এনামুল হক রাশেদী >>> চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর—যাকে অনেকেই ‘দেশের ভেতর আরেক দেশ’ এবং ‘সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। দুর্গম পাহাড়ি ভূ-প্রকৃতির কারণে এখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা সীমিত। অভিযোগ রয়েছে, কার্যত এলাকাটি অপরাধীচক্রের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক একেএম শহিদুর রহমানও সম্প্রতি স্বীকার করেছেন, জঙ্গল সলিমপুর এখন সন্ত্রাসীদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে।গত ১৯ জানুয়ারি কয়েকজন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে র্যাব অভিযান চালাতে গেলে ভয়াবহ হামলার শিকার হয় বাহিনীটি। এতে র্যাবের এক কর্মকর্তা নিহত এবং আরও তিনজন আহত হন। ঘটনার পর জড়িতদের গ্রেপ্তারে জোরালো অভিযানের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।মাইকে ঘোষণা দিয়ে র্যাবের ওপর হামলা প্রকাশিত সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, শতাধিক লোক লাঠিসোঁটা নিয়ে র্যাবের গাড়ি ধাওয়া করে, গ্লাস ভাঙচুর করে এবং প্রকাশ্যে গুলি চালায়। এক পর্যায়ে র্যাব সদস্যদের অস্ত্রও ছিনিয়ে নেওয়া হয়। হামলার সময় মসজিদের মাইকে গেট বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়।র্যাব জানায়, হামলায় ৪০০-৫০০ জন অংশ নেয়। নিহত র্যাব কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া র্যাব-৭-এর উপসহকারী পরিচালক ছিলেন।র্যাব মহাপরিচালক বলেন, ‘এই ঘটনার জন্য দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হবে। বিচার ও রায় কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি মনিটর করা হবে।’র্যাব-৭-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল হাফিজুর রহমান জানান, হামলাকারীরা ইয়াসিন ও রিদোয়ান গ্রুপের সদস্য।শহরের পাশেই সন্ত্রাসের রাজ্যঃজঙ্গল সলিমপুর চট্টগ্রাম শহর থেকে মাত্র ১৫-২০ মিনিটের পথ। বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার পশ্চিমে প্রায় তিন হাজার ১০০ একর পাহাড়ি ভূমি নিয়ে এই এলাকা গড়ে উঠেছে। এখানে বর্তমানে ২০-২৫ হাজার ঘর রয়েছে। বসবাস করছে অন্তত এক থেকে দেড় লাখ মানুষ। ছিন্নমূল মানুষ কম খরচে থাকার জন্য এখানে আসে। তবে অপরাধীদের জন্য এলাকাটি সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। এলাকায় ঢুকতে হলে আলাদা পরিচয়পত্র লাগে। বাইরের কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয় না। পাহারায় থাকে সন্ত্রাসীদের নিজস্ব বাহিনী।স্থানীয় সাংবাদিকরা জানান, আলীনগর ও নবীনগরে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। শুধু নির্দিষ্ট স্টিকারযুক্ত সিএনজি চলাচল করতে পারে।গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে পুরো এলাকা এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করে ইয়াসিন গ্রুপ, রোকন গ্রুপ ও রিদোয়ান গ্রুপ। আগে মশিউর-গফুর গ্রুপের দখলে ছিল। পরে রোকন গ্রুপ, বর্তমানে ইয়াসিন গ্রুপ প্রভাব বিস্তার করেছে বলে জানা গেছে।রাজনৈতিক কোনো দলের প্রকাশ্য কার্যক্রম নেই, তবে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সখ্যতা রেখে টিকে থাকার কৌশল নেয় এসব গ্রুপ।কেন নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছেনাঃ২০১২ সাল থেকে একাধিকবার উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও প্রতিবারই হামলা ও প্রতিরোধের মুখে প্রশাসন পিছু হটে। মডেল মসজিদ, কারাগার শাখা, নভোথিয়েটার নির্মাণের প্রকল্পও থমকে আছে। নব্বইয়ের দশকে বন বিভাগের এক কর্মচারী আলী আক্কাস পাহাড় কেটে বসতি গড়ে তোলেন। তার বাহিনীর ধারাবাহিকতাই আজকের এই সন্ত্রাসী কাঠামো।মানব ঢাল সাধারণ মানুষঃঅভিযান চালালে সাধারণ মানুষ সন্ত্রাসীদের পাশে দাঁড়ায়। কারণ উচ্ছেদ হলে তাদের আর থাকার জায়গা থাকবে না।চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘ফোর্স প্রয়োগ করলে নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব, তবে এতে অনেক সাধারণ মানুষ মারা যেতে পারে। সন্ত্রাসীরা সাধারণ মানুষকে মানব ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।’র্যাবের অধিনায়ক লে. কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, ‘চাওয়ার মতো করে চাইলে জঙ্গল সলিমপুর নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে।’











মন্তব্য