দীর্ঘ চার বছরেরও বেশি সময় পর আট হাজার মাইল দূরে নিউজিল্যান্ডের মাটিতে আবার একত্রিত হয়েছেন আফগানিস্তানের নারী ফুটবলাররা। তালেবান শাসনে নিজ দেশে খেলার অধিকার হারিয়ে দলটি ভেঙে গিয়েছিল এবং খেলোয়াড়রা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। তবে ফিফার স্বীকৃতি পাওয়ার পর ‘আফগান উইমেন ইউনাইটেড’ নামে ২৩ সদস্যের এই দলটি এখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে নতুন করে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে।
নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে প্রীতি ম্যাচ খেলতে নামার আগে ড্রেসিংরুমে এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। দেয়ালে আফগানিস্তানের পতাকা টাঙানো ছিল এবং দেশাত্মবোধক গানের সুরের মূর্ছনায় অনেক খেলোয়াড়ই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। একসময় যে মাঠে খেলার স্বপ্ন দেখা ছিল বিলাসিতা, সেই মাঠেই এখন তারা জাতীয় দলের জার্সিতে লড়াই করছেন।
২০২১ সালের আগস্টে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর আফগান নারীদের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এর ফলে ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় নারী ফুটবল দল কার্যত বিলুপ্ত হয়ে যায়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা, পেশাগত কাজ এবং খেলাধুলায় নারীদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ হওয়ার পর দলের অনেক সদস্য অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও পর্তুগালে আশ্রয় নেন।
চলতি বছরের এপ্রিলে ফিফা এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেয়। তালেবান সরকারের অনুমোদন ছাড়াই এই নির্বাসিত দলটি এখন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আফগানিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে। এই সিদ্ধান্তের ফলে অলিম্পিক ও নারী বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে অংশ নেওয়ার পথ প্রশস্ত হয়েছে। নিউজিল্যান্ডে প্রশিক্ষণ শিবিরের অংশ হিসেবে তারা কুক দ্বীপপুঞ্জের বিপক্ষে দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলেছে।
দলের অন্যতম মিডফিল্ডার মানোজ নুরি বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করছেন। কাবুলে বেড়ে ওঠা নুরি ছোটবেলায় ছেলেদের সঙ্গে লুকিয়ে ফুটবল খেলতেন। পরিবারের বিরোধিতার কারণে মুখ ঢেকে খেলতে হতো তাকে। এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারের পর তার ফুটবল খেলার বিষয়টি জানাজানি হলে পরিবার থেকে চাপের মুখে পড়েন তিনি। নুরি জানান, তার বড় ভাই চেয়েছিলেন তিনি চিকিৎসক বা শিক্ষক হোন। ফুটবল খেলার কারণে ভাই আর্থিক সহায়তা বন্ধের হুমকি দিলেও, জার্মানিতে থাকা অন্য ভাইয়ের সহায়তায় তিনি খেলা চালিয়ে যান।
দেশ ছাড়ার আগে নুরি তার জেতা পদক ও ট্রফিগুলো বাড়ির বাগানে পুঁতে রেখে এসেছিলেন। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, একদিন দেশে ফিরে সেই স্মৃতিগুলো আবার তুলে আনব। অস্ট্রেলিয়ায় থিতু হওয়ার পর তিনি তার মা ও বোনকেও নিরাপদে সেখানে নিয়ে এসেছেন। তার বোন এখন পড়াশোনা করতে পারছেন। নুরির প্রত্যাশা, একদিন তার বড় ভাই বুঝতে পারবেন যে ফুটবল খেলা কোনো অপরাধ নয়।
দলের আরেক খেলোয়াড় মুরসাল সাদাত বলেন, আমি যদি ফুটবলার না হতাম, তবে হয়তো আফগানিস্তানে থেকে লাখো মেয়ের মতো পড়াশোনা ও মতপ্রকাশের অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকতাম। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় ফুটবল কোচের পাশাপাশি শরণার্থী ও নারীর অধিকার নিয়ে কাজ করছেন।
বিবিসির পক্ষ থেকে তালেবানের ক্রীড়া পরিচালক আহমাদুল্লাহ ওয়াসিকের কাছে নারী ফুটবল দল নিয়ে মন্তব্য চাওয়া হলে তিনি তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। তবে তিনি ফিফাকে আফগানিস্তানে ফুটবল কার্যক্রম পুনরায় শুরু করার আহ্বান জানিয়েছেন।
অকল্যান্ডে কুক দ্বীপপুঞ্জের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে ১-০ এবং দ্বিতীয় ম্যাচে ৩-০ গোলে পরাজিত হয়েছে আফগান দলটি। তবে এই হার তাদের কাছে বড় কোনো বিষয় নয়। নির্বাসন, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পরেও তারা যে মাঠে ফিরতে পেরেছেন, সেটিই তাদের কাছে বড় জয়। তারা প্রমাণ করেছেন, প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আফগান নারীদের স্বপ্নকে দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
দীর্ঘ চার বছরেরও বেশি সময় পর অবশেষে ৮ হাজার মাইল দূরে নিউজিল্যান্ডে আবার একত্রিত হয়েছেন আফগানিস্তানের নারী ফুটবলাররা।
শুধু মাঠে ফেরাই নয়, ফিফার স্বীকৃতি পাওয়ার পর আন্তর্জাতিক ফুটবলে নতুন যাত্রার সূচনাও তাদের জন্য ঐতিহাসিক এক অধ্যায় হয়ে উঠেছে।
জাতীয় সংগীতের সুরে অনেক খেলোয়াড়ের চোখে জল এসে যায়।
এরপর কোচের উদ্বুদ্ধকরণ বক্তব্য শুনে মাঠে নামেন তারা—যে মাঠে খেলতে একসময় তাদের যোগ্যই মনে করা হতো না।
ফুটবল খেলছেন জানতে পেরে তিনি ক্ষুব্ধ হন এবং পরিবারকে আর্থিক সহায়তা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দেন।
কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
সূত্র: Jugantor – International


মন্তব্য