সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি ‘মক্কা চুক্তি’তে যোগদানের বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে বাংলাদেশ। মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন সামরিক জোটটি মূলত পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর আদলে তৈরি, যেখানে কোনো সদস্য দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে তা জোটের সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য হবে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জেরে সৃষ্ট আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই জোট গঠন করা হয়েছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সোমবার সাংবাদিকদের জানান, মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামি দেশগুলোর মধ্যে যদি কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তবে সেখানে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ অস্বাভাবিক কিছু নয়। তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, সৌদি আরবসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এই জোটে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, মূলত সৌদি আরবের পক্ষ থেকেই ঢাকাকে এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যদিও ঠিক কবে এই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে তা স্পষ্ট করা হয়নি। এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দূতাবাস থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
তুরস্ক, যারা ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তির অধিকারী, জানিয়েছে যে এই চুক্তিতে ভবিষ্যতে আরও দেশের যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে এই জোটে যোগদানের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতির জন্য একটি বড় পরীক্ষা হতে পারে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সব পক্ষের সাথে ভারসাম্য বজায় রেখে অর্থনৈতিক সম্পর্ক রক্ষা করে আসছে। বিশ্লেষক কল্লোল কিবরিয়া সতর্ক করে বলেছেন, কোনো সামরিক জোটে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হলে চীন, ভারত, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, কাতার, ওমান, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক জটিল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত তৈরি পোশাক রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল, যার বড় বাজার হলো ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়া প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ শাহান মনে করেন, কোনো একটি নির্দিষ্ট সামরিক শিবিরে যোগ দেওয়া বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, এই জোটে যোগ দিলে ভারতসহ বেশ কিছু দেশ অসন্তুষ্ট হতে পারে, যদিও সেটিই একমাত্র বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত নয়।
এই আমন্ত্রণটি এমন এক সময়ে এসেছে যখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের সাথে ভারতের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। আগস্ট ২০২৪-এ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ায় এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মাধ্যমে জোরপূর্বক পুশ-ইনের অভিযোগ থাকায় দুই দেশের সম্পর্কে অস্বস্তি রয়েছে। ঢাকা শেখ হাসিনাকে ফেরত চাইলেও নয়াদিল্লি থেকে এখনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার বক্তব্য নিয়ে ঢাকা সমালোচনা করেছে। প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র জানিয়েছেন, ভারত সফরের জন্য ‘উপযুক্ত পরিবেশ’ এখনো তৈরি হয়নি এবং সফরের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, তারা পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছেন। সব মিলিয়ে, এই প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়া বা না দেওয়া নিয়ে বাংলাদেশ সরকার বেশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও, ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তিনি বলেন, সম্পর্কগুলো হয়তো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভেঙে যাবে না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে গণআন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রধানমন্ত্রীর একজন মুখপাত্র চলতি মাসে জানিয়েছেন, সরকারপ্রধান ভারত সফর করবেন কি না—সেই সিদ্ধান্ত এখনও নেওয়া হয়নি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চলতি মাসে সৌদি আরবের পবিত্র শহর মক্কায় সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ এই তিন দেশ চুক্তিটিতে সই করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কারণ, ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরগুলোকে এড়িয়ে চলাই ছিল ঢাকার নীতি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু বাংলাদেশ একবার কোনো সামরিক জোটে যোগ দিলে, তারা আসলে কোন পক্ষে আছে—সেই প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া অনেক কঠিন হয়ে পড়বে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যদিও উভয় দেশই আন্তরিক সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এসব কারণে দুদেশের সম্পর্কে কিছুটা টানাপোড়েন চলছে।
সূত্র: গালফ বাংলা


মন্তব্য