৬ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ |
শিরোনাম:
অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে মিরাজের লড়াকু সেঞ্চুরিতে বাংলাদেশের সম্মানজনক সংগ্রহ নদী দূষণ রোধে কোনো অবহেলার সুযোগ নেই: প্রধানমন্ত্রী সিলেটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে এনসিপির নাসীরুদ্দীন ও সার্জিসের কটুক্তির প্রতিবাদে সুনামগঞ্জের বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভা ঘুষের মাধ্যমে ওয়ারিশি সম্পত্তি দখলের অভিযোগে মানববন্ধন, গ্রেফতারের দাবি জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসে কিশোরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির জুলাই চেতনায় দেশ গড়ার প্রত্য যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় ইরান পুরোপুরি প্রস্তুত: ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমির আকরামিনিয়া পটিয়ায় বিরোধীয় জমির রেশ ধরে প্রতিপক্ষের দোকানে আগুন দেয়ার অভিযোগ। আড়াইহাজারের পুরিন্দাতে ৪ বছরের শিশুকে সহ গৃহবধূ নি/খোঁজ, থানায় অভিযোগ প্রেক্ষাপট: পরিবর্তিত বিশ্বে বাংলাদেশের সফট পাওয়ার পুনর্বিবেচনা: একটি কৌশলগত অপরিহার্যতা নির্বাসন থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে: নিউজিল্যান্ডে নতুন স্বপ্ন বুনছেন আফগান নারী ফুটবলাররা
আন্তর্জাতিক:
যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় ইরান পুরোপুরি প্রস্তুত: ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমির আকরামিনিয়া প্রেক্ষাপট: পরিবর্তিত বিশ্বে বাংলাদেশের সফট পাওয়ার পুনর্বিবেচনা: একটি কৌশলগত অপরিহার্যতা নির্বাসন থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে: নিউজিল্যান্ডে নতুন স্বপ্ন বুনছেন আফগান নারী ফুটবলাররা সৌদি আরব সফরে যাচ্ছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনির মাকে বিয়েতে আমন্ত্রণ না জানানোয় চাকরি হারালেন চীনা তরুণ নরেন্দ্র মোদির ভিডিও সরানোর ঘটনায় মার্ক জাকারবার্গকে ৩ দিনের আলটিমেটাম দক্ষিণ লেবাননে ফের ইসরাইলি হামলা, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ মালয়েশিয়ায় ১৫ হাজার বিদেশি কর্মীর আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর হরমুজ প্রণালিতে নতুন নৌপথ নিয়ে ওমানের সঙ্গে সমঝোতার পথে ইরান জার্মানির বিমানবন্দরে বিস্ফোরকবাহী ড্রোন: নেপথ্যে কি রাশিয়ার নাশকতা?
     
             

প্রেক্ষাপট: পরিবর্তিত বিশ্বে বাংলাদেশের সফট পাওয়ার পুনর্বিবেচনা: একটি কৌশলগত অপরিহার্যতা

  

২০২২ সালে আর্জেন্টিনা যখন ফিফা বিশ্বকাপ জয় করে, তখন বাংলাদেশের লাখো মানুষ সেই বিজয় উদযাপন করেছিল। আর্জেন্টিনার প্রতি বাংলাদেশের মানুষের সমর্থনের মাত্রা অনেককে বিস্মিত করে এবং আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করে। দীর্ঘদিনের ফুটবলপ্রেম হঠাৎ করেই একটি কূটনৈতিক সুযোগে পরিণত হয়। এর কিছুদিন পরই আর্জেন্টিনা ৪০ বছরেরও বেশি সময় পর ঢাকায় তাদের দূতাবাস পুনরায় চালু করে। এরপর থেকে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সহযোগিতার ক্ষেত্রও সম্প্রসারিত হয়েছে। এই পরিবর্তন কোনো পরিকল্পিত সরকারি প্রচেষ্টার কূটনৈতিক (পাবলিক ডিপ্লোমেসি) প্রচারণার ফল ছিল না। বরং এটি ছিল সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগের বহিঃপ্রকাশ, যা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

সফট পাওয়ার ধারণাটি প্রথম উপস্থাপন করেন রাজনৈতিক বিজ্ঞানী জোসেফ নাই। সামরিক শক্তি বা অর্থনৈতিক চাপের ওপর নির্ভর করার পরিবর্তে সফট পাওয়ারের উৎস হলো একটি দেশের সংস্কৃতি, মূল্যবোধ এবং কূটনীতি। বড় শক্তিধর দেশগুলোর ক্ষেত্রে সফট পাওয়ার সাধারণত তাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। এটি এমন এক ক্ষমতা যা অন্যকে বাধ্য না করে বরং আকর্ষণের মাধ্যমে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সফট পাওয়ারের গুরুত্ব শুধু মর্যাদা অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি দেশের কূটনৈতিক পরিসর সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি করে। উন্নয়নের সাফল্য, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অবদান, জলবায়ু নেতৃত্ব এবং সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে একটি ইতিবাচক পরিচিতি দিয়েছে।

পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের সফট পাওয়ারকে নতুনভাবে মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার পেছনে দুটি বড় কারণ রয়েছে- বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তন এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন। বাংলাদেশ তার ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা গণআন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের টানা ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। এরপর একটি অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের পর নতুন একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসে। এই রাজনৈতিক পরিবর্তন দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান বিশ্ববাসীর চোখে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে নতুনভাবে তুলে ধরেছে। বিক্ষোভ দমনে সহিংসতা, বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর খবর, ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়া এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানকে ঘিরে সংঘটিত ঘটনাবলি-বিশেষ করে বিক্ষোভ দমনে সহিংসতা, পরবর্তীকালে গণপিটুনির ঘটনা, হেফাজতে মৃত্যু এবং অন্তর্বর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন তুলেছে। আর যখন আন্তর্জাতিক আলোচনায় সুশাসনের ঘাটতিই প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে, তখন সেই বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে, বঙ্গোপসাগরের উত্তর প্রান্তে বাংলাদেশের অবস্থান দেশটিকে সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত গুরুত্ব দিয়েছে। এ কারণেই বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে আছে। তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর যে বিষয়টি বদলেছে, তা হলো- এই ভারসাম্য রক্ষার সামগ্রিক পরিবেশ। ফলে ভারত, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্র- এই তিন প্রধান শক্তির কাছে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব আগের তুলনায় আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো- জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অক্ষুণ্ন রেখে কীভাবে এই বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে পরিবর্তিত সম্পর্ক দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা যায়।

বাংলাদেশের বিদ্যমান সফট পাওয়ারের সম্পদ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক প্রভাবের অন্যতম শক্তিশালী উৎস হলো জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে তার অবদান। ১৯৮৮ সালে প্রথম জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে যোগ দেয়ার পর থেকে বাংলাদেশ ৪০টিরও বেশি দেশে পরিচালিত ৬০টিরও বেশি মিশনে ২ লাখ ৬০ হাজারের বেশি সামরিক ও পুলিশ সদস্য পাঠিয়েছে। এ ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন ছিল বিশ্বের প্রথম সর্ব-মহিলা ও সম্পূর্ণ মুসলিম ফর্মড পুলিশ ইউনিট হাইতিতে মোতায়েন করা। এই অবদান বিশ্বশান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতিকে আন্তর্জাতিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে এবং দেশের সফট পাওয়ারের ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

উন্নয়নের সাফল্য বাংলাদেশের উন্নয়নের যাত্রাও এখন তার সফট পাওয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। একসময় বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের সফল উদাহরণ হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। ধারাবাহিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য বিমোচন এবং সামাজিক সূচকে অগ্রগতি বাংলাদেশকে একটি উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে। এই উন্নয়ন মডেল এখন অনেক উন্নয়নশীল দেশের জন্য অনুপ্রেরণা। তবে এই অর্জনকে টেকসই করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

সংস্কৃতি ও পর্যটনের সম্ভাবনা বাংলাদেশের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং ক্রমবর্ধমান পর্যটন সম্ভাবনাও দেশের সফট পাওয়ারের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয় ফুটে ওঠে তার ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, উৎসব, ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প এবং খাদ্যাভ্যাসে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের এই অনন্য সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরার মাধ্যমে দেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করা সম্ভব। প্রবাসী বাংলাদেশি এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী যারা বিদেশে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন, তারাও এই সফট পাওয়ারের অন্যতম কারিগর। তারা বাংলাদেশ ও স্বাগতিক দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছেন।

খেলাধুলা ও জনপ্রিয় সংস্কৃতি খেলাধুলাও এখন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক আকর্ষণের একটি ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরেই ক্রিকেট বাংলাদেশের বৈশ্বিক ক্রীড়া পরিচয়ের প্রধান ভিত্তি। অন্যদিকে ২০২২ সালের ফিফা বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রতি বাংলাদেশের মানুষের অভূতপূর্ব সমর্থন দেখিয়ে দিয়েছে, কীভাবে জনপ্রিয় সংস্কৃতি অপ্রত্যাশিতভাবে কূটনৈতিক সদিচ্ছা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জোরদারের একটি কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। এটি প্রমাণ করে যে, সফট পাওয়ারের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের আবেগ ও অংশগ্রহণ অনেক সময় সরকারি কূটনীতির চেয়েও বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।

সামনের পথ সব দিক বিবেচনায় নিলে স্পষ্ট হয়, বাংলাদেশের প্রধান সীমাবদ্ধতা কাঠামোগত নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক সংকটের পর থেকে বিদেশি সরকার, বিনিয়োগকারী, উন্নয়ন অংশীদার এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, বাংলাদেশ কোন পথে এগোচ্ছে। সবশেষে বলা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশের সফট পাওয়ারের প্রধান চ্যালেঞ্জ কেবল দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক প্রভাব বৃদ্ধি করা নয়, বরং দেশের অভ্যন্তরীণ সংস্কারের মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা।

ডিজিটাল যুগে, যেখানে আন্তর্জাতিক জনমত প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে গড়ে ওঠে, সেখানে এ ধরনের ঘটনা খুব সহজেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অবদান, মানবিক সহায়তা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মতো ইতিবাচক দিকগুলোকে ম্লান করে দিতে পারে। তাই সফট পাওয়ারের সঠিক ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত কৌশল। এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত দেশের অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ইতিবাচক দিকগুলোকে কার্যকরভাবে তুলে ধরা।

পরিশেষে, বাংলাদেশের সফট পাওয়ার কেবল তার অতীত অর্জনের ওপর নির্ভর করে না, বরং এটি নির্ভর করে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের সক্ষমতার ওপর। ভারত, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে বাংলাদেশ তার সফট পাওয়ারকে একটি কৌশলগত সম্পদে রূপান্তর করতে পারে। এটি কেবল দেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায়ও সহায়ক হবে।

এটি তাদের প্রভাবকে অন্যদের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করে তোলে।

সীমিত হার্ড পাওয়ারসম্পন্ন দেশের জন্য এটি কেবল একটি বিকল্প নয়।

এখন চ্যালেঞ্জ হলো- এ পর্যন্ত বিচ্ছিন্নভাবে থাকা এই শক্তিগুলোকে একত্রিত করে একটি সুসংহত ও কার্যকর প্রভাবের উৎসে পরিণত করা।

এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতিতেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয় এনেছে।

আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিশ্বব্যবস্থা দ্রুত পরিবর্তিত হয়ে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও বহুমেরুকেন্দ্রিক রূপ নিচ্ছে।

বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।

এর ফলে যেমন নতুন কূটনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি নতুন ধরনের অনিশ্চয়তাও তৈরি হয়েছে।

বন্দর ও সংযোগ প্রকল্পের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে নিজেদের উপস্থিতি আরও সম্প্রসারণেও চীনের আগ্রহ রয়েছে।

তবে ভারত এসব উদ্যোগকে এই অঞ্চলে, বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরে, চীনের প্রভাব বিস্তারের বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে দেখে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা আরও জোরদার করেছে।

আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় অবদান রাখার পাশাপাশি এসব মিশন বাংলাদেশের জন্য পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা এবং মানবিক সেবার একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সুনাম তৈরি করেছে।

বর্তমানে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ শুধু উৎপাদন সক্ষমতার প্রতীক নয়; এটি স্থিতিস্থাপকতা, পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা এবং শ্রম ও পরিবেশগত মান উন্নয়নের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

একই সঙ্গে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার এবং অসংখ্য ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পর্যটনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিবাচক আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি গড়ে তোলার বড় সুযোগ তৈরি করেছে।

ভবিষ্যতের পেশাজীবী, গবেষক ও নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি হিসেবে এই শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক প্রভাব ও বৈশ্বিক সম্পৃক্ততা সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

তবে এগুলোকে একটি সুস্পষ্ট জাতীয় কৌশলের অংশ হিসেবে উপস্থাপন না করে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিচ্ছিন্নভাবে প্রচার করা হয়েছে।

ফলে সম্মিলিতভাবে এগুলোর প্রভাব সীমিতই থেকে গেছে।

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তারের বহু উৎস থাকলেও সেগুলোকে এখনো একটি সুসংহত সফট পাওয়ার কৌশলের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।

একই ধরনের চিত্র অন্যান্য ক্ষেত্রেও দেখা যায়।

তবে উদ্যোগগুলো এখনো বিচ্ছিন্ন এবং দীর্ঘমেয়াদি সুস্পষ্ট কৌশলের অভাব রয়েছে।

এ ছাড়া শ্রমিক অধিকার নিয়েও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি এখনো চ্যালেঞ্জের মুখে।

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হলেও মজুরি, শ্রমিকের অধিকার, সংগঠন করার স্বাধীনতা এবং শ্রমমান নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি।

বিশ্বব্যাপী ক্রেতারা এখন টেকসই উৎপাদন, নৈতিক ব্যবসা এবং দায়িত্বশীল সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও শক্তিশালী ব্র্যান্ডিং এবং শ্রমমান ও সুশাসনে ধারাবাহিক উন্নতি নিশ্চিত করা না গেলে, বাংলাদেশ এমন প্রতিযোগী দেশগুলোর কাছে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে, যাদের তুলনামূলকভাবে আরও নির্ভরযোগ্য ও দায়িত্বশীল হিসেবে দেখা হয়।

কিন্তু যা এখনো অনুপস্থিত, তা হলো এমন একটি সুসংহত কাঠামো, যা এই সম্পদগুলোকে একটি ধারাবাহিক জাতীয় বয়ানে (ন্যারেটিভ) রূপ দিতে পারবে এবং দেশের বৃহত্তর পররাষ্ট্রনীতি ও উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে যুক্ত করতে সক্ষম হবে।

তবে বর্তমান বাস্তবতায় শুধু এসব উদ্যোগই যথেষ্ট নয়।

তারা বিশেষভাবে নজর রাখছে- ভবিষ্যতের নির্বাচন কতটা বিশ্বাসযোগ্য হয়, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা শক্তিশালী হয়, আইনের শাসন কতটা প্রতিষ্ঠিত থাকে, মানবাধিকার কতটা সুরক্ষিত হয় এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ কতটা স্বাধীনভাবে জনজীবনে অংশ নিতে পারে।

অতএব বর্তমান সময়টি বাংলাদেশের জন্য একটি সীমিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।

এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশকে এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে, যা সরকার পরিবর্তনের পরও দীর্ঘমেয়াদি সফট পাওয়ার কৌশল বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখতে সক্ষম হবে।

এখন পর্যন্ত জনকূটনীতি ও জাতীয় ব্র্যান্ডিংয়ের উদ্যোগগুলো প্রায়ই রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে গেছে।

একই সঙ্গে এই কৌশলকে অবশ্যই নমনীয় হতে হবে।

এ ছাড়া বাংলাদেশের হাতে এখনো পুরোপুরি কাজে না লাগানো একটি গুরুত্বপূর্ণ সফট পাওয়ারের সম্পদ রয়েছে-দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী।

বাংলাদেশের তরুণরা ডিজিটালভাবে সংযুক্ত, বৈশ্বিক বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সঙ্গে ক্রমেই বেশি সম্পৃক্ত।

একই সঙ্গে ভুল তথ্য (মিসইনফরমেশন), বিভ্রান্তিকর তথ্য (ডিসইনফরমেশন) এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা (প্রপাগান্ডা) শনাক্ত ও মোকাবিলার সক্ষমতা আরও জোরদার করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

(লেখক বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ (বিআইপিএসএস)-এর একজন গবেষণা সহকারী।

তিনি বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি) থেকে ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজে বিএসএস ও এমএসএস সম্পন্ন করেছেন)

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন

যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় ইরান পুরোপুরি প্রস্তুত: ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমির আকরামিনিয়া
নির্বাসন থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে: নিউজিল্যান্ডে নতুন স্বপ্ন বুনছেন আফগান নারী ফুটবলাররা
সৌদি আরব সফরে যাচ্ছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনির
মাকে বিয়েতে আমন্ত্রণ না জানানোয় চাকরি হারালেন চীনা তরুণ
নরেন্দ্র মোদির ভিডিও সরানোর ঘটনায় মার্ক জাকারবার্গকে ৩ দিনের আলটিমেটাম
দক্ষিণ লেবাননে ফের ইসরাইলি হামলা, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ
মালয়েশিয়ায় ১৫ হাজার বিদেশি কর্মীর আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
হরমুজ প্রণালিতে নতুন নৌপথ নিয়ে ওমানের সঙ্গে সমঝোতার পথে ইরান

You cannot copy content of this page