১৪ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩০শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ |
শিরোনাম:
সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের মোল্লাপাড়া গ্রাম থেকে ২ শত পিস ইয়াবাসহ ৩ জন আটক ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব সেলিম, সরকারের কাছে পুনর্বাসনের আকুতি। মজলুম ডলুর ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ দেখল সাতকানিয়া লোহাগাড়াবাসী সরকারি প্রাথমিকে বৃত্তি পেয়েছে মেধাবী শিক্ষার্থী বিসমিকা ওআইসি সম্মেলনের পার্শ্ব-বৈঠকে বাংলাদেশ-মালদ্বীপের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা স্বাস্থ্য, সমাজকল্যাণ, নারী ও শিশু উন্নয়ন খাতে সহযোগিতা জোরদারে নতুন প্রত্যয় সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে বিজিবি কর্তৃক ৫ শতাধিক অসহায় নারীপূরুষের মাঝে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা ও ঔষধ প্রদান সখিপুরে মাদকবিরোধী অভিযানে দুই ব্যক্তি আটক সাতকানিয়ায় পানিবন্দি মানুষের পাশে নাহিদ ইসলাম ছাত্রশক্তি’র চট্টগ্রাম মহানগরের যুগ্ম সদস্য সচিব হলেন রাতুল খান বাংলাদেশে চলমান মৌসুমি বন্যা ও ভূমিধসে মালদ্বীপ সরকারের গভীর সমবেদনা
আন্তর্জাতিক:
শাম্মী তুলতুল—বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য জগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হ্যাটট্রিক করে ইতিহাস গড়লেন মেসি কুরাসাওকে হারিয়ে ৭-১ গোলের স্মৃতি ফিরিয়ে আনল জার্মানি মিলান বাংলা প্রেসক্লাব ইতালির আয়োজনে ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠিত। মার্কিন বিমান ভূপাতিতের দাবি ইরানের অস্বীকার যুক্তরাষ্ট্রের লেবাননে ইসরাইলি হামলা ৩ স্বাস্থ্যকর্মীসহ নিহত ৫ জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব কে লড়াইয়ে ৪ শীর্ষ প্রার্থী মধ্যপ্রাচ্য সংকটে বিপাকে ভারতের বিমান খাত: জ্বালানির আকাশচুম্বী দামে বন্ধ হওয়ার শঙ্কা দেশের সব বিমানবন্দরে সর্বোচ্চ সতর্কতা, জোরদার করা হয়েছে নজরদারি লাহোর থেকে যাতি উমরা স্মৃতির অলিন্দে পাঞ্জাবের আতিথ্য
     
             

মজলুম ডলুর ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ দেখল সাতকানিয়া লোহাগাড়াবাসী

  বাংলাদেশ সংবাদ প্রতিদিন

অধ্যাপক শাব্বির আহমদ >>> টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায় গত ৮ জুলাই থেকে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়। কোনো কোনো এলাকায় ঘরের চাল পর্যন্ত পানি উঠেছে। বিভিন্ন পয়েন্টে ডলু খালের বাঁধ ভেঙে এবং পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে গেছে। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসকের ভাষ্য মতে, সাতকানিয়ার ৯০ শতাংশ এলাকা এবং লোহাগাড়ার নিম্নাঞ্চল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। সাতকানিয়ার বাজালিয়া আলতাফ আলী চৌধুরী জামে মসজিদের কবরস্থানে বন্যার পানির প্রবল স্রোতে তিনটি মরদেহ ভেসে ওঠার হৃদয়বিদারক ঘটনাও ঘটেছে। সাতকানিয়া-লোহাগাড়া অঞ্চলের তিনটি নদী, যথাক্রমে সাঙ্গু, ডলু ও টঙ্কাবতির নাব্যতা অনেক আগেই হারিয়ে গেছে। ঐতিহ্যবাহী হাঙ্গর খাল তো অনেকটা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। প্রতিদিন অবৈধ বালু উত্তোলন, দখল ও পরিকল্পিত ড্রেজিং এর অভাবে নদীগুলো ছোট হয়ে গেছে। ফলে বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে যখন-তখন এলাকা ডুবে যাচ্ছে। স্মরণকালের এমন ভয়াবহ বন্যার কারণের সাথে যোগ হয়েছে অপরিকল্পিত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন। রেল সেতুতে পর্যাপ্ত কালভার্ট না থাকায় পানি পারাপারে ব্যাঘাতের সৃষ্টি হচ্ছে। আজকের আলোচনা যেহেতু ডলুকে নিয়ে তাই ডলুতেই সীমাবদ্ধ রাখতে চাই আলোচনা।দক্ষিণ চট্টগ্রামের ঐতিহ্যসমৃদ্ধ জনপদ সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ ডলু নদী। বান্দরবানের দুর্গম পাহাড় থেকে এর উৎপত্তি। গড় প্রস্থে ৪৬ মিটার এবং দৈর্ঘ্যে ৫৩ কিলোমিটারের ডলু নদী বান্দরবান থেকে প্রবাহিত হয়ে লোহাগাড়া উপজেলার চুনতির নারিশ্চা-পানত্রিশা, পুটিবিলা, লোহাগাড়া সদর, আধুনগর ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে সাতকানিয়া উপজেলার সোনাকানিয়া, রুপকানিয়া- সাতকানিয়া সদর, পৌরসভা, রামপুর, পশ্চিম ঢেমশা, এওচিয়া, নলুয়া, আমিলাইশ ইউনিয়ন হয়ে সাঙ্গু নদীতে পতিত হয়েছে। ডলু নদী যতই মোহনার দিকে অগ্রসর হয়েছে ততই বড় হয়েছে। কারন, টঙ্কাবতি নদী ছাড়াও হাতিয়ার খালসহ অনেক ছোট ছোট নদী ডলুর সাথে মিলিত হয়েছে।শুনতে অবাক লাগলেও ইতিহাস বলে, এক সময় ডলু নদী আন্তর্জাতিক নৌ-রুটের অন্তর্ভুক্ত ছিল। বৃটিশ আমলে করাচি, মুম্বাই, কলকাতা থেকে সেলাই করা ও থান কাপড় ইঞ্জিনচালিত নৌকাযোগে সাতকানিয়ায় আসত ডলু নদী হয়ে। পরে কাপড়গুলো বর্তমান লোহাগাড়া উপজেলার পুটিবিলা ইউনিয়নের এমচরহাট (ফকিরহাট) এবং কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হতো। পুটিবিলায় গড়ে উঠেছিল পোশাক তৈরির শিল্প। সেখানে এখনও জোলাপাড়া (তাঁতি পাড়া) নামে একটি পাড়া আছে। আজকে খুব মনে পড়ছে, আশির দশকে চুনতি হাকিমিয়া কামিল মাদ্রাসায় অধ্যয়নকালীন মাস্টার জাফর স্যারের ভূগোল-ইতিহাসের ক্লাসের কথা। প্রসঙ্গক্রমে স্যার যখন এসব ইতিহাস আমাদের বলতেন, তখন রূপকথার কাহিনী মনে হতো। বৃটিশ আমলে, এমনকি পাকিস্তান আমলেও চট্টগ্রাম নগরীর চাক্তাই থেকে গদি নৌকাযোগে মনোহরি পণ্য ও মুদি দোকানের মালপত্র সাতকানিয়া থানাঘাট এলাকায় আসত। নদীকে ঘিরে বৃটিশ শাসনামল থেকে সাতকানিয়া সদরে গড়ে ওঠে ব্যবসা বাণিজ্য। ছমদরপাড়া নিবাসী হাজী জলিল শেঠের (১৯০২-১৯৭৮ খ্রি.) ব্যবসার পরিধি চট্টগ্রামের গণ্ডি পেরিয়ে কলকাতা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। কলকাতার ব্যবসায়ী অঙ্গনে তাঁর একচ্ছত্র প্রভাব ছিল এবং সেখানেই শেঠ উপাধি লাভ করেন। এছাড়া সাতকানিয়ার বনেদি ব্যবসায়ী মরহুম হাজী আবু শেঠ, হাজী বক্কর শেঠের খ্যাতি করাচি, মুম্বাই, কলকাতা থেকে শুরু করে রেঙ্গুন পর্যন্ত ছিল। ডলু তীরে ১৯১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় সাতকানিয়া থানা। নিয়মিত জোয়ারভাটার এ নদী তীরবর্তী মানুষের জীবন জীবিকার প্রধান মাধ্যম ছিল। ৫০/৫৫ বছর আগে বয়স্ক মুরব্বিদের কাছে শুনতাম: বার্মা ও হিন্দুস্তান থেকে মালভর্তি নৌকা ডলু নদী হয়ে সাতকানিয়ার বাদশা মিয়া ও কালু মিয়ার ঘাটে ভিড়ত। বণিকরা সেখান থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল ক্রয় করতেন। সাতকানিয়া সদর থেকে নদীপথ ছাড়াও স্থল পথেও সওদাগরের দল মালামাল নিয়ে যেত বাঁশখালী, চন্দনাইশসহ আশেপাশের এলাকায়। সাতকানিয়ার সাথে বার্মার ছিল নৌ ও সড়ক পথে বাণিজ্য। ডলু নদীর আধুনগর নৌ-ঘাট থেকে সড়ক পথে হারবাং, চকরিয়ার হয়ে কক্সবাজারের টেকনাফের হ্নীলায় নিয়ে যাওয়া হতো এবং হ্নীলা থেকে নাফ নদী হয়ে আরাকানে নিয়ে যাওয়া হতো। ডলু তীরে দেওয়ানহাটের বণিক পাড়ার ঘরে ঘরে স্বর্ণালংকার তৈরি করা হত। সাতকানিয়ার মরহুম হাজী দানু মিঞা সওদাগর (সোনা দানু) প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী স্বর্ণের দোকান বৃহত্তর চট্টগ্রামে এখনো বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে সুপরিচিত। সাতকানিয়ায় আরেক নামজাদা স্বর্ণ ব্যবসায়ী ছিলেন মরহুম হাজী জামাল কোম্পানি (ছমদর পাড়ার ডা. হানিফের বাবা)। চকরিয়া, কক্সবাজার, টেকনাফ থেকে লোকজন আসত স্বর্ণালংকার তৈরি করতে। আগের মত জৌলুস না থাকলেও এখনো দেওয়ানহাটের বণিক পাড়ায় স্বর্ণালংকার তৈরি করে কারিগররা। ডলু নদীর পাঁচ/ছয়শত গজ পূর্বে দানবীর মরহুম মোজাফফর আহমদ চৌধুরী টি,কে’র দান করা নয় দশমিক ৬০ একর জমির উপর ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় সাতকানিয়া কলেজ। দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের প্রথম কলেজ এটি। ছমদর পাড়া, ভোয়ালিয়া পাড়া, সামিয়ারপাড়া, ছিটুয়া পাড়া, রামপুর, ইছামতি আলীনগর পর্যন্ত ডলু নদীর দুই পাড়ে গড়ে উঠেছিল সুতা কাটার চরকা শিল্প। এসব এলাকা দিয়ে হাটার সময় চরকায় সুতা কাটার আওয়াজ বিউগলের সুরের মতো মনে হতো। চাক্তাই থেকে গদি নৌকাযোগে বড় জট বাঁধানো সুতার লট নিয়ে আসা হতো। এসব জট বাঁধানো সুতা থেকে তৈরি বিভিন্ন মানের সুতার বান্ডিল নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হতো কাপড় তৈরি এবং মাছ ধরার জালের জন্য। এসময় পাইকারি সুতা ব্যবসায়ী হিসেবে সাতকানিয়ার ‘মরহুম হাজী সুতা দানু’ ব্যাপক খ্যাতি লাভ করেছিলেন। মাছ ধরার জালের জন্যও একসময় সাতকানিয়া প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। সাতকানিয়ার ঘরে ঘরে নারীরা রাত-দিন জাল বুনার কাজে ব্যস্ত থাকতো। সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে আনুফকিরের দোকানে জাল ব্যবসায়ীরা পসরা বসাতো। চট্টগ্রাম, কাপ্তাই, বাঁশখালী, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, কক্সবকজার, টেকনাফ থেকে ব্যবসায়ী ও জেলেরা জাল কিনতে সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে আনুফকিরের দোকানে আসতো। সাঙ্গু মোহনার কাছাকাছি ডলু নদীর আমিলাইশ অংশে প্রচুর মাছ পাওয়া যেতো। মৎস আহরণকে কেন্দ্র করে আমিলাইশে গড়ে উঠেছিল বিশাল জেলে পল্লী।

ডলুর উপরোক্ত বর্ণনার প্রত্যক্ষদর্শী না হলেও ডলু নদীর মাত্র ৩০০ গজের ব্যবধানে গারাংগিয়ায় আমার জন্মভিটা এবং শৈশব-কৈশোরের উত্তাল দিনগুলো ডলুর পাড়ে, ডলুর চরে, ডলুর পানির স্রোতের সাথে প্রতিযোগিতা দিয়ে এ কুল থেকে ওই কুল সাতার কেটে পার হওয়ার স্মৃতি মানসপটে এখনো দেদীপ্যমান। মাত্র তিন দশক আগেও যা দেখেছি তা হলোঃ ডলু ছিল অনিন্দ্য সুন্দর একটি খাল, এর তলদেশ ছিল অগভীর ও সমতল, প্রচুর নৌকার চলাচল ছিল, নদীর ধারে অনেকই বিভিন্ন উপায়ে মাছ ধরতো এবং বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতো। পাহাড়ি এলাকা থেকে ভাসিয়ে নিয়ে আসা হতো কাঠ ও দীর্ঘ সারি সারি বাঁশের চালি। নৌকায় চড়ে গান-বাজনা, ডোল-তবলা বাজিয়ে, কোন কোন ক্ষেত্রে জারি-মারফতি গান, হামদ-নাত গেয়ে বরযাত্রীর আনাগোনা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক। নৌকায় চড়ে নিজেও অনেক বিয়েতে অংশ নিয়েছিলাম। তখন ডলু নদীতে বিরাজমান ছিল মূল্যবান বালুরাশির বিরাট মজুদ। নতুন নতুন গজিয়ে ওঠা বালির চরকে বাছাই করতাম ফুটবল খেলার মাঠ হিসেবে। বালু মহালের ইজারাদারী প্রথা চালু না হওয়ায় স্থানীয় জনসাধারণের প্রয়োজনীয়তার তাগিদে বালু উত্তোলনের ফলে ব্যাহত হতো না ডলুর সৌন্দর্য, ক্ষতিগ্রস্ত হতো না নদীর পাড়। কোথাও ভাঙ্গন দেখা দিলে সম্মিলিত উদ্যোগে মেরামত করা হত।

খরস্রোতা ঐতিহ্যবাহী ডলু নদীর দৃশ্যপট পাল্টাতে শুরু করে তিন দশক পূর্ব থেকে। মূলত ঐ সময় থেকে শুরু হয় দেশে অবকাঠামোগত ও রাস্তাঘাটের ব্যাপক উন্নয়ন। এতে প্রয়োজন পড়ে নদ-নদীর বালি। এসময় ডলু নদীর বালির গুণগত মানের কথা চাউর হয় স্থানীয় নির্মাণ শ্রমিকদের মাধ্যমে, পরে ছড়িয়ে পড়ে চট্টগ্রাম জুড়ে। ফলে বালি খেকোরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে ডলু নদীতে। ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র এলাকাভিত্তিক দখলসত্ব কায়েম করে। নামকাওয়াস্তে দরপত্র মূল্যে ইজারাদারি লাভ করলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় নির্বিচারে বালি উত্তোলন শুরু হয়। বালু উত্তোলনে প্রয়োগ করা হয় যান্ত্রিক পদ্ধতি। ডলুর বুকে নামানো হয় শত শত বড় ও ভারি পাম্প মেশিন। এইসব রাক্ষুসে মেশিন গুলো চুষে নেয় ডলুর রক্ত-মাংস, এমনকি অস্থি-মজ্জা পর্যন্ত। ফলে ডলু হারিয়ে বসে ঐতিহ্য, রূপ-সৌন্দর্য ও গতি- নাব্যতা।ডলুর কোন কিছুই যেন আজ অবশিষ্ট নেই। সাতকানিয়া- লোহাগাড়া বুক চিরে প্রবাহিত ডলু নদী কালের বিবর্তনে হারিয়ে ফেলেছে তার জীবন-যৌবন। দখল-দূষণ আর ভাঙনে ডলুর চিরচেনা রূপ আর নেই। ভরাট হয়ে যাবার কারণে শীতে ডলু মরা নদীর রূপ নেয়, আর বর্ষায় হয়ে ওঠে উত্তাল। পাহাড়ি ঢলে দুই কূল ছাপিয়ে পানির স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে যায় তীরবর্তী মানুষের বসতবাড়ি। প্রতিবছর ভাঙনে পতিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। বিশেষ করে চুনতির নারিশ্চা-পানত্রিশা, এমচর হাট, পুটিবিলা, লোহাগাড়া, আধুনগর, সাতকানিয়া গারাংগিয়া, আমিরাবাদ, বারদোনা, রূপকানিয়া, সাতকানিয়া পৌরসভার ভোয়ালিয়া পাড়া, ছমদর পাড়া, সামিয়ার পাড়া, ছিটুয়া পাড়া, এওচিয়ার গোলাঘাট, নলুয়া, গাটিয়াডেঙ্গা, পশ্চিম ঢেমশা ইছামতি আলী নগর, আমিলাইশ এলাকার ডলু তীরের মানুষের বসতবাড়ি প্রতিবছর ভাঙনের কবলে পতিত হচ্ছে। এসব এলাকার মানুষ পুর্ব পুরুষের বসতভিটে ছেড়ে বসতি গড়ছে অন্যত্র। একসময়ের খরস্রোতা ডলু নদীর মরণদশা অনুসন্ধান করতে গিয়ে যে তথ্য পাওয়া গেছে তাতে দেখা যায়, নির্বিচারে বালি উত্তোলন, নদী অববাহিকায় স্থানীয়দের বাসা বাড়ির বর্জ্য, দোকান-মার্কেটের ব্যবহৃত ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে নদীতে। সরেজমিনে দেখা গেছে, সাতকানিয়া পৌরসভার বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালের বর্জ্য, পৌরসভার কাঁচা বাজারের পঁচে যাওয়া মাছ ও সবজির ময়লা-আবর্জনা ফেলা হয় ডলুতে। ফলে দ্রুতই ভরাট হয়ে যাচ্ছে এবং বাড়ছে পরিবেশ ও বায়ূ দূষণ। ছড়িয়ে পড়ছে নানান রোগ-ব্যাধি। দূষণে ব্যবহারের অনুপোযোগী হয়ে পড়েছে নদীর পানি। পানিবিহীন হাহাকার করছে নদীটি। অথচ কেউ শুনছে না নদীর এই কান্না। শুধু যেন দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। যে নদীতে থাকার কথা অনবরত পানি প্রবাহ, বিভিন্ন প্রজাতির মাছের অভয়ারণ্য সেই নদীর বুকে আজ ফসলের বিস্তীর্ণ মাঠ। গারাংগিয়া-বারদোনা ও আমিরাবাদের মিলনস্থল টঙ্কাবতী মোহনা, গারাংগিয়া শাহ মজিদিয়া ব্রীজের আশপাশ, হায়দারের টেক, দানুর মার ঘাট, তিন খালের মুখ, সাতকানিয়া পৌরসভা এলাকাসহ হাঙ্গর মুখ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় স্থানীয়রা ডলু নদীর বুকে ধান-সবজি চাষ করছে। পানিবিহীন ডলুর বিরূপ প্রভাব পড়ছে নদী অববাহিকায় কৃষি ও পরিবেশে।মজলুমের উপর জালেমের অবিচার-অত্যাচার সব সময় সয়ে যায় না। এক সময় মজলুম ঠিকই ঘুরে দাঁড়ায়! মজলুম ডলুর তীব্র আঘাতে আজ ক্ষত-বিক্ষত সাতকানিয়া লোহাগাড়ার বিস্তীর্ণ জনপদ। ৮০/৯০ উর্ধ্ব অনেক মুরব্বির সাথে কথা বলে জানা গেছে, ডলুর এমন ভয়ঙ্কর রূপ তারা জীবনেও দেখেননি। এমতাবস্থায় সাতকানিয়া লোহাগাড়াবাসীর পক্ষ থেকে দাবী উঠেছে, ঐতিহ্যবাহী নদীটিকে বাঁচাতে অবৈধ বালু উত্তোলন কঠোরভাবে বন্ধের এবং নিয়মিত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে গভীরতা পুনরুদ্ধার এবং নদীর সীমানা নির্ধারণ করে দখলমুক্ত করার। ডলু নদীর ভাঙন নিয়ে কাজ করছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) এমন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দেশ স্বাধীনের পর থেকে ডলু নদীতে ড্রেজিং করা হয়নি। ড্রেজিং করলে নদীর দু’পাশের সমন্বয় থাকে। পাউবি’র ঐ কর্মকর্তা আরো জানিয়েছেন, বিশ্ব জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ড এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে সাতকানিয়া লোহাগাড়ার বিভিন্ন নদীর ভাঙ্গনরোধে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ হলেও তার বেশিরভাগ ব্যয় করা হয়েছে সাঙ্গু নদীর সাতকানিয়া উপকূল রক্ষা বাঁধে। তবে, তিনি এও জানিয়েছেন, সাঙ্গুর পর বড় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ডলু নদীর বাঁধ নির্মাণে। তাঁর মতে, ডলু নদীর বিভিন্ন স্থানে ব্লক দ্বারা বাঁধ নির্মাণ করা না হলে সাতকানিয়া লোহাগাড়ার অবস্থা আরো মারাত্মক হতো।বর্তমান সরকার দেশব্যাপী ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-খাল ও জলাধার খনন এবং পুনঃখননের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, যার আওতায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ডলু নদীকে অন্তর্ভুক্ত করে এর অববাহিকায় বসবাসকারী জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি ডলু নদীর পানি প্রবাহ আগের মত ফিরিয়ে আনার জন্য সাতকানিয়া লোহাগাড়াবাসীর পক্ষে জোর দাবী জানাচ্ছি।

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন

সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের মোল্লাপাড়া গ্রাম থেকে ২ শত পিস ইয়াবাসহ ৩ জন আটক
ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব সেলিম, সরকারের কাছে পুনর্বাসনের আকুতি।
সরকারি প্রাথমিকে বৃত্তি পেয়েছে মেধাবী শিক্ষার্থী বিসমিকা
ওআইসি সম্মেলনের পার্শ্ব-বৈঠকে বাংলাদেশ-মালদ্বীপের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা স্বাস্থ্য, সমাজকল্যাণ, নারী ও শিশু উন্নয়ন খাতে সহযোগিতা জোরদারে নতুন প্রত্যয়
সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে বিজিবি কর্তৃক ৫ শতাধিক অসহায় নারীপূরুষের মাঝে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা ও ঔষধ প্রদান
সখিপুরে মাদকবিরোধী অভিযানে দুই ব্যক্তি আটক
সাতকানিয়ায় পানিবন্দি মানুষের পাশে নাহিদ ইসলাম
ছাত্রশক্তি’র চট্টগ্রাম মহানগরের যুগ্ম সদস্য সচিব হলেন রাতুল খান

You cannot copy content of this page