আব্দুল্লাহ আল মারুফ চট্টগ্রাম সংবাদদাতা >>> এইচএসসি পরীক্ষা চলছে জামশেদুল ইসলামের। পরীক্ষার এই সময়ে তাঁর ব্যস্ত থাকার কথা শুধু পড়াশোনা ও পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে। কিন্তু চার সদস্যের পরিবারের অন্ন সংস্থানের দায়িত্ব যে তাঁকেই সামলাতে হয়। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি ফুডপান্ডার ডেলিভারি রাইডার হিসেবে কাজ করে আসছিলেন তিনি। সাইকেলে করে খাবার পৌঁছে দিয়ে যে সামান্য আয় হতো, তা দিয়েই চলত তাঁর সংসার ও নিজের লেখালেখির খরচ। কিন্তু হঠাৎ সেই একমাত্র উপার্জনের বাহন সাইকেলটি চুরি হয়ে যাওয়ায় থমকে যায় জামশেদের জীবন। নতুন সাইকেল কেনার সামর্থ্য না থাকায় সংসার চালানো তো বটেই, তাঁর নিজের পড়াশোনা ও পরীক্ষা দেওয়াই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল।জামশেদের এই চরম সংকটে মানবিকতার হাত বাড়িয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। সোমবার (১০ আগস্ট) জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে জামশেদের হাতে তাঁর পছন্দের একটি নতুন সাইকেল তুলে দেওয়া হয়।জামশেদ চট্টগ্রাম সরকারি ইসলামিয়া ডিগ্রি কলেজের মানবিক বিভাগের ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থী। তাঁর বাবা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ও কর্মক্ষমতাহীন। চার সদস্যের পরিবারে উপার্জনের হাল ধরতে তাই পড়াশোনার পাশাপাশি পেশা হিসেবে ফুড ডেলিভারির কাজ বেছে নেন এই তরুণ। কিন্তু উপার্জনের একমাত্র সম্বল সাইকেলটি চুরি হওয়ার পর দিশেহারা হয়ে পড়েন তিনি। শেষ পর্যন্ত প্রতিকূলতা থেকে বাঁচতে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত সহায়তা চান জামশেদ।আবেদনটি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার নজরে এলে তিনি দ্রুত জামশেদের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁর পড়াশোনা ও পরিবারের সার্বিক পরিস্থিতির কথা জানার পর তিনি নিজ উদ্যোগে একটি নতুন সাইকেল কিনে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।এ সময় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, একজন ছাত্র নিজে পরিশ্রম করে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে—আমি তার এই উদ্যোগকে সম্মান জানাতে চাই। সে কাজও করতে চেয়েছে, আবার পড়াশোনাও চালিয়ে যেতে চেয়েছে। জেলা প্রশাসন তাই তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে। আমি চাই না, কোনো অবস্থাতেই আর্থিক সংকটের কারণে তার পড়াশোনা বন্ধ হোক।’দেশের শক্তি তরুণ শিক্ষার্থীরা উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক আরও বলেন, সামর্থ্য অনুযায়ী এ ধরনের সৎ উদ্যোগে জেলা প্রশাসন সবসময় সহযোগিতা করবে। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে হতাশ না হয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি সততার সঙ্গে কাজ করে এগিয়ে যাওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।নতুন সাইকেল হাতে পেয়ে স্বস্তি ও আনন্দ ফিরেছে জামশেদের চোখে-মুখে। অনুভূতি প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘সাইকেলটি চুরি হওয়ার পর আমি খুব বিপদে পড়ে গিয়েছিলাম। নতুন সাইকেল কেনার কোনো সামর্থ্য আমাদের পরিবারের ছিল না। জেলা প্রশাসক স্যার আমার কষ্টের কথা শুনে নিজের উদ্যোগে পছন্দমতো একটি সাইকেল কিনে দিয়েছেন। এখন আমি আবার কাজ করতে পারব, পাশাপাশি আমার পড়াশোনাও চালিয়ে যেতে পারব।জামশেদের কাছে এই নতুন সাইকেল শুধু চলাচলের কোনো বাহন নয়; এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে তাঁর পুরো পরিবারের জীবিকা ও নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন। সাইকেলটি পাওয়ার পর এখন তিনি আবার ফুড ডেলিভারি রাইডার হিসেবে কাজে ফিরতে পারবেন। পরীক্ষার ফাঁকে সাইকেলের প্যাডেলে পা রেখে তাঁকে আবার ছুটতে হবে এক ঠিকানা থেকে অন্য ঠিকানায়। আর সেই ছুটে চলার চাকাতেই আবর্তিত হবে তাঁর বেঁচে থাকার সংগ্রাম ও আগামী দিনের লড়াই।


মন্তব্য