মিজানুর রহমান বিশেষ প্রতিনিধি,ফরিদপুর >>> ফরিদপুরের নগরকান্দায় একই ধরনের উপসর্গে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে মামা ও ভাগিনার মৃত্যু, দাফনের প্রায় এক বছর চার মাস পর আদালতের নির্দেশে কবর থেকে মরদেহ উত্তোলন, ভিসেরা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো—সব মিলিয়ে ঘটনাটি শুরু থেকেই রহস্যে ঘেরা। কিন্তু লাশ উত্তোলনের প্রায় এক বছর পার হলেও এখনো আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা না হওয়ায় নিহতদের পরিবারে বাড়ছে ক্ষোভ ও হতাশা। তারা বলছেন, “বিচার নয়, এখন শুধু অপেক্ষাই আমাদের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।”নিহতরা হলেন নগরকান্দা উপজেলার তালমা চরপাড়া গ্রামের বাবলু মিয়ার ছেলে মোখলেছুর রহমান মিয়া (৪৫) এবং জগদিয়া বালিয়া গ্রামের সিহাব উদ্দিনের ছেলে নাসির উদ্দিন (১১)। সম্পর্কে তারা মামা-ভাগিনা।একই উপসর্গ, দুই মৃত্যু পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ এপ্রিল সকালে মোখলেছুর রহমান হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রথমে স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হলে তাকে জ্বরের চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে তার শরীরে চামড়ার নিচে কালো রক্ত জমাটের মতো দাগ দেখা দিলে দ্রুত ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওই দিন রাত আনুমানিক ১টা ৩০ মিনিটে তিনি মারা যান।অন্যদিকে, তিন দিন আগে নানা বাড়ি থেকে নিজ বাড়িতে ফেরা ১১ বছরের নাসির উদ্দিনও একই দিন বিকেলে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরদিন সকালে তার শরীরেও একই ধরনের রক্ত জমাটের দাগ দেখা যায়। হাসপাতালে ভর্তি করার পর সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে তারও মৃত্যু হয়।একই পরিবারের দুই সদস্যের এমন রহস্যজনক মৃত্যু শুরু থেকেই নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। তবে সে সময় মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ণয় হয়নি।দাফনের এক বছর চার মাস পর কবর খনন পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে নগরকান্দা সিআর মামলা নং-১৯৮/২৪ (তারিখ: ৯ জুন ২০২৬) দায়ের হলে আদালত মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব সিআইডিকে দেন। আদালতের নির্দেশে দাফনের প্রায় এক বছর চার মাস পর দুইজনের মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করে পুনরায় ময়নাতদন্ত ও ভিসেরা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়।এক বছরেও তদন্ত প্রতিবেদন নেই এবিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির আবুল হোসেন জানান, দুইজনের ভিসেরা পরীক্ষার জন্য ঢাকার মহাখালীর পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। এখনো পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে আসেনি। রিপোর্ট পাওয়া গেলে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।তবে লাশ উত্তোলনের প্রায় এক বছর পরও তদন্ত শেষ না হওয়ায় হতাশ স্বজনরা। তাদের দাবি, দীর্ঘসূত্রতায় বিচারপ্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে।মামলার বাদী আনোয়ারা বেগম অভিযোগ করেন, পারিবারিক বিরোধ এবং দ্বিতীয় বিয়ে কেন্দ্র করে মোখলেছুর রহমানের প্রথম স্ত্রী সুমী বেগমের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়েছিল। সেই বিরোধের জের ধরে পরিকল্পিতভাবে খাবারের সঙ্গে ধীরগতির বিষ বা ক্ষতিকর কোনো পদার্থ মিশিয়ে মোখলেছুর রহমান ও নাসির উদ্দিনকে হত্যা করা হয়েছে বলে তাদের সন্দেহ।মামলায় সুমী বেগম ও তার বাবা আব্দুর রহিম মাতুব্বরকে আসামি করা হয়েছে।তবে এ অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি এবং তদন্তও শেষ হয়নি।
‘আমরা শুধু বিচার চাই’
মামলার বাদী আনোয়ারা বেগম বলেন,
“আমার ছেলে ও নাতিকে হারিয়েছি। এতদিনেও তদন্ত শেষ হয়নি। আমি আদালতের কাছে সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার চাই।”
নিহত নাসির উদ্দিনের মা নাজমা বেগম বলেন,
“আমার ভাই ও আমার ছেলের মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল না বলে আমাদের বিশ্বাস। আমরা চাই প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন হোক এবং দোষীরা আইনের আওতায় আসুক।”
আসামিদের বক্তব্য মেলেনি
মামলার আসামিরা পলাতক থাকায় এ বিষয়ে তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তীতে প্রকাশ করা হবে।


মন্তব্য