আব্দুল্লাহ আল মারুফ, চট্টগ্রাম সংবাদদাতা >>> দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কক্সবাজারের মহেশখালীতে প্রায় ৮ হাজার ২২২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং’ (এসপিএম) প্রকল্প। লক্ষ্য ছিল গভীর সমুদ্র থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে দ্রুত জ্বালানি খালাস এবং জরুরি পরিস্থিতির জন্য বিশাল মজুত গড়ে তোলা। তবে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও অব্যবস্থাপনা ও কারিগরি সংকটে প্রকল্পটি এখন কার্যত স্থবির হয়ে আছে। বিশাল এই মজুতাগারে বর্তমানে সংরক্ষিত নেই এক ফোঁটা জ্বালানি তেলও।অব্যবস্থাপনায় আটকে আছে বিশাল বিনিয়োগ >>প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ব্যবস্থাপনা ও সক্ষমতার মধ্যে সঠিক সমন্বয় না থাকায় এই বিশাল অবকাঠামোটি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এসপিএম প্রকল্পের পরিচালক নাহিদ জামান জানান, ২০২৪ সালে অবকাঠামোগত কাজ শেষ করে পরীক্ষামূলকভাবে তেল মজুত করতে গিয়ে কিছু কারিগরি ত্রুটি ধরা পড়ে। একই সঙ্গে লজিস্টিক সহায়তার অভাবে প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। তবে চলতি বছরের মধ্যেই এসব সমস্যা সমাধান করে এটি সচল করার আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।প্রকল্পের পটভূমি ও লক্ষ্য >>২০১৫ সালে গৃহীত এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল গভীর সমুদ্রে বড় তেলবাহী জাহাজ থেকে সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি খালাস করা। বর্তমানে বড় ট্যাংকারগুলো বন্দরে ঢুকতে না পারায় গভীর সমুদ্রে নোঙর করে ছোট জাহাজের মাধ্যমে তেল খালাস করতে হয়, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ।এসপিএম প্রকল্পের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো >>সমুদ্রতলে নির্মিত ১১০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন।মহেশখালীর কালারমারছড়ায় স্থাপিত বিশাল স্টোরেজ ট্যাংক।ইস্টার্ন রিফাইনারির সঙ্গে সরাসরি সংযোগ।উন্নত পাম্পিং স্টেশন ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা।কেন কাজে আসছে না এই অবকাঠামো৷ >>সূত্রমতে, ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ সময়মতো শেষ না হওয়ায় এসপিএম-এর পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এছাড়া প্রকল্প পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দক্ষ অপারেটর নিয়োগ নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলেও উচ্চমূল্য ও স্বচ্ছতার অভাবে বারবার প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে নির্মাণ শেষেও অপারেশনাল কার্যক্রম শুরু করা যায়নি।বাড়ছে ঋণের বোঝা ও উদ্বেগ >>প্রকল্পটির বড় অংশ অর্থায়ন করেছে চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই ঋণের কিস্তি সুদসহ পরিশোধ করতে হবে। একদিকে রাষ্ট্র যখন বৈদেশিক ঋণের চাপে রয়েছে, অন্যদিকে কয়েক হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ সুফল না দিয়ে পড়ে আছে।বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রকল্প গ্রহণের আগে সঠিক সমীক্ষা ও আনুষঙ্গিক অবকাঠামোর (যেমন রিফাইনারি সম্প্রসারণ) প্রস্তুতি না থাকায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন যে, সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে এই মুহূর্তে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে প্রকল্পটি কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না।জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত লজিস্টিক সংকট দূর করে এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দক্ষ জনবল বা ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে এসপিএম সচল করা না গেলে রাষ্ট্রের এই বিপুল বিনিয়োগ শেষ পর্যন্ত গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াতে পারে।


মন্তব্য