আব্দুল্লাহ আল মারুফ, চট্টগ্রাম >>> বিগত ১৮ বছরের প্রবাসজীবনের জমানো সবটুকু সঞ্চয় দিয়ে গড়া সাজানো সংসারটি চোখের পলকেই কেড়ে নিল ডলু নদের উত্তাল স্রোত। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার দক্ষিণ সামিয়ারপাড়ায় বসবাসকারী মো. সেলিম (৫৫) এখন ভিটেমাটিহীন এক নিঃস্ব মানুষ। গত সপ্তাহের টানা বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় কেবল তাঁর পাকা ঘরই নয়, গ্রাস করেছে বসতভিটার চার শতক জমিও।সাতকানিয়া পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. সেলিমের বাড়িটি ছিল ডলু নদের কোলঘেঁষে। গত বুধবার মধ্যরাতে নদের পানির তীব্র স্রোতে বাড়ির পাশের সড়কটি ভেঙে যায়। এরপরই স্রোতের আঘাত লাগে তাঁর বসতঘরের সীমানাপ্রাচীরে। প্রতিবেশীদের সহায়তায় কোনোমতে পরিবার নিয়ে প্রাণে বাঁচলেও, বৃহস্পতিবার দুপুরে নিজের চোখের সামনেই ভিটেমাটিসহ পাকা বাড়িটিকে নদে বিলীন হতে দেখেছেন তিনি।কান্নাজড়িত কণ্ঠে মো. সেলিম বলেন, সারা জীবনের কষ্টের টাকায় ১৫ বছর আগে এই ঘরটি বানিয়েছিলাম। পৈতৃক ভিটা বলতে ওই চার শতক জমিই ছিল সম্বল। ১০ বছর আগে বিদেশ থেকে ফিরে সেখানেই পরিবার নিয়ে সুখে শান্তিতে ছিলাম। কিন্তু মুহূর্তের বন্যায় সব শেষ হয়ে গেল। এখন আমি কোথায় যাব, কী করব-কিছুই ভেবে পাচ্ছি না।বর্তমানে সেলিমের নয় সদস্যের পরিবারটি এক প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। বাড়ির মালামাল তো দূরের কথা, পরনের কাপড় ছাড়া কিছুই রক্ষা করতে পারেননি তাঁরা।এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সাতকানিয়ার প্রায় চার লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছিলেন। যদিও বর্তমানে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হচ্ছে, কিন্তু পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে উন্মোচিত হচ্ছে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। বহু ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও কৃষিজমি এখন ধ্বংসস্তূপ।সেলিমের প্রতিবেশী মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী বলেন,আমরা চোখের সামনেই দেখলাম একটা সাজানো সংসার কীভাবে চোখের পলকে নদীতে বিলীন হয়ে গেল। ডলু নদের পাড় যেভাবে ভাঙছে, তাতে আমরা আতঙ্কে আছি। সেলিম ভাই প্রবাসে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে টাকা জমিয়েছিলেন, ভেবেছিলেন শেষ বয়সে পরিবার নিয়ে সুখে থাকবেন। আজ সে রাস্তার মানুষ হয়ে গেছে। সরকার যদি দ্রুত তাকে পুনর্বাসন না করে, তবে এই পরিবারের আর ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো পথ নেই।এদিকে, গতকাল সোমবার বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শনে আসেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেন। এ সময় প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘যাঁদের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সরকার তাঁদের ঘর মেরামতে সহায়তা করবে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত কৃষিজমি, মাছের ঘের ও গবাদি পশুর মালিকদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবং তাঁদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সরকার সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করবে।প্রতিমন্ত্রী আরও যোগ করেন, বর্তমানে আমাদের অগ্রাধিকার হলো দুর্গতদের উদ্ধার ও ত্রাণ সহায়তা নিশ্চিত করা। বন্যার পানি সম্পূর্ণ নেমে গেলে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা করে দ্রুত পুনর্বাসনের দিকে এগোবে সরকার।সাতকানিয়ার দুর্গত মানুষের এখন একটাই চাওয়া-সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হোক, যাতে মো. সেলিমের মতো নিঃস্ব মানুষগুলো আবার নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে পারেন।


মন্তব্য