চলতি বছরের জুন ও জুলাই মাসে ইউরোপজুড়ে বয়ে যাওয়া তীব্র তাপপ্রবাহ ও দীর্ঘস্থায়ী খরা মহাদেশটির অর্থনীতিতে বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। অস্বাভাবিক এই উষ্ণ আবহাওয়ার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পণ্য পরিবহন এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের দাবানল অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
জার্মানির ম্যানহাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ সেহরিশ উসমানের মতে, তাপপ্রবাহ, খরা এবং দাবানল একই সময়ে ও অঞ্চলে আঘাত হানায় অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি বহুগুণ বেড়ে গেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে ১০ আগস্ট পর্যন্ত ৫ লাখ ৪২ হাজার ৯২৬ হেক্টর এলাকা দাবানলে পুড়েছে, যেখানে ১ হাজার ৫৯৯টি পৃথক দাবানলের ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে। মোট ১২.৩ লাখ একরেরও বেশি জমি এই অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তীব্র গরমে ইউরোপের প্রধান নদীপথ রাইন ও দানিউবে পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে, যা পণ্য পরিবহণ ব্যবস্থাকে স্থবির করে তুলেছে। নেদারল্যান্ডসভিত্তিক ব্যাংক আইএনজির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, রাইন নদীতে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার কারণে জার্মানির জিডিপি চলতি বছর ০.৩ শতাংশ পয়েন্ট কমতে পারে। হাঙ্গেরির এমবিএইচ ব্যাংকের মতে, দেশটির প্রধান পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নিয়মিত বন্ধ রাখতে হওয়ায় জিডিপিতে ০.১ শতাংশ পয়েন্টের ক্ষতি হচ্ছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনেও বড় ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে। শীতলীকরণ ব্যবস্থার সমস্যার কারণে ইউরোপের বেশ কয়েকটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হয় বন্ধ রাখতে হয়েছে, নয়তো উৎপাদন কমিয়ে দিতে হয়েছে। জার্মান বীমা সংস্থা অ্যালিয়ান্সের তথ্য অনুযায়ী, শুধু জুনের দুই সপ্তাহের তাপপ্রবাহের কারণে ইউরোপের জিডিপি ০.৩ শতাংশ পয়েন্ট হ্রাস পেতে পারে। ২০৩০ সালের মধ্যে স্পেন, ফ্রান্স ও ইতালির মতো দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কৃষিখাতও এই দুর্যোগ থেকে রেহাই পায়নি। জুলাই মাসেই ভুট্টা ও সূর্যমুখীর মতো দেরিতে কাটা ফসলের ৬ থেকে ৭ শতাংশ ক্ষতি হয়েছে। আলিয়ান্সের অর্থনীতিবিদ হাজেম ক্রিচেন সতর্ক করেছেন যে, এই বছরের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হবে এবং ইউরো জোনের প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এছাড়া পর্যটন খাতেও বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে; তীব্র গরমের কারণে পর্যটকরা দক্ষিণ ইউরোপের পরিবর্তে উত্তরের দিকে ঝুঁকছেন।
কোপারনিকাস জলবায়ু পরিবর্তন পরিষেবার তথ্যমতে, ২০২৬ সালের গ্রীষ্মের প্রথম দুই মাস স্বাভাবিকের চেয়ে ২.৭৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি উষ্ণ ছিল। অস্ট্রিয়া ও স্লোভাকিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশে জাতীয় তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে গেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রাও রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে, যা ইউরোপের উপকূলীয় অঞ্চলে বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
তীব্র খরায় মাটি তার প্রাকৃতিক শীতলতা হারিয়ে ফেলায় দাবানলের ঝুঁকি আরও বেড়েছে। কোপারনিকাস অ্যাটমোস্ফিয়ার মনিটরিং সার্ভিসের পরিচালক লরেন্স রুইল জানিয়েছেন, দাবানলের ফলে মহাদেশজুড়ে কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধি পাওয়ায় বায়ুর গুণমান মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
গত জুনের শেষদিকে তীব্র গরমে ইউরোপে ১০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইউরোপীয় বন অগ্নিকাণ্ড তথ্য ব্যবস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্পেন, ফ্রান্স ও ইতালিতে সবচেয়ে বেশি জমি পুড়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় লেইডা বিশ্ববিদ্যালয়ের বন প্রকৌশলের অধ্যাপক ভিক্টর রেস্কো দে দিওস বৃক্ষরোপণকে অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন নগর পরিকল্পনার ওপর জোর দিয়েছেন।
ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর মিডিয়াম-রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টের জলবায়ুবিষয়ক কৌশলগত প্রধান সামান্থা বার্জেসের মতে, জুন ও জুলাই মাসের দীর্ঘস্থায়ী খরা ও তাপমাত্রা একটি উষ্ণ আবহাওয়ার চক্র তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতি কেবল বর্তমান অর্থনীতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, এর প্রভাব আগামী কয়েক বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুতগতিতে বাড়ছে এবং সরকারি অর্থায়নের ওপর চাপের সৃষ্টি হয়েছে। মুদ্রাস্ফীতির অস্থিরতা ও পর্যটন মানচিত্রের পরিবর্তন ইউরোপীয় অর্থনীতিকে এক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। রয়টার্স, গার্ডিয়ান ও আল জাজিরার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, এই দুর্যোগের অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ শত শত বিলিয়ন ইউরো ছাড়িয়ে গেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ইউরোপের প্রধান নদীগুলো—সেন, রাইন ও দানিউবের পানির স্তর কমে যাওয়া মহাকাশ থেকেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পণ্য পরিবহণ পদ্ধতির আমূল পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, ইউরোপের অর্থনীতি এখন জলবায়ু পরিবর্তনের এক কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দাবানল ও খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো কেবল পরিবেশগত বিপর্যয়ই নয়, বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নেদারল্যান্ডসভিত্তিক বহুজাতিক ব্যাংক ও আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান আইএনজির মতে, শুধু রাইন নদীতে যান চলাচল বন্ধ থাকার কারণেই বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি জার্মানির জিডিপি এই বছর ০.৩ শতাংশ পয়েন্ট কমে যাবে।
অন্যদিকে হাঙ্গেরির এমবিএইচ ব্যাংক মনে করছে, দেশটির বৃহত্তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি প্রতি সপ্তাহে বন্ধ থাকার কারণে জিডিপিতে ০.১ শতাংশ পয়েন্টের ক্ষতি হবে।
তাছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে স্পেন, ফ্রান্স ও ইতালির মতো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অর্থনীতিগুলোর প্রবৃদ্ধি ৫-৭% কমে যাবে।
বছরের শুরু থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন জুড়ে প্রায় পাঁচ লাখ হেক্টর এলাকা পুড়ে গেছে।
অন্য যেকোনো মহাদেশের তুলনায় ইউরোপে জলবায়ু দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং ক্ষয়ক্ষতি সরকারি অর্থায়নের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
মুদ্রাস্ফীতির ব্যাপক ওঠানামা ঘটাচ্ছে।
পর্যটনের মানচিত্র নতুন করে আঁকতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পণ্য পরিবহণের পদ্ধতি নিয়েও নতুন কর্মপরিকল্পনা সাজাতে হচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় এটি অনেক বেশি।
কৃষি উৎপাদনের পূর্বাভাস হ্রাস পেয়েছে।
আইএনজির অর্থনীতিবিদ কার্স্টেন ব্রজেস্কি মনে করেন, তীব্র তাপমাত্রায় দক্ষিণ ইতালি বা স্পেনে পর্যটকদের দেখা মিলছে না।
এ কারণেগ্রীষ্মকালীন পর্যটকদের আনাগোনা কমে যাবে।
পর্যটকরা উত্তরের দিকে চলে যাবে, যা দক্ষিণের পর্যটনে প্রভাব ফেলবে।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, জুলাই মাসে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে রেকর্ড গড়েছে।
আগের যে কোনো জুলাইয়ের চেয়ে তা বেশি।
পশ্চিম ইউরোপে বিধ্বংসী তাপপ্রবাহ আঘাত হানার ফলেই এটা হয়েছে।
ইইউর কোপারনিকাস জলবায়ু পরিবর্তন পরিষেবা জানিয়েছে, আটলান্টিক উপকূল ও পশ্চিম ভূমধ্যসাগরে জুলাই মাসের জন্য সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।
বিশ্বব্যাপী শীতল মেরু অঞ্চলের বাইরে সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা এই মাসের জন্য রেকর্ড সর্বোচ্চ ছিল।
কোপার্নিকাস সোমবার জানিয়েছে, ২০২৬ সালের গ্রীষ্মের প্রথম দুটি মাস স্বাভাবিকের চেয়ে ২.৭৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি উষ্ণ ছিল, যা চার বছর আগের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যায়।
মধ্য ইউরোপ তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত হয়েছে।
ফলে তাপে গাছপালা শুকিয়ে দাবানলের পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
গরম, শুষ্ক এবং ঝড়ো হাওয়ার পরিস্থিতিতে দাবানল আরো বেপরোয়া হয়েছে।
ইইউর প্রতিবেদন অনুসারে, এবারের তাপপ্রবাহে ইউরোপে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
সূত্র: যুগান্তর


মন্তব্য