আনিছুর রহমান >>> বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ইতিহাসে এক অনন্য নাম ড. ফখরুদ্দীন আহমদ। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি (ওয়ান-ইলেভেন) পরবর্তী অত্যন্ত জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে রাষ্ট্রের হাল ধরেছিলেন।একজন প্রাজ্ঞ অর্থনীতিবিদ এবং দক্ষ প্রশাসক হিসেবে তিনি যে দৃঢ়তা দেখিয়েছেন, তা আজও ইতিহাসে সমাদৃত। ২০০৭ সালের শুরুতে যখন দেশে চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছিল, তখন শান্ত ও ধীরস্থির ব্যক্তিত্ব ড. ফখরুদ্দীন আহমদ প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পেশায় অর্থনীতিবিদ এই মানুষটি এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং বিশ্বব্যাংকের উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুভার সামলাতে তিনি আবেগ নয়, বরং মেধা ও আইনের শাসনকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন।বিশ্লেষকদের মতে, ড. ফখরুদ্দীন আহমদের সরকার ছিল মূলত একটি সংস্কারমুখী সরকার। তাঁর দুই বছরের শাসনামলে বেশ কিছু যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল ।রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর প্রধান সাফল্য ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপোষহীন অবস্থান। তৎকালীন সময়ে দেশের শীর্ষ প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় এনে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, আইনের উর্ধ্বে কেউ নয় বাংলাদেশের স্বচ্ছ নির্বাচন ব্যবস্থার ভিত্তি তাঁর সময়েই স্থাপিত হয়। ছবিসহ ভোটার তালিকা এবং জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) প্রণয়ন ছিল তাঁর সরকারের সবচেয়ে সফল কারিগরি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ। এবং বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের দাবি ‘নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ’ তাঁর আমলেই ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়। যা দেশের বিচার ব্যবস্থায় এক নতুন যুগের সূচনা করে।সে সময় বিশ্বে অর্থনীতির অস্থিতিশীল পরিস্থিতি থাকা সত্ত্বেও একজন দক্ষ অর্থনীতিবিদ হিসেবে তিনি দেশের মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।এখন জনমনে একটি প্রশ্ন প্রায়শই জাগে—কঠিন এক সময় পার করলেও কেন তাকে ‘ব্যর্থ’ বলা যায় না? এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হয় তাঁর ব্যক্তিগত নির্লিপ্ততা। ক্ষমতার মোহ তাঁকে আচ্ছন্ন করতে পারেনি। সেনাবাহিনীর সমর্থন থাকা সত্ত্বেও তিনি নির্ধারিত সময়ে একটি উৎসবমুখর ও নিরপেক্ষ নির্বাচন (২০০৮) আয়োজন করে শান্তিপূর্ণভাবে বিজয়ী রাজনৈতিক দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।ব্যক্তিগত জীবনে অতি সাধারণ ন্যায়পরায়ন এই মানুষটি রাষ্ট্র পরিচালনায় কখনো পক্ষপাতিত্ব করেননি। শৃঙ্খলার সাথে রাষ্ট্র যন্ত্রকে পরিচালনা করার ফলে আমলাতন্ত্র ও বিচার ব্যবস্থায় এক ধরনের শুদ্ধি অভিযান পরিচালিত হয়েছিল, যা জনগণের আস্থার প্রতিফলন ঘটায়।ড. ফখরুদ্দীন আহমদ প্রমাণ করেছেন যে, সততা এবং সঠিক পরিকল্পনা থাকলে একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্র ব্যবস্থাকেও পুনর্গঠন করা সম্ভব। বর্তমানে তিনি নিভৃত জীবন যাপন করলেও তাঁর সময়ে নেওয়া সংস্কারগুলো আজও বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে রয়ে গেছে।











মন্তব্য