এনামুল হক রাশেদী,চট্টগ্রাম >>> চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) স্নাতক প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষার দায়িত্ব পালন করতে আসা গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা দিতে ভূমিকা রাখা ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় গণহত্যার সঙ্গে অভিযুক্ত এক শিক্ষককে ধরে হেনস্তার পর প্রক্টর ও সহ-উপাচার্যের কার্যালয়ে নিয়ে গিয়ে প্রায় ৯ ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রেখে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। শনিবার(১০ জানুয়ারী’২৬ ইং) দুপুর ১২ টার সময় ঐ শিক্ষককে দৌঁড়িয়ে ধরে প্রক্টর ও সহ উপচার্যের কার্যালয়ে আঁটকে রেখে রাত ৯টার দিকে তাকে ছেড়ে দেওয়া হলে তিনি শনিবার রাত ৯টার দিকে প্রশাসনিক ভবন থেকে বেরিয়ে প্রক্টরের গাড়িতে করে ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন।হেনস্তার শিকার শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ চবি আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও সাবেক সহকারী প্রক্টর। তিনি আওয়ামী ও বামপন্থী শিক্ষকদের রাজনৈতিক সংগঠন ‘হলুদ দল’-এর একাংশের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শনিবার দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের সামনে চাকসুর চার নেতার নেতৃত্বে তাকে পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে তাড়া করে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় তার মুঠোফোন তল্লাশি করা হয়। পরে তাকে একটি অটোরিকশায় তুলে প্রক্টর অফিসে নেওয়া হয়। ভর্তি পরিক্ষার দায়িত্ব পালন করতে আসা জুলাই আন্দোলনে ছাত্রদের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া ঐ শিক্ষক ছাত্রদের ক্ষোভ বুঝতে পেরে পরিক্ষার হলের পিছন দিক দিয়ে পালানোর চেষ্টা করলে ছাত্ররা বেশ কিছুদুর পিছন পিছন দৌঁড়ে তাঁকে আটক করে, এসময় ঐ শিক্ষক গাছের একটি গুঁড়িতে হোঁছট হয়ে সামান্য আহতও হয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযুক্ত শিক্ষককে তাড়ানোর ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়েও পড়ে। এক মিনিট সাত সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন শিক্ষার্থী শিক্ষক হাসান মোহাম্মদকে দৌঁড়িয়ে ধরে তারপর অনেকটা জোর করে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। ভিডিওতে চাকসুর দপ্তর সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান, পাঠাগার ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক মাসুম বিল্লাহ, আইন ও মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক ফজলে রাব্বি এবং নির্বাহী সদস্য সোহানুর রহমানকে দেখা যায়। তারা অভিযুক্ত শিক্ষককে প্রক্টর অফিসে অবরুদ্ধ করে রাখে।অবরুদ্ধ অবস্থায় শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ বলেন, পরীক্ষাকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনের সময় পরিস্থিতি ভালো নয় বলে তাকে জানানো হয়। পরে বের হওয়ার সময় চাকসু নেতারা চিৎকার করলে তিনি ভয়ে দৌড় দেন। এরপরও তাকে আটক করে নাজেহাল করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।চাকসুর আইন ও মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক ফজলে রাব্বি অভিযুক্ত শিক্ষককে টানাহেঁছড়া করে হেনস্থার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, অভিযুক্ত শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ একজন চিহ্নিত ফ্যাসিস্টের দোসর, তিনি ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে সহকারী প্রক্টর থাকাকালে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা দিতে ভূমিকা রেখেছিলেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়ও তিনি গণহত্যার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের তদন্ত চলমান থাকায় তারা বিষয়টি জানতে আইন অনুষদের ডিনের কাছে যান। এ সময় শিক্ষক পালাতে গিয়ে গাছের গুঁড়িতে খোঁছট খেয়ে পড়ে যান বলে দাবি করেন তিনি।চাকসুর দপ্তর সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমানও একই দাবি করেন।তবে শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আমি কোনো আন্দোলনে অংশ নিইনি, কোনো দায়িত্বেও ছিলাম না। সহকারী প্রক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আমি কাউকে মামলা দিইনি।’ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে চাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সাঈদ বিন হাবিব বলেন, ‘চাকসুর নেতারা হাটহাজারী থানায় মামলা করতে গেলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুমতি ছাড়া মামলা গ্রহণ করা যাবে না বলে জানানো হয়। আমরা প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকে মামলা করার বিষয়টি তুলেছি। প্রশাসন জানিয়েছে, তদন্ত চলমান রয়েছে এবং তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’পরীক্ষার দায়িত্ব প্রসঙ্গে ‘বি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার সমন্বয়কারী মো. ইকবাল শাহীন খান বলেন, কোনো শিক্ষক বরখাস্ত না হওয়া পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করতে পারেন। সে কারণেই তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী বলেন, ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান রয়েছে এবং বিষয়টি আগামী সিন্ডিকেট সভায় উপস্থাপন করা হবে। প্রক্টরিয়াল বডির শাস্তি দেওয়ার এখতিয়ার না থাকায় তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ রয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী তাঁর বেতন বন্ধ রয়েছে। কীভাবে তিনি পরীক্ষার দায়িত্ব পেলেন, তা পরে তদন্ত করে জানা যাবে।এদিকে হাটহাজারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহেদুর রহমান জানান, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা নথিভুক্ত হয়নি। তবে চাকসুর পক্ষ থেকে একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।এদিকে অভিযুক্ত শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এসে ভর্তি পরিক্ষায় দায়িত্ব পালনে হলে ঢুকার পর সাধারন ছাত্রদের মধ্যেও প্রচন্ড ক্ষোভ পরিলক্ষিত হয় বলে জানা গেছে। ছাত্রদের এই ক্ষোভের কথা শিক্ষকের সহকর্মিরা তাঁকে জানালে সে ভীত সন্ত্রস্থ হয়ে দৌঁড়ে পালাতে গেলেই অনাকাংখিত এ পরিস্থিতির সৃষ্ঠি হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রত্যক্ষদর্শী অনেক ছাত্র। তাদের মতে, তিনি যদি অপরাধী না হন, তাহলে পিছনের পথ দিয়ে কেন পালানোর চেষ্ঠা করবেন। তিনিতো অন্য শিক্ষকদের সহযোগিতায় নিজেই প্রক্টর অফিসে অবস্থান নিতে পারতেন।


মন্তব্য