আব্দুল্লাহ আল মারুফ চট্টগ্রাম।।দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে কোনো ধরনের বেতন-ভাতা ছাড়াই পাহাড়ের অজপাড়াগাঁ থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কোমলমতি শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন তিন পার্বত্য জেলাসহ বাদপড়া ৫,০০০ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ২০ হাজার শিক্ষক। উচ্চশিক্ষিত (অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রিধারী) এসব শিক্ষকের জীবন আজ চরম অবহেলা, অনাহার ও বৈষম্যের এক করুণ আলেখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষকতার মতো একটি মহান পেশায় থেকেও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে আজ তাদের রাজপথে আন্দোলন করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি ঢাকা (কেন্দ্রীয় কমিটি)-এর যুগ্ম মহাসচিব সাদ্দাম হোসেন রুহান মন্ডল বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, বাংলাদেশে সর্বপ্রথম বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রেজিস্ট্রেশন এবং শিক্ষকদের বেতন-ভাতা চালু করেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। বাদপড়া বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ৫৩৪টি বিদ্যালয় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নামে প্রতিষ্ঠিত।
মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সত্ত্বেও দীর্ঘসূত্রতা:ভুক্তভোগী শিক্ষক ও নেতৃবৃন্দের অভিযোগ, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে গত ২০২৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি জাতীয়করণের নির্দেশনাসংক্রান্ত চিঠি জারি করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১১টি জেলা ও ১১টি উপজেলায় সরজমিনে যাচাই-বাছাই করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত কনসালটেশন কমিটি ৫,০০০ বিদ্যালয় জাতীয়করণের লক্ষ্যে অনুমোদন দেয়, যেখানে উপদেষ্টা, সচিব, উপসচিবসহ সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তা স্বাক্ষর করেন। কিন্তু দীর্ঘসূত্রতার কারণে এখনো এর চূড়ান্ত বাস্তবায়ন না হওয়ায় চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন শিক্ষকরা।
কম খরচে বিপুল কর্মসংস্থান: প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি জেলায় গড়ে ৭৯টি করে বিদ্যালয় জাতীয়করণের আওতায় আসবে। ২০ হাজার শিক্ষকের চাকরি জাতীয়করণের জন্য সরকারের বাৎসরিক ব্যয় হবে মাত্র ৪০ কোটি টাকা—যা বর্তমান সরকারের জন্য কোনো বড় আর্থিক বোঝা নয়। অথচ এর মাধ্যমে ২০ হাজার পরিবারে সচ্ছলতা ফিরে আসবে এবং বিপুল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত হবে।
বঞ্চিত আট লক্ষাধিক কোমলমতি শিশু:এই বিদ্যালয়গুলোতে অধ্যয়নরত প্রায় ৮ লক্ষাধিক কোমলমতি শিশু বর্তমানে উপবৃত্তি ও মিড-ডে মিলের মতো সরকারের মৌলিক সুবিধা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হচ্ছে।
মানবেতর জীবনযাপন ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ:বর্তমান বাজারে প্রতি মাসে একটি সংসার চালাতে যেখানে ১৫-২০ হাজার টাকা প্রয়োজন, সেখানে শিক্ষকেরা টানা ১৩ বছর ধরে একটি টাকাও সরকারি অনুদান বা বেতন পাচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে শিক্ষকতার পাশাপাশি অনেককে দিনমজুরির কাজ, টিউশনি, অটো রিকশা চালানো কিংবা রাতে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি করতে হচ্ছে। বিনা বেতনে কাজ করতে করতে অর্থাভাবে ইতোমধ্যে অনেক শিক্ষক মৃত্যুবরণ করেছেন, অনেকেই অবসরে গেছেন। যাদের বয়স শেষ পর্যায়ে, তাদের নতুন করে অন্য কোথাও চাকরি পাওয়ার কোনো উপায়ও নেই। অর্থাভাবে তারা বৃদ্ধ মা-বাবার চিকিৎসা কিংবা নিজের সন্তানের পড়াশোনার খরচ মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছেন।
প্রাথমিক শিক্ষার শক্ত ভিত গড়ে দেওয়া এসব শিক্ষকের বেতন-ভাতার দাবিতে রাজপথে ধুলাবালির মাঝে পড়ে থাকা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ও লজ্জাজনক বলে মন্তব্য করেছেন সচেতন মহল।
এ অবস্থায় অবিলম্বে ২০ হাজার শিক্ষকের চাকরি জাতীয়করণ করে তাদের পরিবার নিয়ে সমাজে মর্যাদা ও নিরাপদে বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করার জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন বাংলাদেশ বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির নেতৃবৃন্দ।


মন্তব্য