সাইফুল ইসলাম বাবু জৈন্তাপুর উপজেলা প্রতিনিধি
সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার ৩ নং চারিকাঠা ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত দূর্গোম এলাকায় অবস্হিত একমাত্র মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চারিকাঠা উচ্চ বিদ্যালয়।এই প্রতিষ্ঠানের দশম শ্রেনীর ছাত্রী তাসমিন বেগম স্কুলে যাতায়াতে জন্য স্কুটি বাইক চালিয়ে আসাযাওয়া করেন। ভারতীয় সীমান্তঘেষা চারিকাঠা ইউনিয়ন পাহাড়টিলা, চা বাগান ও সংরক্ষিত বনাঞ্চল নিয়ে গঠিত।প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লিলাভুমিখ্যাত লালাখাল ও সারী নদী এই ইউনিয়নের কোল ঘেষে বয়ে চলেছে। এমনই একটি ইউনিয়নের পাহাড় সমতল যৌথ প্রকৃতিতে যাতায়াত ব্যবস্হা কিছুটা দূর্বল। উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের মধ্যে চারিকাঠা ইউনিয়নে জনসংখ্যাও সবচেয়ে কম। প্রায় ১৭ হাজারের মত ভোটার অধ্যুষিত এই ইউনিয়নে কোন কলেজ নেই। আছে একমাত্র একটি মাধ্যমিক স্কুল।১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই চারিকাঠা উচ্চ বিদ্যালয়ে ইউনিয়নের প্রায় ৭৫% ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়ার একমাত্র কেন্দ্র। কিন্তু প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার পায়ে হেঁটে জীবন সংগ্রাম করে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া করতে হয়।কিন্তু এই সংগ্রামের মধ্যেই জলন্ত এক দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে তাসমিন বেগমের স্কুটি বাইকে চড়ে স্কুলে আসা যাওয়া।দশম শ্রেনীর ছাত্রী তাসনিম বেগম ইউনিয়নের পূর্ব নয়াখেল গ্রামের শফিকুর রহমানের মেয়ে। তাসমিন জানায় প্রতিদিন সে স্কুটিতে করে স্কুলে যাতায়াত করে। এর পূর্বে সে স্কুল থেকে চার কিলোমিটার দূরে তার বাড়ী থেকে আসা যাওয়ায় প্রায় আট কিলোমিটার পায়ে হেঁটে যাতায়াত করতো। লেখাপড়া শিখে বড় হয়ে তার ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন।চারিকাঠা উচ্চ বিদ্যালয়ের আইসিটি বিভাগের শিক্ষক হাবিবুর রহমান বলেন, গত এক বছর ধরে তাসমিন স্কুটি চালিয়ে স্কুলে আসা যাওয়া করে। আমাদের দেশে নারীরা সর্বক্ষেত্রে সফলতার স্বাক্ষর রাখছে।এ দেশে শিক্ষা ও পাশের হার এমনকি পরীক্ষার রেজাল্টেও জিপিএ- ৫ প্রাপ্তির সংখ্যায় মেয়েরাই বেশী। তিনি জানান দূর্গোম এলাকা হওয়ায় ছেলেরা বাইসাইকেল ব্যবহার করলেও অনেক মেয়েদের পরিবার সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে মেয়েদের সাইকেল ব্যবহার করতে দেয় না।যার কারণে মাইলের পর মাইল হেঁটে সংগ্রাম করে তাদের শিক্ষা গ্রহন করতে হয়। কিন্তু এর মধ্যে ব্যতিক্রম হলো তাসমিন৷ তাসমিনকে দেখে বুঝা যায় যে পরিবর্তনের হাওয়া লাগছে এই এলাকায়। এটা তাসমিনের পরিবারের একটা সাহসী পদক্ষেপ। তিনি বলেন সকল মেয়েদের অভিভাবকদের তাসমিনকে অনুসরণ করা উচিৎ।চারিকাঠা ইউনিয়নের বাসিন্দা ও সিলেট জেলা পরিষদের ৯ নং ওয়ার্ডের সদস্য মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, চারিকাঠা ইউনিয়নের জনপদ অন্যান্য ইউনিয়নের তুলনায় যাতায়াত কিছুটা দূর্গোম। ইউনিয়নের একমাত্র মাধ্যমিক প্রতিষ্ঠান চারিকাঠা উচ্চ বিদ্যালয়ে ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম যেমন, বাউরভাগ উত্তর, গঙ্গারজুম, লালাখাল গ্রান্ড, ইয়াং রাজা টিলা,পূর্ব বালিদারা,ভিত্রিখেল উত্তর, ভিত্রিখেল পূর্ব,বাঘছড়া এসব গ্রাম থেকে প্রায় সাতশতাধিক শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন পায়ে হেঁটে যাতায়াত করে।কোন কোন গ্রাম থেকে প্রায় ৫ থেকে ৬ কিলোমিটার পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের হেঁটে আসা যাওয়া করতে হয়।তিনি বলেন তাসমিন আমার গ্রামের মেয়ে। একজন কৃষক পরিবারের মেয়ে হয়ে স্কুটি চালিয়ে স্কুলের আসা যাওয়া বর্তমান সময়ে একটি সাহসী পদক্ষেপ। তিনি বলেন সকল পরিবারের মেয়েদের অভিভাবকদের দূর্গোম এলাকা যাতায়াতের জন্য অন্তত বাইসাইকেল চালানোর জন্য অনুপ্রাণিত হওয়া উচিৎ।কারণ বর্তমান সময়ে মানুষের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হয়েছে। নারীদের শিক্ষিত ও দেশের কাজে লাগাতে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর।তিনি আরো বলেন, চারিকাঠা ইউনিয়নের এই স্কুলের শিক্ষার্থীদের একটা অংশ চা শ্রমিকদের সন্তান। কিন্তু যাতায়াতের জন্য বাইসাইকেল কিনার সার্মথ্য তাদের নেই। সরকারের পক্ষ থেকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ছাত্রীদের মাঝে বিনামূল্যে বাইসাইকেল বিতরণ করতে।কিন্তু চারিকাঠা ইউনিয়নের চা শ্রমিকদের কন্যাসন্তানদের এখন পর্যন্ত এই সুবিধার আওতায় আনা সম্ভব হয় নি। তিনি বর্তমান সরকার ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিকট চারিকাঠা ইউনিয়নের নারী শিক্ষার অগ্রগতিতে তাসমিনের মত স্কুলে যাতায়াতের সুবিধার্থে গরীব ছাত্রীদের মাঝে সরকারি অনুদানে বাইসাইকেল বিতরণ করার অনুরোধ জানান তিনি।
মন্তব্য