ক্রিকেটের ২২ গজে বল হাতে দাপট দেখানো দক্ষিণ আফ্রিকার ফাস্ট বোলার নরমান গর্ডন মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়েও বেশি আলোচিত তাঁর দীর্ঘায়ু জীবনের জন্য। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে তিনিই একমাত্র খেলোয়াড়, যিনি জীবনের সেঞ্চুরি বা ১০০ বছর পূর্ণ করতে পেরেছিলেন। ২০১১ সালে শতবর্ষী হওয়ার সেই বিরল মাইলফলক স্পর্শ করা এই কিংবদন্তির আজ জন্মদিন।
গর্ডনের ক্যারিয়ারের স্বর্ণালি সময়ে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ১৯৩৮ ও ১৯৩৯ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে পাঁচটি টেস্ট খেলেছিলেন তিনি। সেই সময় তাঁর বোলিংয়ের ভক্ত হয়ে পড়েছিলেন ওয়ালি হ্যামন্ড ও লেন হাটনের মতো কিংবদন্তি ব্যাটসম্যানরা। ইংল্যান্ডের ওপেনার লেন হাটন একবার বলেছিলেন, গর্ডন যদি নিয়মিত ইংল্যান্ড সফরে যেতে পারতেন, তবে তিনি বিশ্ব ক্রিকেটের বড় তারকা হয়ে উঠতেন। কিন্তু ১৯৩৯ সালে হিটলারের জার্মানির পোল্যান্ড আক্রমণের ফলে শুরু হওয়া মহাযুদ্ধ সব হিসাব বদলে দেয়। ১৯৪৫ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ১৯৪৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা ইংল্যান্ড সফরে গেলেও ৩৫ বছর বয়সী গর্ডনকে আর দলে নেওয়া হয়নি।
১৯৩৮ সালের ২৪ ডিসেম্বর ওল্ড ওয়ান্ডারার্সে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক হয়েছিল গর্ডনের। প্রথম টেস্টেই তিনি ৫ উইকেট নিয়েছিলেন, যার মধ্যে ছিল ওয়ালি হ্যামন্ডের উইকেট। এরপর কেপটাউনে দ্বিতীয় টেস্টের একমাত্র ইনিংসেও তিনি ৫ উইকেট শিকার করেন। সিরিজের বাকি তিন টেস্টে আরও ৮ উইকেট নিয়ে মোট ২০ উইকেট সংগ্রহের মাধ্যমে তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়। ৪০.৩৫ গড়ে নেওয়া এই ২০ উইকেটই তাঁর টেস্ট ক্যারিয়ারের সম্বল, যা যুদ্ধের কারণে দীর্ঘায়িত হতে পারেনি।
২০১১ সালে গর্ডনের শততম জন্মবার্ষিকী জোহানেসবার্গে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদ্যাপন করেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেট বোর্ড। নিউ ওয়ান্ডারার্সের লংরুমে আয়োজিত সেই অনুষ্ঠানে দক্ষিণ আফ্রিকার অনেক তারকা ক্রিকেটার উপস্থিত ছিলেন। তবে গর্ডনের দীর্ঘ জীবনের যাত্রা থেমে যায় ২০১৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর। ১০৩ বছর ২৭ দিন বয়সে জোহানেসবার্গের হিলব্রোতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
ক্রিকেট বিশ্বে দীর্ঘায়ুর দিক থেকে গর্ডনের কাছাকাছি পৌঁছাতে পেরেছিলেন নিউজিল্যান্ডের বিল টিনডিল। তিনি ২০১০ সালের ১ আগস্ট ৯৯ বছর ২২৬ দিন বয়সে মারা যান। বর্তমানে জীবিত ক্রিকেটারদের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি নিল হার্ভি সবচেয়ে বয়স্ক, যিনি আগামী ৮ অক্টোবর ৯৮ বছরে পা দেবেন। এছাড়া আরও দুইজন সাবেক ক্রিকেটার ৯৫ বছর অতিক্রম করেছেন। তবে জীবনের সেঞ্চুরি পূর্ণ করার অনন্য রেকর্ডটি এখনো নরমান গর্ডনের দখলেই রয়ে গেছে।
ওয়ালি হ্যামন্ড ও লেন হাটনের মতো সর্বকালের অন্যতম সেরা দুই ব্যাটসম্যান তো ভক্তই হয়ে গিয়েছিলেন ২৭ বছর বয়সী গর্ডনের।
১৯৪৫ সালে জাপানের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি সে যুদ্ধের।
যুদ্ধ থামার পর আবার সবকিছু স্বাভাবিক হলে ১৯৪৭ সালে ইংল্যান্ড সফরে যায় দক্ষিণ আফ্রিকা।
নরমান গর্ডন যখন ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে, পুরো বিশ্বকে থামিয়ে দিতে হাজির দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
বয়স হয়ে গেছে ৩৫, তাই ‘বুড়ো’ এই ফাস্ট বোলারকে দেশে রেখেই ইংল্যান্ডে যায় দক্ষিণ আফ্রিকা।
তখন কে জানত, একদিন এই বয়সই গর্ডনকে অমর করে রাখবে ক্রিকেট বিশ্বে!
শুধু এটুকু বললেই খুব বেশি কিছু বলা হয় না।
জীবনে ইনিংসে নড়বড়ে নব্বই পেরিয়ে ‘সেঞ্চুরি’ ছোঁয়া একমাত্র টেস্ট ক্রিকেটার তিনিই।
বেঁচে থাকলে আজ তাঁর বয়স হতো ১১৫ বছর।
২০১১ সালে গর্ডনের জন্মশতবার্ষিকীতে পুরো ক্রিকেট বিশ্বই আলোড়িত হয়েছিল।
নিউ ওয়ান্ডারার্সের লংরুমে গর্ডন কাটেন ক্রিকেটীয় আবহে বানানো জন্মদিনের কেক।
সূত্র: Prothom Alo – Sports


মন্তব্য