<এস. এম জহিরুল ইসলাম>
শরফুদ্দিন আহম্মেদ আমার ছোট ফুফা। বরিশাল জেলার মুলাদী উপজেলার চরকালেখান ইউনিয়নের একটি সুপরিচিত নাম শরফুদ্দিন আহম্মেদ মাতুব্বর। সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তার জন্ম। তার বাবা ছবদের আলী মাতুব্বর ছিলেন একজন সহজ সরল সাধারণ মানুষ। শরফুদ্দিন আহম্মেদ মাতুব্বর ছিলেন একজন শিক্ষানুরাগী ও সমাজ উন্নয়নের নিরবকর্মী। একজন প্রচার বিমুখ নিরহংকার সাধারণ মানুষ ছিলেন তিনি। পারিবারিকভাবে আমাদের প্রতিবেশী হওয়ায় সেই ছোটকাল থেকেই তাকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। আমি তখন খুব ছোট তখন তাদের বাড়ীর সামনে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। আমার ফুফুদের হাত ধরে তাদের সাথে সেই স্কুলে যেতাম। ঐ সময় ঐ স্কুলের পড়াতেন আমার ফুফা শরফুদ্দিন আহম্মেদ মাতুব্বর। এক সময় সেই স্কুলটি বন্ধ হয়ে যায়। আমার ফুফুরাসহ আমি প্রাথমিক লেখাপড়া করি দক্ষিণ গাছুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। তবুও প্রতিবেশী হিসেবে তার সাথে দেখা হতো নানা সময়ে। এক সময় আমার ছোট ফুফুর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন শরফুদ্দিন আহম্মেদ মাতুব্বর। তখন থেকেই তাকে আমি জামাই বলে ডাকি। তাদের বিয়ের অনুষ্ঠানেও আমার উপস্থিতি ছিল সরব। আমার জীবনে আমি আমার ফুফা শরফদ্দিন মাতুব্বরকে কখনও হাসি ছাড়া দেখিনি। তিনি ছিলেন সদা হাস্যউজ্জ্বল একজন সাদা মনের আলোকিত মানুষ। একাধারে তিনি একজন ক্রীড়ামোদিও ছিলেন। ভলিবল হা-ডু-ডু, ফুটবলসহ ঐ সময়কার সব ঐতিহ্যবাহী খেলার প্রতি তার শখ ছিল চোখে পরার মতো। তিনি সব সময় শিশু কিশোর ও যুবকদের খেলার জন্য উৎসাহ দিতেন এবং খেলার ক্রীড়া সামগ্রী সংগ্রহের জন্য আর্থিকভাবে সহযোগিতা করতেন। তাদের বাড়ীর সামনে সময় অনুযায়ী বিভিন্ন খেলাধুলার আয়োজন ও প্রতিযোগিতা হতো। তিনি নিজে উপস্থিত থেকে সেই খেলাধুলা যাতে সঠিকভাবে সাধারণ মানুষ উপভোগ করতে পারে সেই ব্যবস্থা করতেন। একজন মুসলমান হিসেবে ধর্মের প্রতিও তার আনুগত্য ছিল স্বাভাবিক। তিনি সব সময় ধর্ম-কর্ম সঠিকভাবে পালন করতেন। নতুন প্রজন্মের সবাইকে এ বিষয়ে আমার ফুফা শরফুদ্দিন মাতুব্বর উৎসাহ দিতেন। কর্মজীবনে শরফুদ্দিন মাতুব্বর একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। তার মামা চরকালেখান ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আলহাজ্ব জামশেদ আলী তালুকদার সরকারের খাদ্য বিভাগের একজন স্বনামধন্য ঠিকাদার ছিলেন। তিনি মামার হাত ধরেই মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেই ব্যবসার সাথেই জড়িত ছিলেন। এ ছাড়াও ব্যবসায়িক জীবনে সিমেন্ট ও সারের ডিলারশীপের ব্যবসাও তিনি করেছিলেন। ঢাকার দনিয়ায় একটি বাড়ীও নির্মাণ করেছেন বসবাসের জন্য। আজ সেই বাড়ীতে আর নেই আমার ফুফা শরফুদ্দিন মাতুব্বর। ব্যক্তিগত জীবনে ১ ছেলে ১ মেয়ের গর্বিত পিতা তিনি। ছেলে একজন ব্যাংক কর্মকর্তা আর মেয়ে জামাতাসহ প্রবাসী।
শরফুদ্দিন আহম্মেদ মাতুব্বর কোমল মনের মানুষ ছিলেন। তিনি এলাকার অনেক শিক্ষিত অর্ধ শিক্ষিত বেকার যুবকের কর্মসংস্থান করেছেন। আমাদের প্রিয় ও শ্রদ্ধাভাজন এই মহৎ মানুষটি গত ৩ জুন ২০২৩ হঠাৎ করে চলে গেছেন সৃষ্টিকর্তার ডাকে ঐ পরপারে। তার চলে যাওয়ার ঘটনাটি খুবই আশ্চর্যজনক। তার চলে যাওয়ার দিন সকালে অফিসে কাজ করছিলাম। পেশাগত কারণে একটু পর পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উকি মারতে হয়। হঠাৎ চরকালেখান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিরাজুল ইসলাম মিরাজ সরদারের ফেইসবুকে দেখলাম ৩ জুন ২০২৩ সকাল সাড়ে ১১টায় শরফুদ্দিন আহম্মেদ মারা গেছেন। সাথে সাথে আমার হাত বোধহীন হয়ে মোবাইলটা ফ্লোরে পরে গেল। বাটন মোবাইল দিয়ে বাসায় আমার স্ত্রীকে ফোনে জানালাম বিষয়টি। আমার বাবা শাহ আলম সরদারকে ঘটনার সত্যতা জানতে ফোন দিলাম। তখন পর্যন্ত তারা এই খবর পায়নি। ১০ মিনিট পর আমার আব্বা তাদের বাড়ীতে গিয়ে ঘটনার সত্যতা জানালো। তৎক্ষনেও আমি স্বাভাবিক হতে পারিনি। আমি বিশ্বাসই করতে পারেনি আমার ফুফাকে মহান সৃষ্টিকর্তা এসময় এভাবে তার কাছে নিয়ে যেতে পারে।পরবর্তীতে যা শুনলাম তা হলো পারিবারিক কাজেই ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ীতে গিয়েছিলেন তিনি। ৩ জুন সকালে সড়ক পথে ঢাকায় আসার জন্য মৃধারহাট এসে নদী পার হওয়ার জন্য ট্রলারে উঠেছেন তিনি। ঐ সময়কার আবহাওয়া ছিল প্রচন্ড উত্তপ্ত। তীব্র গরমে মানুষের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। ট্রলারের যে ডালীতে আমার ফুফা বসেছিলেন সেই জায়গাটা ছিল খুব গরম। বসা যাচ্ছিল না। ট্রলারের একজন সহকারী নদীর পানিতে গামছা ভিজিয়ে ঠান্ডা করে তার বসার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছিল। তখন উঠে দাড়িয়েছিল আমার ফুফা। দাড়ানোর মুহুর্তেই মাথা ঘুড়ে পরে যান তিনি। আর উঠে দাড়াতে পারেনি। ওখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। চলে যান মহান আল্লাহর ডাকে (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।সেই থেকে আজও আমি স্বাভাবিক হতে পারিনি। বুকের ব্যাথা ও প্রচন্ড গরমে অসুস্থ হয়ে পরি। জানতে পারি ঐ দিনই রাত ৯টায় জানাযা শেষে তাদের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে। ঘটনার শোনার পর অন্যের সহযোগিতায় একটি রিক্সা নিয়ে বাসায় এসে বাড়ীতে যেতে চেয়েছিলাম আমার ফুফাকে শেষ একনজর দেখতে। কিন্তু আমার অবস্থা দেখে পারিবারিক ভাবেই যেতে নিষেধ করা হল। আমার অবস্থা শুনে আব্বাও নিষেধ করল যেতে, করন ঐ অবস্থায় আমি রওনা দিলে হয়তোবা পথে ঘটে যেতে পারতো আরেকটি দুর্ঘটনা। কিন্তু আমার পরিবারের ২/১জন অবুঝ সদস্য হয়তো ভুল বুঝে বলবে ও কেন এলোনা। আমার ফুফা শরফুদ্দিন মাতুব্বরকে হারিয়ে আমি কি হারিয়েছি সেটা আমি ছাড়া আর কেউ বুঝবে না। আর কাউকে বুঝানোও যাবে না। আমার জীবনে সবচেয়ে বেশী জ্বালিয়েছি আমার এই ফুফাকে। ঢাকায় যখন অসহায় বা আশ্রয়হীন ছিলাম তখন একমাত্র ভরসা ছিল আমার এই ফুফা শরফুদ্দিন আহম্মেদ। সময়ে অসময়ে যখন ঢাকায় আসতাম তখন কোথাও আশ্রয় ছিল না আমার, এক বেলা ভাত আর একটি রাত্রী যাপন সে সময় খুব কঠিন বিষয় ছিল। ঢাকা তখন এত সহজ ছিল না, খুব কঠিন ছিল এই ঢাকা শহর।সারাদিন ঘুড়ে ফিরে যখন রাত হতো তখন কোথাও যাওয়ার জায়গা না পেয়ে চলে যেতাম তার বাসায়। তখন অতটা না বুঝলেও এখন খুব ভাল করেই বুঝি আমার জন্য কতবেলা ভাত না খেয়ে থেকেছিলেন আমার ফুফা ও ফুফু। আমি বিনা নোটিশেই সময়ে অসময়ে চলে যেতাম তার বাসায়। হয়তো সব সময় মেহমানকে খাওয়ানোর মত অবস্থা থাকে না শহরের বেশিরভাগ বাড়ীতে। কিন্তু যখনই যেতাম আমার ফুফু আগে ভাত খেতে দিত। কারন সে জানত সারাদিন এই শহরের অলিগলি ঘুরে তার বাসায় গিয়ে হাজির হয়েছি। শত প্রতিকূলতায়ও আমার ফুফার মুখ কখনও মলিন হতে দেখিনি। সব সময় আমার সাথে হাসি মুখে কথা বলতেন। হয়তোবা আমার ফুফু আমার জন্য অনেক সময় ফুফার কথা শুনেছেন, কিন্তু আমি তা কখনই বুঝতে পারিনি। সর্বশেষ পরিবারসহ ঢাকায় বাসা নেয়ার পূর্বেও তার বাসায় আমার স্ত্রী-সন্তানসহ দশদিন অবস্থান করেছিলাম। আমি যখন নতুন বাসায় যাই আমার বউকে নতুন কাপড় ও বাচ্চাকে নতুন পোষাকসহ সংসারের প্রয়োজনীয় টুকিটাকি জিনিসপত্র কিনে দিয়েছিলেন আমার ফুফু। অবশ্যই সেখানে আমার ফুফা শরফুদ্দিন মাতুব্বরের হাত ছিল। শুধু তাই নয়, আমি যখন সপ্তাহর পর সপ্তাহ তার বাসায় থাকার পর বাড়ী রওনা হই তখন আমার ফুফু আমাকে লঞ্চ ভাড়াসহ কিছু টাকা পকেটে ঢুকিয়ে দিতেন। অবশ্যই সেই টাকাটা ছিল আমার ফুফার পকেটের। এত জালাতন তাকে আমি করেছি, ক্ষমা চাওয়ার শেষ সুযোগটাও আমি পেলাম না। নিজেকে বড়ই অপরাধী মনে হচ্ছে এসময়।শুধু আমি নয়, আমাদের এলাকার শত শত মানুষের বিপদের সহায়তাকারী ও আশ্রয়দাতা ছিলেন আমার ফুফা শরফুদ্দিন মাতুব্বর। এলাকার মানুষ চিকিৎসা, চাকুরী প্রার্থীদের চাকুরীর ইন্টারভিউ, বিদেশগামী যাত্রীসহ বিপদে পরা কত মানুষের আশ্রয়স্থল ছিল শরফুদ্দিন মাতুব্বর তার হিসাব নেই। অনেক ভাল কাজের সাথে জড়িত ছিলেন তিনি। জীবনে কারও সাথে খারাপ ব্যাবহার করেছেন এমন নজীর তার জীবনে নেই। আমার বিশ্বাস আমাদের সকলের হৃদয়ের বুকফাটা কান্না ও দোয়ায় আল্লাহ তাকে বেহেস্ত নসীব করবে।আমার ফুফা একজন শিক্ষানুরাগী ছিলেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। চরকালেখান আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকা ছিল অগ্রণী। ঐ কলেজ প্রতিষ্ঠায় তার বাসায় অগনিত সভা হয়েছে। চরকালেখা নেছারার মাদ্রাসা ও স্থানীয় সকল শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে তিনি দান অনুদান করতেন হাত খুলে। তিনি ছিলেন চরকালেখান আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।
শরফুদ্দিন আহম্মেদ মাতুব্বরকে হারিয়ে এলাকাবাসী হারিয়েছে একজন যোগ্য প্রতিবেশী অবিভাবককে, আর সন্তান হারিয়েছে পিতাকে আর আমার ফুফু আরিয়েছে তার আজীবন বন্ধুর মত সঙ্গী।
এস এম জহিরুল ইসলাম
চেয়ারম্যান
রুর্যাল জার্নালিস্ট ফাউন্ডেশন (আরজেএফ)
মন্তব্য