রংপুর মহানগরীর কামালকাছনা এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক ও তার পরিবারের চার সদস্যের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। গত শনিবার রাতে পুলিশ ওই শিক্ষকের তিনতলা বাড়ি থেকে তাদের মরদেহ উদ্ধার করে। নিহতরা হলেন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী (১৩)।
প্রাথমিকভাবে ডাকাতির ঘটনা হিসেবে সন্দেহ করা হলেও, রোববার আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ জানান, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। পুলিশ এ ঘটনায় মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামের দুই যুবককে মাছুয়াপাড়া এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন বৃহস্পতিবার রাতে পাশের একটি ভবনের ছাদ টপকে গণপতি চক্রবর্তীর নির্মাণাধীন বাড়ির ছাদে ওঠেন মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। সেখানে তারা ইয়াবা সেবন করছিলেন। শব্দ শুনে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ছাদে গেলে তিনি তাদের চিনে ফেলেন এবং মাদক সেবনে বাধা দেন। পরিচয় ফাঁস হওয়ার ভয়ে তারা তাকে গামছা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এরপর একে একে পরিবারের অন্য সদস্যদেরও তারা হত্যা করে।
ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে পুলিশ জানায়
- আসামিরা প্রথমে ছাদে ইয়াবা সেবন করেন এবং গণপতি চক্রবর্তী তাদের চিনে ফেলায় তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।
- সিঁড়িতে থাকা স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তীকে এবং পরে ছাদে ওঠার চেষ্টা করলে মেয়ে আগামী চক্রবর্তীকেও একই কায়দায় হত্যা করা হয়।
- সবশেষে ঘরে ঘুমিয়ে থাকা ১২ বছরের ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীকে বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করা হয়।
পুলিশ কমিশনার জানান, হত্যার পরও খুনিরা ওই বাড়িতেই অবস্থান করেছিল। তারা বাড়ি থেকে কোনো মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যায়নি, যা পুলিশের সন্দেহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। গ্রেপ্তারকৃত মুগ্ধ দাস স্থানীয় একটি মাছের দোকানে এবং সিদ্ধার্থ দাস একটি গয়নার দোকানে কাজ করতেন।
তবে পুলিশের এই দাবি নিয়ে নিহত শিক্ষকের স্বজনরা গভীর সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। নিহত গণপতির বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় মামলা দায়ের করেছেন। গোপীনাথের জামাতা বিশ্বজিৎ রায় বলেন, পুলিশের ভাষ্য গ্রহণযোগ্য নয়, এত অল্প বয়সী দুজন যুবকের পক্ষে পুরো পরিবারকে এভাবে শেষ করা অবিশ্বাস্য।
গ্রেপ্তারকৃত সিদ্ধার্থ দাসের বাবা কানু দাসও তার ছেলের এমন কর্মকাণ্ড বিশ্বাস করতে পারছেন না। তিনি জানান, তার ছেলে কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন। এদিকে, নিহতদের স্বজন পূজা চক্রবর্তী জানান, বৃহস্পতিবার রাতেও তার বড় বোনের সঙ্গে কথা হয়েছিল, কিন্তু এরপর থেকে আর কোনো যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।
রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে। তার মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছিলেন। বাড়িটির প্রথম ও তৃতীয় তলার নির্মাণকাজ চলছিল এবং দ্বিতীয় তলায় পরিবারটি বসবাস করত। পুলিশ বর্তমানে আটককৃতদের দেওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাই-বাছাই করছে এবং তদন্ত অব্যাহত রেখেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রথম দিকে হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে পুলিশের ধারণা ছিল, এটা ডাকাতি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মর্মান্তিক এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ‘রংপুরে এক পরিবারের চারজনকে হত্যা: খুনের কারণ নিয়ে প্রশ্ন, সন্দেহ’ শিরোনামে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে গতকাল ভোরে দুজনকে আটক করার কথা জানায় পুলিশ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দেখতে পেয়ে গণপতি বাধা দিলে তাঁকে হত্যা করা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সেখানে তাঁরা গোসল করেন, ফ্রিজ (রেফ্রিজারেটর) থেকে খেজুর ও শসা বের করে খান এবং আবার ইয়াবা সেবন করেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পরদিন শুক্রবার জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা হলে তাঁরা ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আর যাওয়ার আগে আলমারি-ড্রয়ার খুলে কাপড়সহ বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়িয়ে দেন।
সূত্র: মানবজমিন


মন্তব্য