খননযন্ত্রটি হঠাৎ থেমে যায়। একজন শ্রমিক ধ্বংসস্তূপের ভেতর হাত ঢুকিয়ে একটি শিশুর খাতা বের করে আনেন, যার পাতাগুলো এখনো অক্ষত। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের মিনাব শহরের শাজারেহ তাইয়্যেবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পাঁচ মাস পরও ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চলছে। এই ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে বিবিসির জ্যেষ্ঠ অনুসন্ধানী প্রতিবেদক নওয়াল আল-মাগাফির সঙ্গে কথা বলেন আমাইনে নাদেমি।
মিনাবের প্রসিকিউটর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম দিনে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি একটি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের হামলায় এখানে ১৫৬ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ১২০ জনই শিশু। শহরজুড়ে দেয়াল, দোকানের শাটার ও রাস্তার বাতির খুঁটিতে টাঙানো রয়েছে নিহতদের ছবি। মিনাব শহরটি এখন যুদ্ধের কারণে সাধারণ মানুষের চরম দুর্ভোগ ও কষ্টের এক জীবন্ত প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানিদের ‘নিজেদের ভাগ্যের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার’ আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে যুদ্ধের ভয়াবহতা সেই রাজনৈতিক আহ্বানের চেয়ে অনেক বেশি প্রকট। তেহরান থেকে বন্দর আব্বাসগামী রাতের ট্রেনটি প্রায় ৯০০ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে সেখানে পৌঁছায়, যা ইরানের রাজনৈতিক কেন্দ্রকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণ অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করে।
ট্রেনে থাকা শিক্ষার্থী, ফুটবলার ও ব্যবসায়ীদের প্রত্যেকের কাছে যুদ্ধের অর্থের নিজস্ব গল্প রয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে ইরানজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল। কঠোর নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক সংকট ও নেতৃত্বের প্রতি ক্ষোভ থেকে এই বিক্ষোভের জন্ম হয়েছিল। বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক দমন–পীড়ন চালানো হয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, এতে কয়েক হাজার মানুষ নিহত ও অনেকে নিখোঁজ হয়েছেন।
যুদ্ধের প্রথম কয়েকটি দিন ছিল ভীতিকর। আইনজীবী আজাদেহ বলেন, ‘মানিয়ে নেওয়া প্রত্যেক ইরানির স্বভাবের মধ্যে রয়েছে। আমরা জীবন চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি।’ রাজনৈতিক পরিবর্তনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি নীরব থাকেন। ট্রেনের কামরায় রূপচর্চাবিশেষজ্ঞ সেপিদেহ বলেন, ‘আমি ইরানকে ভালোবাসি। কিন্তু তারুণ্য ফুরিয়ে যাওয়া ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ আমাকে ব্যথিত করে।’
ট্রেনের অন্য কামরায় দুই তরুণ ফুটবলার বাড়ি ফিরছিলেন। যুদ্ধের সবচেয়ে বেশি কী মনে আছে জানতে চাইলে আবদুল্লাহ বলেন, ‘তারা শিশুভর্তি একটি স্কুলে হামলা করেছিল। শিশুদের বয়স ছিল মাত্র ৭, ৮ ও ৯ বছর।’ পুরো দেশ এই ঘটনায় শোকে ভেঙে পড়েছিল। বন্দর আব্বাস থেকে দুই ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে মিনাব শহরে পৌঁছালে খেজুরগাছ ও বাজারের পরিচিত দৃশ্যগুলো এখন যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষে ঢাকা পড়েছে।
শাজারেহ তাইয়্যেবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়টি এখন ধ্বংসাবশেষ ছাড়া কিছু নয়। মাহিয়া তার ছোট ভাই আলীর সঙ্গে স্কুলে ছিল এবং মা তাদের নিতে আসার সময় হামলায় তিনজনই নিহত হন। ছয় বছর ধরে প্রথম শ্রেণিতে শিক্ষকতা করা আমাইনে নাদেমি বলেন, ‘এটিকে আর স্কুল বলা যায় না। এখানে শুধু দেয়ালগুলো দাঁড়িয়ে আছে, যা মৃত্যু আর শোকের সাক্ষী।’
হামলার পর শিক্ষার্থীদের বাবা–মায়ের খালি পায়ে ভবনটির দিকে ছুটে আসার কথা স্মরণ করে নাদেমি বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম সবাই বেরিয়ে গেছে, কিন্তু তারা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছিল।’ সংলগ্ন একটি সামরিক স্থাপনায় হামলার সময় স্কুলটিতে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছিল, তবে পেন্টাগন এ বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলেনি। উদ্ধারকর্মী রেজা বেসারাতি জানান, সেই সকালের দৃশ্য এখনো তাঁর চোখে ভাসে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ এপ্রিলের মধ্যে মিনাব ও এর আশপাশে অন্তত ৯৬টি মার্কিন হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। যেসব ইরানি বাইরের চাপ সরকারকে দুর্বল করবে বলে মনে করতেন, তাঁদের কাছে মিনাব এখন একটি বাঁকবদলের জায়গা। সরকারের বিরুদ্ধে একসময় রাস্তায় নামা এক বিক্ষোভকারী বলেন, ‘আমি যুদ্ধ মেনে নিয়েছিলাম, কিন্তু নিরপরাধ মানুষ হত্যার বিনিময়ে নয়। যুদ্ধ সবকিছু ধ্বংস করে দেয়।’
মিনাবের কবরস্থানে সারিবদ্ধ ছোট ছোট কবরের মাঝখান দিয়ে শিশুরা ছোটাছুটি করছে। মাসুমেহ মেহরান শেখাবাদি প্রায় প্রতিদিন এখানে আসেন, কারণ তাঁর ৯ বছর বয়সী মেয়ে সেতায়েশ ওই হামলায় নিহত হয়েছে। শেখাবাদি বলেন, ‘আমি যখন সেখানে পৌঁছাই, তখন শুধু ধোঁয়া আর শিশুদের চুলের গন্ধ। তাদের শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল।’
জীবনে প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক মিছিলে অংশ নেওয়া সুরাইয়া বলেন, ‘আমি এমন অনেক মানুষকে চিনি, যাঁরা সরকারের বিরোধিতা করতেন। কিন্তু আজ তাঁরা সরকারকে সমর্থন করছেন।’ সুরাইয়ার এই মন্তব্যের মাধ্যমে দেশটির বৃহত্তর জনমতের প্রতিফলন ঘটছে কি না, তা নিশ্চিত করে বলা অসম্ভব। তবে যুদ্ধের ভয়াবহতা যে সাধারণ মানুষের চিন্তাধারায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে, তা স্পষ্ট।
মিনাবের পশ্চিমে অবস্থিত বন্দর আব্বাস ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক বন্দরগুলোর একটি। যুদ্ধের প্রভাব এখানেও দৃশ্যমান। একদিকে অর্থনৈতিক সংকট, অন্যদিকে সামরিক হামলার আতঙ্ক—সব মিলিয়ে ইরানিরা এক কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে দিন পার করছেন। যুদ্ধের ক্ষত কেবল অবকাঠামোতেই নয়, মানুষের মনস্তত্ত্ব ও জাতীয়তাবোধেও গভীর দাগ ফেলেছে।
সেটি প্যাঁচানো ধাতু বা ভাঙা কংক্রিট নয়।
পাতাগুলো এখনো অক্ষত, পরিপাটি হাতের লেখায় ভরা।
প্রচ্ছদে একটি নাম লেখা—মাহিয়া সালারি।
তার মরদেহের সন্ধানে শ্রমিকেরা তল্লাশি চালাচ্ছেন।
কিন্তু তা ঘটেনি; বরং এই সংঘাত ইরানকে এমনভাবে বদলে দিয়েছে, যা খুব কম মানুষ প্রত্যাশা করেছিলেন।
তেহরান থেকে বন্দর আব্বাসগামী রাতের ট্রেনটি প্রায় ৯০০ মাইল (১ হাজার ৪৪৮ কিলোমিটার) পথ পাড়ি দিয়ে সেখানে পৌঁছায়।
ট্রেনটি পাহাড়, মরুভূমি এবং নাতাঞ্জ ও ফোর্দোর পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পেরিয়ে উপসাগরের দিকে যায়।
ট্রেনে রয়েছেন শিক্ষার্থী, ফুটবলার, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পরিবার।
তবে মোট হতাহতের সংখ্যা কত, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
আমরা আমাদের জীবন চালিয়ে যাওয়ার, দৈনন্দিন রুটিন বজায় রাখার এবং আশাবাদী থাকার চেষ্টা করেছি।’
এরপর জবাব দিতে শান্তভাবে অস্বীকৃতি জানিয়ে আলাপ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন তিনি।
ট্রেনের স্লিপার কামরার ভেতরে দ্রুত প্রসঙ্গ পরিবর্তন হয়।
পরিবার, কাজকর্ম ও দৈনন্দিন জীবনের নানা বিষয় ঘুরেফিরে আসতে থাকে।
তবে রাজনীতির প্রসঙ্গ এলে পরিস্থিতি বদলে যায়।
আজাদেহের সফরসঙ্গী রূপচর্চাবিশেষজ্ঞ সেপিদেহ অবশ্য কথা বলতে বেশ আগ্রহী।
কিন্তু যখন দেখি আমার তারুণ্য ফুরিয়ে যাচ্ছে এবং আমার স্বপ্নগুলো হারিয়ে যাচ্ছে, তখন (দেশ ছেড়ে) চলে যাওয়া ছাড়া আমার আর কোনো উপায় থাকে না।’
কয়েক মাস বন্ধ থাকার পর ঘরোয়া লিগ আবার শুরু হয়েছে।
কংক্রিটের মেঝেগুলো একটির ওপর আরেকটি ধসে পড়েছে।
বিধ্বস্ত শ্রেণিকক্ষ থেকে বাঁকা রড বেরিয়ে আছে।
হামলার কিছুক্ষণ আগে মা তাদের নিয়ে যেতে স্কুলে এসেছিলেন।
এটি ভালো মানুষ আর খারাপ মানুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না।’
আর পরিবারগুলো দুপুরের চড়া রোদ থেকে বাঁচতে সেখানে ছায়া খুঁজছে।
মিনাব যেমন এই যুদ্ধে ইরান সরকারের বয়ানের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে, তেমনি বন্দর আব্বাস এমন এক জায়গা, যেখান থেকে সরকার তার শক্তির প্রকাশ ঘটিয়ে থাকে।
বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবহন করা মোট জ্বালানি তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়।
বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই সামুদ্রিক করিডরের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার ক্ষমতা দেশটির সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
বন্দর আব্বাসে ইরানের প্রচলিত নৌবাহিনী ও ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌবাহিনী—দুটিরই গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি রয়েছে।
এসব জাহাজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
তেহরানে ফিরে এসে দেখি, পরিস্থিতি একেবারে ভিন্ন।
তখন যুদ্ধের মধ্যে সাময়িক বিরতি চলছিল।
এই ফাঁকে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর চার মাস পর তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মানুষের মুখে মুখে ‘আমেরিকার মৃত্যু’ ও ‘ইসরায়েলের মৃত্যু’ স্লোগান ঘুরেফিরে আসছিল।
এই জানাজা একই সঙ্গে শোক প্রকাশের মুহূর্ত এবং রাজনৈতিক ঐক্যের একটি সুচিন্তিত প্রদর্শনী।
যুদ্ধ নিয়ে ইরানজুড়ে একক কোনো ভাষ্য নেই।
কেউ মনে করেন, এই যুদ্ধ জাতীয় ঐক্যকে আরও শক্তিশালী করেছে।
মিনাবের একটি স্কুলের ধ্বংসাবশেষ থেকে হরমুজ প্রণালির ব্যস্ত নৌপথ হয়ে তেহরানের জনবহুল চত্বর—এই পুরো যাত্রা এমন একটি দেশের চিত্র তুলে ধরেছে, যা যুদ্ধের কারণে আমূল বদলে গেছে।
তাই এই সংঘাত শেষ পর্যন্ত কী ধরনের উত্তরাধিকার রেখে যাবে, তা নির্ধারণের লড়াইও সমানতালে চলছে।
সূত্র: প্রথম আলো


মন্তব্য