আব্দুল্লাহ আল মারুফ, চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙা শিল্পকে টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি শ্রমিকদের পূর্ণ নিরাপত্তা ও ‘জিরো ক্যাজুয়ালটি’ (শূন্য প্রাণহানি) নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তিনি বলেছেন, ঝুঁকিপূর্ণ জাহাজ কাটার আগে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিষাক্ত গ্যাস শনাক্ত এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
রোববার (২৩ আগস্ট) সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজ প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
গত ১৪ আগস্ট ওই ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে নিহত ১০ শ্রমিকের পরিবারের সদস্যদের হাতে ক্ষতিপূরণের চেক ও নগদ অর্থ তুলে দিতে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইকেলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ) এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
জেলা প্রশাসক জানান, দুর্ঘটনাটি মূলত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের কারণে ঘটেছে। তাৎক্ষণিকভাবে গ্যাস নিরাপদে অপসারণের মতো প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ইয়ার্ড বা স্থানীয় বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞদের ছিল না। বিশেষ করে এলএনজি বা গ্যাসবাহী জাহাজ কেনা ও কাটার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি আরও জানান, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে ইতিমধ্যে তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। গ্যাস ছড়িয়ে থাকায় শুরুতে তদন্তকারীরা ঘটনাস্থলে প্রবেশ করতে না পারলেও পরে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে তিন সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়। জাহাজে কীভাবে গ্যাস জমেছিল এবং কাটার আগে তা কেন অপসারণ করা হয়নি—তা খতিয়ে দেখে দ্রুত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, নিহত প্রতিটি শ্রমিকের পরিবারকে বিএসবিআরএ ও ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে মোট ১০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দুর্ঘটনার পরপর এক লাখ টাকা এবং শিল্পনীতির বিধান অনুযায়ী দুই লাখ টাকা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়। বাকি সাত লাখ টাকার চেক এদিন পরিবারের সদস্যদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
এ ছাড়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বিধান অনুযায়ী জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সীতাকুণ্ডে বসবাসকারী পাঁচ নিহত শ্রমিকের পরিবারকে নগদ ২৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। বাকি পাঁচ পরিবার তাদের স্থায়ী ঠিকানার সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে এই অর্থ পাবে।
জেলা প্রশাসক বলেন, মানুষের জীবনের কোনো ক্ষতিপূরণ হয় না। তবে উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুতে কোনো পরিবার যেন পথে না বসে, সে জন্যই এই সহায়তা। এ সময় আহত শ্রমিকদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং তাঁদের অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতি ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষকে পূরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
জাহাজভাঙা শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিক এবং পরোক্ষভাবে প্রায় আড়াই লাখ মানুষের জীবিকা জড়িত উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকা কোনোভাবেই ঝুঁকিতে ফেলা যাবে না। শ্রমিকদের সচেতনতা ও প্রশিক্ষণে মালিকপক্ষ ও শ্রম দপ্তরকে উদ্যোগ নিতে হবে। দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্প যেন কোনো সংকটে না পড়ে, সে বিষয়েও সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।বিএসবিআরএর সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন চৌধুরী নিহত শ্রমিকদের প্রতি শোক প্রকাশ করে শিল্পে শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিতের আহ্বান জানান। ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফেরদৌস ওয়াহিদ এই দুর্ঘটনার জন্য ক্ষমা চান এবং ভবিষ্যতেও নিহত শ্রমিকদের পরিবারের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হক, সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ফজলে রাব্বি প্রমুখ।
উল্লেখ্য, গত ১৪ আগস্ট ওই ইয়ার্ডে এমটি রাসি’ নামের একটি স্ক্র্যাপ জাহাজের ব্যালাস্ট ট্যাংকে কাজ করার সময় বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ঘটনাস্থলেই নয়জন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজন শ্রমিক মারা যান।


মন্তব্য