারণ মানুষের মাঝেও চাপা উত্তেজনা বিরাজ করতে দেখা গেছে।চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর) আমিরুল ইসলাম বলেন, “আমরা পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েই মাঠে আছি। আমি নিজেও বর্তমানে টাইগারপাস এলাকায় অবস্থান করছি। নিরাপত্তার স্বার্থে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যাতে ব্যাহত না হয়, সেজন্য সবাইকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার অনুরোধ জানাচ্ছি।”কত সংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন রয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এ মুহূর্তে সেটি বলা যাবে না। তবে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি প্রতিরোধে কাজ করছে।”এদিকে গ্রাফিতি অপসারণের অভিযোগ নিয়ে মুখ খুলেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি দাবি করেন, নগরীর কোথাও আন্দোলনের গ্রাফিতি মুছে ফেলার নির্দেশ তিনি দেননি।মেয়র বলেন, “আপনারা সরেজমিনে গিয়ে দেখতে পারেন, সেখানে কোনো গ্রাফিতি মোছা হয়নি। এ ধরনের কোনো নির্দেশ আমি কখনো দিইনি, ভবিষ্যতেও দেব না। জুলাই-আগস্টের চেতনা আমি ধারণ করি। দীর্ঘ ১৭ থেকে ১৮ বছর ধরে আমি আন্দোলনের মাঠে আছি। যারা জুলাই-আগস্টে আন্দোলন করেছে, আমি অবশ্যই তাদের সম্মান করি।”তিনি জানান, কয়েকজন যুবক নিজেদের এনসিপির নেতা পরিচয় দিয়ে তার কাছে অভিযোগ করেন যে গ্রাফিতি মুছে ফেলা হয়েছে। তবে বিষয়টি আগে থেকে তার জানা ছিল না।মেয়রের ভাষ্য, পরিচ্ছন্নতা বিভাগের কর্মীরা নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে পোস্টার অপসারণ করেছেন। তাদের দাবি, সেখানে মূলত পোস্টার ছিল, গ্রাফিতি নয়। পোস্টারের আড়ালে থাকা কিছু গ্রাফিতি দৃশ্যমান ছিল না। এখনো অনেক পিলারে সেই গ্রাফিতি রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।ডা. শাহাদাত আরও বলেন, “গ্রাফিতি আঁকার জন্য বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ছেলেরা এসেছে। আমি আমার তরফ থেকে গ্রাফিতি অঙ্কনের জন্য সহায়তা প্রদান করেছি। কোটাবিরোধী আন্দোলনের সময় থেকেই আমি তাদের সহযোগিতা করে আসছি।”রোববার (১৭ মে) রাত ১১টার দিকে নগরীর টাইগারপাস এলাকায় সিটি করপোরেশন অফিসের প্রবেশমুখে জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতিবিজড়িত গ্রাফিতি মোছাকে কেন্দ্র করে এনসিপি ও বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। এ সময় উভয়পক্ষ পাল্টাপাল্টি স্লোগান দিলে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।এর আগে রোববার রাতে লালখানবাজার থেকে দেওয়ানহাট পর্যন্ত শহীদ ওয়াসিম আক্তার ফ্লাইওভারের নিচের পিলারে নতুন রং করে বিজ্ঞাপনের জন্য নোটিশ টানানোকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এনসিপির দাবি, ওই পিলারগুলোতে জুলাই আন্দোলনের গ্রাফিতি আঁকা ছিল। কিন্তু সিটি করপোরেশন সেগুলো মুছে বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের জন্য ভাড়া দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।এর প্রতিবাদে রাত ৮টা থেকে নগর ভবনের সামনে বিক্ষোভ শুরু করেন এনসিপি নেতাকর্মীরা। একপর্যায়ে তারা সড়ক অবরোধ করে নতুন করে গ্রাফিতি আঁকা শুরু করেন। এতে নেতৃত্ব দেন এনসিপির সদস্য সচিব আরিফ মাঈনুদ্দিন।রাত সাড়ে ১০টার দিকে সেখানে জড়ো হন ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপির নেতাকর্মীরা। তারা রাস্তার ব্যারিকেড সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে এনসিপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। পরে দুই পক্ষ পাল্টাপাল্টি অবস্থান নিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকে। পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। রাত ১২টার দিকে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন ঘটনাস্থলে এসে বিএনপির নেতাকর্মীদের সরিয়ে নিয়ে যান।


মন্তব্য