১১ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৭শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ |
শিরোনাম:
অতিরিক্ত সার মজুদ করায় রুহিয়ায় ব্যবসায়ীকে জরিমানা, বিভিন্ন ডিলার পয়েন্ট পরিদর্শন পুলিশের ধাওয়া, ব্রিজ থেকে নদীতে ঝাঁপ শেষ রক্ষা হয়নি মাদক কারবারির কক্সবাজারের দুই বেসরকারি হাসপাতালে কউকের অভিযান, মিলেছে অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা পটিয়া আল জামিয়া আল ইসলামিয়া মাদ্রাসায় কওমি শিক্ষা বোর্ডের বার্ষিক অধিবেশন। নজরুলের মানবিক চেতনা ধারণ করতে হবে: ডিসি জাহিদ ঈদগাঁও বাজার ও স্টেশনে ৭টি খাবার হোটেলে ২ লক্ষ ১০ হাজার টাকা জরিমানা বিজিবি কর্তৃক রাজশাহী সীমান্তে অভিযান পরিচালনা করে ভারতীয় যৌন উত্তেজক ট্যাবলেট এবং চোরাচালানী মালামাল জব্দ সাতকানিয়ায় ১৪৯ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৪০ পদ শূন্য: ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান তিন সন্তান জন্মের আনন্দ ম্লান, চিকিৎসা-খাবারের খরচে বিপাকে পরিবার অন্ধ সমাজ পরিবর্তনে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে
আন্তর্জাতিক:
বিশ্ব শিক্ষক দিবসে ফের ভাইরাল ‘থ্রি ইডিয়টস’-এর সেই চ্যালেঞ্জ জাতীয় শোক দিবস ১৫ আগস্ট; বাঙালির হৃদয়ে চির অমর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মাদার তেরেসা গোল্ডেন অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত শিল্পী শিমলা নেপালে হিমবাহ ধসে বন্যা: নিহত ৩১, নিখোঁজ ৩৮৪ পর্যটক ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের সেবায় অটল ইউএনআরডব্লিউএ, কার্যক্রম বন্ধের দাবি প্রত্যাখ্যান বদলাচ্ছে বৈশ্বিক বিমান চলাচলের চিত্র: দুবাইয়ের ট্রানজিট প্রবণতা ও নতুন ডিজিটাল নিয়ম নেপালে বন্যা ও ভূমিধস: ১৫৭ জনের প্রাণহানি, নিখোঁজ চার শতাধিক জাতিসংঘের ভোকেশনাল কেন্দ্রে ইসরাইলি বাহিনীর তল্লাশি, অগ্নিনির্বাপণে বাধা বিশ্বজুড়ে মার্কিন ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্থগিত: ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন পদক্ষেপ ইসলামাবাদের হাসপাতালে এসি বিস্ফোরণে ১৫ নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যু
     
             

বস্তির শিশুদের ৫৮.২ শতাংশের নেই জন্মসনদ: এক কাগজের অভাবে রুদ্ধ ভবিষ্যৎ

  

জন্মসনদ নেই—এই একটি কাগজের অভাবই যেন বস্তি ও পথের শিশুদের জীবনে একের পর এক দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে। স্কুলে ভর্তি থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ কিংবা সামাজিক সুরক্ষার সুবিধা পাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই তারা বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। একটি জন্মসনদ কেবল পরিচয়পত্র নয়, বরং এটি একজন শিশুর নাগরিক অধিকারের প্রবেশদ্বার। অথচ এই অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশের বিশাল একটি অংশ।

২০২৫ সালে বাংলাদেশ নিয়ে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কারিতাসের এক জরিপে দেখা গেছে, পথে বেড়ে ওঠা শিশুদের ৫৮ দশমিক ২ শতাংশের জন্মসনদ নেই। একই জরিপে আরও উঠে এসেছে, বস্তি এলাকার ৯১ দশমিক ৭ শতাংশ পরিবার সরকারি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতার বাইরে রয়েছে। ঢাকা, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী শহরের ৬৬৭ জন পথশিশু এবং বস্তি এলাকায় বসবাসরত ১ হাজার ২৪৬টি পরিবারের ওপর এই জরিপটি পরিচালিত হয়। এতে অংশ নেওয়া পথশিশুদের ৫১ দশমিক ৬ শতাংশ বর্তমানে শিক্ষার মূলধারার বাইরে রয়েছে।

জন্মসনদহীন শৈশবের করুণ চিত্র ফুটে ওঠে রাজধানীর মিরপুর মিল্কভিটাগলি, সেকশন-৭, ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ঝিলপাড় বস্তির বিলকিস বানুর জীবনে। বয়স মাত্র ১৮ বছর, কিন্তু এরই মধ্যে তার কোলে তিন বছরের সন্তান। মাত্র ১৫ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল বিলকিসের। এত অল্প বয়সে বিয়ের কারণ জানতে চাইলে সে কোনো উত্তর দিতে পারে না, কেবল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। যেন নিজের জীবনের এই পরিণতির কোনো ব্যাখ্যাই তার জানা নেই।

একই বস্তির ১৬ বছর বয়সী আছিয়া জানায়, তাদের আদি বাড়ি রংপুরে। সেখানে দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের অল্প বয়সেই বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা প্রকট। আছিয়া আক্ষেপ করে বলে, ‘জন্মসনদ না থাকায় ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত অপেক্ষা করা লাগে না।’ তার এই কথায় জন্মনিবন্ধনের সঙ্গে বাল্যবিবাহের একটি অদৃশ্য যোগসূত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জন্মসনদ না থাকায় বয়সের প্রমাণ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, যা বাল্যবিবাহকে উৎসাহিত করছে।

মিরপুরের ৬ নম্বর ওয়ার্ড কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, এখানে প্রায় ২৫ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা চারটি বস্তিতে ৫০ হাজারের বেশি মানুষের বসবাস। এর মধ্যে ৮ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যাই ৮ হাজারেরও বেশি। জন্মনিবন্ধন করাতে গিয়ে দালালের খপ্পরে পড়ার অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, জন্মনিবন্ধনের জন্য দালালরা তাদের কাছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত দাবি করে, যা এই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য অসম্ভব।

রাজধানীর ঝিলপাড়, চলন্তিকা ও আরামবাগ বস্তি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, জন্মনিবন্ধন না থাকা এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের জটিলতায় বহু শিশু স্কুলের দোরগোড়া থেকে ফিরে আসছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন স্কুলের বাইরে থাকা শিশুদের অনেকেই মোবাইল ফোনে আসক্ত হয়ে পড়ছে। কেউ কেউ জড়িয়ে পড়ছে বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রমের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করা জরুরি।

ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ড সচিব মো. আব্দুল সামাদ জানান, তারা পথশিশু বা যাদের বাবা-মা নেই, তাদের জন্মনিবন্ধনের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। তবে ভাসমান ও স্থায়ী ঠিকানাবিহীন পরিবারের শিশুদের জন্মনিবন্ধন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। নিয়ম অনুযায়ী জন্মস্থান বা বর্তমান ঠিকানা থাকলে নিবন্ধনের সুযোগ থাকলেও বাস্তবে তা প্রয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের যৌথ তথ্য অনুযায়ী, দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী ৪১ শতাংশ শিশুর জন্মনিবন্ধন নেই।

স্থানীয় সরকার বিভাগের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের রেজিস্ট্রার জেনারেল মো. যাহিদ হোসেন বলেন, ঢাকায় স্থায়ী ঠিকানাবিহীন মানুষের আধিক্য থাকায় নিবন্ধনের হার কম। তিনি জানান, শহরের ভাসমান জনগোষ্ঠীর জন্মনিবন্ধন নিশ্চিত করতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী উন্নয়ন সংস্থাকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এ নিবন্ধনের মূল দায়িত্ব পালন করছে। তিনি দাবি করেন, আনুষ্ঠানিকভাবে স্কুলে যাওয়া সব শিশুর জন্মনিবন্ধন রয়েছে, কারণ তা ছাড়া শিক্ষাজীবন শুরু করা সম্ভব নয়।

কারিতাস ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের পরিচালক থিওফিল নকরেক বলেন, জন্মসনদবিহীন শিশুদের ৭১ দশমিক ৪ শতাংশ তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। তিনি বলেন, ‘জন্মসনদ না থাকা শুধু প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি একটি মানবাধিকার সংকট।’ জন্মসনদ না থাকলে শিশুরা বিদ্যালয়ে ভর্তি, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ, সরকারি ভাতা পাওয়া এবং ভবিষ্যতে নাগরিক হিসেবে বিভিন্ন অধিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধার সম্মুখীন হয়। তিনি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ও জন্মনিবন্ধন দপ্তরের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের ওপর জোর দেন।

বর্তমানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সরাসরি জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন করতে পারে না। জন্মের পর পরিবারকে আলাদা দপ্তরে গিয়ে নিবন্ধনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়, যা অনেক সময় দরিদ্র পরিবারের জন্য জটিল হয়ে দাঁড়ায়। সংশ্লিষ্টদের মতে, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অনেক দেশে হাসপাতালে জন্মের পরপরই নিবন্ধনের দায়িত্ব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ওপর ন্যস্ত থাকে, যা বাংলাদেশেও কার্যকর করা যেতে পারে।

পরিস্থিতি উত্তরণে কারিতাস বাংলাদেশের পক্ষে সংস্থার পরিচালক দাউদ জীবন দাশ সরকার ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ওয়ার্ডভিত্তিক ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে শতভাগ জন্মনিবন্ধন নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে পিতামাতাহীন শিশুদের নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করা এবং শিশুশ্রম বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। ঝরে পড়া শিশুদের শনাক্ত করে পুনরায় শিক্ষার মূলধারায় ফিরিয়ে আনার জন্য সমন্বিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই বলে তারা মনে করেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-১০-এর নির্বাহী কর্মকর্তা আক্তার উন্নেছা শিউলী বলেন, ঢাকায় বসবাসকারী অধিকাংশ মানুষই অস্থায়ী এবং ভাড়াটিয়া। জন্মনিবন্ধনের একটি নিয়ম হলো স্থায়ী ঠিকানায় নিবন্ধন করা, যা অনেক সময় ভাসমান মানুষের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তিনি আরও জানান, জন্মনিবন্ধনসহ বিভিন্ন সেবা নিতে অফিসে আসা মানুষের মধ্যে নারীদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম, তবে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে সেবা নিতে অফিসে স্বাগত জানানো হয়। রাষ্ট্র হিসেবে এই শিশুদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে না পারলে আমরা অনেকাংশেই পিছিয়ে যাব বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।

নিবন্ধনে অগ্রগতি, তবুও রয়ে গেছে বড় ঘাটতি- জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, দেশে প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৫০ হাজার জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন হচ্ছে।

এ বয়সী শিশুদের জন্মসনদ রয়েছে ৪৭ শতাংশের।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের যৌথ জরিপের সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, অনূর্ধ্ব-৫ বছর বয়সী শিশুদের জাতীয়ভাবে জন্মনিবন্ধনের হার বর্তমানে ৫৯ শতাংশ, যা ২০১৯ সালে ছিল ৫৬ শতাংশ।

পাশাপাশি সংশোধনের আবেদনও নিষ্পত্তি করা হচ্ছে।

অর্থাৎ কয়েক বছরে কিছুটা অগ্রগতি হলেও সর্বজনীন জন্মনিবন্ধনের লক্ষ্যের তুলনায় এই হার এখনো অনেক কম।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে ২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন নিশ্চিত করার অঙ্গীকার রয়েছে সরকারের।

এ কাজে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

দারিদ্র্যপীড়িত জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা ভাতার পরিমাণ বাস্তবসম্মতভাবে বাড়ানো এবং আবেদন প্রক্রিয়া সহজ করারও দাবি জানিয়েছেন তিনি।

মাসিক ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকা কখনোই বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী সহায়তা হতে পারে না।

তিনি বলেন, পথ ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচিও হাতেগোনা।

তাই তাদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে অবিলম্বে সরকারসহ আমাদের সবার নজর দিতে হবে।’

কেউ আবার দারিদ্র্য ও কাগজপত্রের জটিলতায় জন্মের পর থেকেই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রান্তে পড়ে আছে।

এর অর্থ হলো—রাষ্ট্রের হিসাবের খাতায় প্রতিটি শিশুর অস্তিত্ব নিশ্চিত করা, তার অধিকার স্বীকার করা এবং ভবিষ্যতের জন্য তাকে একটি পরিচয় দেওয়া।

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন

You cannot copy content of this page