এনামুল হক রাশেদী,চট্টগ্রাম >>> চট্টগ্রাম নগরীর প্রবর্তক মোড়ের মিমি সুপার মার্কেটের নিউ কনক বাহার জুয়েলার্স থেকে প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের স্বর্ণের চুড়ি আত্মসাতের ঘটনায় বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। দোকানের দীর্ঘদিনের এক কর্মচারী দায়িত্বের সুযোগ নিয়ে স্বর্ণ সরিয়ে তা একাধিক জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান ও স্বর্ণ বন্ধকী ব্যবসায়ীর কাছে রেখে টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পরে সেই স্বর্ণ হাতবদল হয়ে ছড়িয়ে পড়ে নগরের বিভিন্ন এলাকায়।পুলিশের তদন্তে এখন পর্যন্ত আত্মসাৎ হওয়া ৫৩টি চুড়ির মধ্যে ৫৫টি চুড়ি উদ্ধারের কথা জানানো হয়েছে। এ ঘটনায় দোকানের কর্মচারীসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে উদ্ধার হওয়া স্বর্ণের সংখ্যা, বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বন্ধক রাখার প্রক্রিয়া এবং কারা জেনেশুনে এসব স্বর্ণ গ্রহণ করেছেন—এসব বিষয় নিয়ে তদন্তে আরও তথ্য বেরিয়ে আসছে।স্টকের চুড়ির জায়গায় ইমিটেশনঃপুলিশ ও মামলার তথ্য অনুযায়ী, গত ১৪ আগস্ট দুপুরে নিউ কনক বাহার জুয়েলার্সের কর্মীরা নিয়মিত মজুদ যাচাই করতে গিয়ে স্বর্ণের হিসাবে অসঙ্গতি দেখতে পান। পরে মোবাইল ফোনে বিষয়টি দোকান মালিক বিপ্লব বসাককে জানানো হয়।মালিক দোকানের উদ্দেশে রওনা হলে বিষয়টি টের পান দীর্ঘদিনের সেলসম্যান রোমেন দে। এরপর ওয়াশরুমে যাওয়ার কথা বলে কৌশলে দোকান থেকে বেরিয়ে যান তিনি।পরে দোকানের সাতটি বক্স পরীক্ষা করে দেখা যায়, সেখানে থাকা ৫৩টি স্বর্ণের চুড়ি নেই। চুরি গোপন করতে স্বর্ণের চুড়ির পরিবর্তে বক্সে রাখা হয়েছিল ইমিটেশনের চুড়ি। পুলিশের হিসাবে, আত্মসাৎ হওয়া এসব স্বর্ণের আনুমানিক মূল্য প্রায় ১ কোটি ৮৮ লাখ ২৯ হাজার ৯০০ টাকা। এ ঘটনায় ১৫ আগস্ট পাঁচলাইশ মডেল থানায় মামলা করেন দোকান মালিক।১২ বছরের আস্থার সুযোগঃতদন্তে পুলিশ জানতে পারে, রোমেন দে প্রায় ১২ থেকে ১৩ বছর ধরে ওই প্রতিষ্ঠানে সেলসম্যান হিসেবে কাজ করছিলেন। দীর্ঘদিনের কর্মচারী হওয়ায় দোকানের স্বর্ণের মজুদ, সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং হিসাব-নিকাশ সম্পর্কে তার ভালো ধারণা ছিল।প্রশ্ন উঠেছে—একজন কর্মচারী কীভাবে একসঙ্গে এতগুলো স্বর্ণের চুড়ি সরিয়ে ফেললেন এবং পরে সেগুলো একাধিক জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান ও বন্ধকী ব্যবসায়ীর কাছে পৌঁছে দিলেন? তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এই প্রশ্নের উত্তরই।বন্ধক রাখার পর একাধিকবার হাতবদলঃমামলার তদন্তে তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে মঙ্গলবার রাত ২টার দিকে সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট মহাসড়ক এলাকা থেকে রোমেন দেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।পরে আদালতের অনুমতি নিয়ে তাকে তিন দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে রোমেন দে জানান, আত্মসাৎ করা স্বর্ণের চুড়িগুলো তিনি বিভিন্ন জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান ও স্বর্ণ বন্ধকী ব্যবসায়ীর কাছে রেখে টাকা নিয়েছেন।তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ জানতে পারে, ৫৩টি চুড়ির মধ্যে ৪৬টি বাকলিয়া থানাধীন মিয়াখান নগর রোডের মর্ডাণ ইরানী জুয়েলার্সের মালিক শ্যামল সিংহের কাছে বন্ধক রাখা হয়েছিল।এরপর ১৯ আগস্ট রাতে বোয়ালখালীর কানুনগোপাড়া এলাকা থেকে শ্যামল সিংহকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মর্ডাণ ইরানী জুয়েলার্স থেকে সাতটি চুড়ি উদ্ধার করা হয়।এক জায়গা থেকে ছড়িয়ে পড়ে নগরের বিভিন্ন এলাকায়ঃপুলিশের দাবি, শ্যামল সিংহকে জিজ্ঞাসাবাদে আরও তথ্য পাওয়া যায়। তার কাছে থাকা স্বর্ণের একটি অংশ পরে বিভিন্ন জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান ও বন্ধকী ব্যবসায়ীর কাছে দেওয়া হয়েছিল।এরপর অভিযান চালিয়ে মর্ডাণ রিনা জুয়েলার্স থেকে তিনটি, সাহা জুয়েলার্স থেকে ১৬টি, লিটন মহাজনের কাছ থেকে একটি, সাগর কারিগরের কাছ থেকে পাঁচটি, পার্থ মহাজনের কাছ থেকে ১১টি এবং রুবেল মহাজনের কাছ থেকে তিনটি চুড়ি উদ্ধার করা হয়।এছাড়া রোমেন দের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মর্ডাণ রিয়া জুয়েলার্স থেকে তিনটি, শাহ আমানত জুয়েলার্স থেকে তিনটি, চকবাজারের ফেন্সী জুয়েলার্স থেকে দুটি এবং তাজমহল জুয়েলার্স থেকে একটি চুড়ি উদ্ধার করে পুলিশ।অর্থাৎ, একটি জুয়েলারি দোকান থেকে আত্মসাৎ হওয়া স্বর্ণ অল্প সময়ের মধ্যেই একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে এটি শুধু একজন কর্মচারীর আত্মসাতের ঘটনা, নাকি এর সঙ্গে একটি বড় ধরনের স্বর্ণ কেনাবেচা ও বন্ধকী নেটওয়ার্ক জড়িত—তদন্তে সেটিও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।স্বর্ণ গ্রহণকারীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নঃঅনুসন্ধানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—এত বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ যখন বন্ধক রাখা হলো, তখন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা এর উৎস সম্পর্কে কোনো যাচাই করেছিলেন কি না।একজন কর্মচারীর কাছে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণের চুড়ি থাকা, সেগুলো বন্ধক নেওয়া এবং পরে আবার অন্য ব্যবসায়ীর কাছে দিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, পরিচয় ও মালিকানার তথ্য যাচাই করা হয়েছিল কি না—এসব বিষয় এখন তদন্তের আওতায় আসা প্রয়োজন।তবে পুলিশ এখন পর্যন্ত যাদের গ্রেপ্তার করেছে, তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত থাকার বিষয়টি আদালতে প্রমাণিত হয়নি। তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় তাদের ভূমিকা নির্ধারিত হবে।দোকানের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও প্রশ্নের মুখেঃঘটনাটি জুয়েলারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও মজুদ ব্যবস্থাপনাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। একজন দীর্ঘদিনের কর্মচারী কীভাবে ৫৩টি স্বর্ণের চুড়ি সরিয়ে ইমিটেশনের চুড়ি দিয়ে তা প্রতিস্থাপন করলেন, সেটি তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।বিশেষ করে নিয়মিত স্টক যাচাই কত ঘন ঘন করা হতো, স্বর্ণের বক্সগুলো কারা দেখভাল করতেন, কর্মচারীদের দায়িত্ব বণ্টন কী ছিল এবং দোকানে সিসিটিভি বা অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হলে ঘটনার পুরো চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে।পুলিশের বক্তব্য নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (উত্তর) সোহেল পারভেজ বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে রোমেন দে জানিয়েছেন, নিউ কনক বাহার জুয়েলার্স থেকে স্বর্ণের চুড়িগুলো সরিয়ে কয়েকটি জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান ও বন্ধকী ব্যবসায়ীর কাছে রেখে টাকা নিয়েছেন। বিভিন্ন জায়গায় বন্ধক রাখা স্বর্ণের চুড়ি উদ্ধার কর


মন্তব্য