মোঃ সোহেল রানা, বান্দরবান প্রতিনিধি >>> কোমর তাঁত পার্বত্য অঞ্চলের নারীদের অন্যতম প্রধান উপার্জনের উৎস। কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে নয়, সম্পূর্ণ ব্যক্তি উদ্যোগে ঘরে ঘরে এই শিল্প গড়ে তুলেছেন পাহাড়ি ত্রিপুরা নারীরা। পার্বত্য অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ জুমচাষের ওপর নির্ভরশীল। সেই সঙ্গে অবসর সময়ে নারীরা কোমর তাঁতে পিনন, থামি, ওড়না ও মাফলার বুনে থাকেন।নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে অতিরিক্ত কাপড় সাপ্তাহিক হাটে বিক্রি করে তাঁরা বাড়তি আয় করেন এবং ক্রমশ সাবলম্বী হয়ে উঠছেন। কাঠ ও বাঁশের তৈরি কাঠির মাধ্যমে কোমরের সঙ্গে তাঁতটি বিশেষভাবে বাঁধা হয়, সেই থেকেই এর নাম ‘কোমর তাঁত’।বান্দরবান জেলা ও আশপাশের পর্যটন এলাকার কিছু দোকানে পাহাড়ি নারীদের তৈরি কোমর তাঁতের শাল, থামি, পিনন, চাদর, মাফলার ও জামাকাপড় বিক্রি হয়। এছাড়াও বান্দরবান, চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও এই ত্রিপুরা নারীদের তৈরি পণ্য সরবরাহ করা হয়।বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার ২নং তারাছা ইউনিয়নের সিনাই পাড়ার ২নং ওয়ার্ডে বসবাসকারী স্থানীয় ত্রিপুরা নারীরা কোমর তাঁতে কাপড় বুনতে অত্যন্ত দক্ষ। তাঁরা বাজার থেকে সুতা, উলের সুতা ও পাহাড়ি তুলা সংগ্রহ করে ঘরে বসেই কাপড় বুনেন। নিজেদের পরিধেয় পোশাক তাঁরা নিজেরাই কোমর তাঁতে তৈরি করেন।গৃহস্থালি কাজ ও জুমচাষের পাশাপাশি অবসর সময়ে তাঁত চালিয়ে কাপড় তৈরি করেন এই নারীরা। একজন নারী চাইলে প্রতি মাসে কোমর তাঁতের মাধ্যমে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা আয় করতে পারেন।তারাছা ইউনিয়নের সিনাই পাড়ায় সরেজমিনে গেলে দেখা যায়, রুস্মাইতি ত্রিপুরা (৪৮) নামের এক নারী ঐতিহ্যবাহী ‘রিনাই’ নামের পোশাক বুনছেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি মায়ের কাছ থেকে এই কাজ শিখেছেন এবং গত ৩৪ বছর ধরে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত আছেন। ঐতিহ্যবাহী এই পোশাক নিজেরা তৈরি করলেও অনেক সময় গ্রামের অন্যান্য নারীর অর্ডারেও পোশাক তৈরি করেন তিনি।প্রতিটি রিনাইয়ের দাম সুতার গুণমান অনুযায়ী ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। একটি রিনাই প্রস্তুত করতে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ দিন সময় লাগে।ধ্রুবতারা ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি সুনিল ত্রিপুরা জানান, “কোমর তাঁত বা উঠান তাঁতে তৈরি পণ্য—যেমন থামি (রিনাই), ওড়না (রিশা) ইত্যাদি—ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু স্থানীয়ভাবে এসব পণ্যের বাজারজাতকরণের কোনো কার্যকর সুযোগ নেই। সরকারি সহায়তায় বিপণনের সুব্যবস্থা না হলে এই শিল্প কেবল গৃহস্থালি পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকবে। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।”দশকের পর দশক ধরে পাহাড়ি নারীরা এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবারের ব্যয়, সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ—সবকিছুই আসে এই তাঁতশিল্প থেকেই।স্থানীয়দের পাশাপাশি পাহাড়ে বেড়াতে আসা পর্যটকদের কাছেও কোমর তাঁতের পণ্যের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। তবে সে অনুযায়ী সরকারি সহায়তা না থাকায় অনেক নারী শিল্পী হতাশা প্রকাশ করেছেন।


মন্তব্য