আল আমিন কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধি।।কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার নাথেরপেটুয়া এলাকায় এক প্রবাসী যুবকের পূর্ববর্তী ঘটনার জের ধরে তার বৃদ্ধ ও অসুস্থ বাবা-মাসহ পরিবারের সদস্যদের ওপর বর্বর হামলা, মারধর এবং ছিনতাইয়ের অভিযোগ উঠেছে। বৃহস্পতিবার ১৪ এপ্রিল ২০২৬ তারিখ বিকেলে নাথেরপেটুয়া এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী পরিবারটি বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
স্থানীয় ও ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার বাতাছোঁ গ্রামের বাসিন্দা মোঃ আল-আমিনের ছেলে নজরুল ইসলাম (২০) বর্তমানে ইতালি প্রবাসী। গত ১৪ এপ্রিল ২০২৬ তারিখ বিকেল আনুমানিক ৩:৩০ মিনিটে নজরুলের প্যারালাইজড বাবা, মা ও ছোট ভাই চিকিৎসার উদ্দেশ্যে হাসপাতালে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে নাথেরপেটুয়া নামক স্থানে পৌঁছালে নজরুলের অসুস্থ বাবা হঠাৎ গাড়ি থেকে পড়ে যান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কিছু পথচারী তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেও, পূর্ব শত্রুতার জের ধরে একদল স্থানীয় যুবক নজরুল ইসলামের পরিবারকে লক্ষ্য করে উসকানিমূলক স্লোগান দিতে শুরু করে। আক্রমণকারীরা অভিযোগ তোলে, নজরুল ইসলাম বিগত ২০২১ সালে দেশে থাকাকালীন ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড ও সমকামিতায় লিপ্ত ছিল এবং বর্তমানে ইতালিতে গিয়েও একই কাজ করছে।
এই অজুহাতে শত্রুপক্ষ অসহায় পরিবারটির ওপর চড়াও হয়। অসুস্থ বাবাকে রাস্তায় ফেলে রেখে নজরুলের মাকে নির্মমভাবে মারধর করা হয়। এ সময় তার মার সাথে থাকা নগদ টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। নজরুলের ছোট ভাইকেও পিটিয়ে আহত করে হামলাকারীরা। হামলাকারীরা প্রকাশ্যে হুমকি দিয়ে বলে, নজরুলকে দেশে ফিরিয়ে না আনলে তার পরিবারকে সমাজে থাকতে দেওয়া হবে না এবং নজরুল দেশে ফিরলে তাকে হত্যা করা হবে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে ২০২১ সালের একটি ঘটনা। ২০২১ সালের ২ নভেম্বর নোয়াখালীর চৌমুহনীতে একটি সংবাদ প্রতিবেদনের কাজে ক্যামেরাম্যান হিসেবে গিয়ে নজরুল ইসলাম ও তার সহকর্মী সাইফুর রহমান স্থানীয় জনতার তোপের মুখে পড়েন। তখন তাদের বিরুদ্ধে সমকামিতার অভিযোগ এনে গণধোলাই দেওয়া হয়। সহকর্মী সাইফুর রহমান পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও নজরুল ইসলামকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়।
তৎকালীন সময়ে আইনি জটিলতা এড়াতে স্থানীয় জনতা চুরির অভিযোগ তুললেও মূল ক্ষোভ ছিল সমকামিতার বিষয়টি নিয়েই। ওই ঘটনায় নজরুলকে দুই মাস কারাভোগ করতে হয়েছিল। পরবর্তীতে সমাজ ও পরিবারের নিন্দার মুখে নজরুল ইসলাম দেশ ত্যাগ করে ইতালিতে পাড়ি জমান। তৎকালীন সময়ে তার পরিবারও এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তাকে ত্যাজ্য পুত্র ঘোষণা করেছিল। তবে দীর্ঘ ৫ বছর পর ২০২৬ সালেও সেই পুরোনো ঘটনার সূত্র ধরে পরিবারটির ওপর এই নৃশংস হামলা চালানো হলো।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে মনোহরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাকসুদ আহাম্মদ সংবাদমাধ্যমকে বলেন:নাথেরপেটুয়া এলাকায় একটি পরিবারের ওপর হামলার খবর আমরা পেয়েছি। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। অতীতের কোনো ঘটনার জের ধরে বা কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে কারও ওপর শারীরিক হামলা বা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলে তা সম্পূর্ণ বেআইনি। আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। অপরাধী যেই হোক না কেন, তদন্ত সাপেক্ষ কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ তৎপর রয়েছে।
এই ঘটনার পর থেকে বাতাছোঁ গ্রাম ও নাথেরপেটুয়া এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ধর্মীয় অনুভূতি ও সামাজিক অবক্ষয়ের দোহাই দিয়ে একটি পরিবারকে এভাবে উচ্ছেদ ও হত্যার হুমকি দেওয়ার ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহলে ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারটি অবিলম্বে প্রশাসনের কাছে জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।


মন্তব্য