এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রাম >>> চট্টগ্রাম মহানগরীতে যানজট নিরসনে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে একের পর এক সড়ক সম্প্রসারণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও অবৈধ পার্কিং, ফুটপাত ও সড়ক দখল এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কারণে কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না। বরং অনেক এলাকায় চার লেনের সড়ক কার্যত দুই লেন, কোথাও বা এক লেনে পরিণত হয়ে নগরবাসীর দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে।সরেজমিনে দেখা গেছে, নিমতলা থেকে অলংকার মোড় পর্যন্ত পোর্ট কানেক্টিং রোডের একাধিক অংশে ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও কনটেইনারবাহী প্রাইম মুভার দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের যান চলাচল নির্বিঘ্ন করতে চার লেনের এই সড়ক নির্মাণ ও সম্প্রসারণ করা হলেও বর্তমানে সেটি অনেকাংশেই অবৈধ পার্কিংয়ের দখলে।একই চিত্র পতেঙ্গা থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত নির্মিত আউটার রিং রোডেও। নগরীর যানবাহনের চাপ কমাতে নির্মিত চার লেনের এই সড়কের দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকে শত শত ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও প্রাইম মুভার। ফলে সড়কটি অনেকটা অস্থায়ী ট্রাক টার্মিনালে পরিণত হয়েছে। পতেঙ্গা, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ড্রাইডক ও জ্বালানি তেল ডিপোগামী সড়কেও একই অবস্থা বিরাজ করছে।শুধু এসব সড়কই নয়, সিডিএ অ্যাভিনিউ, শেখ মুজিব রোড, আগ্রাবাদ এক্সেস রোড, মুরাদপুর-অক্সিজেন সড়ক, অলংকার-দেওয়ানহাট সড়ক, বাকলিয়া অ্যাক্সেস রোড, আন্দরকিল্লা-নিউমার্কেট সড়ক, সিরাজউদ্দৌলা রোড, বহদ্দারহাট, চকবাজার, বায়েজিদ বোস্তামী সড়ক, কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে কালুরঘাট, অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়ক, ফৌজদারহাট, সাগরিকা, পতেঙ্গা, হালিশহর ও কাট্টলীসহ নগরীর প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সড়কেই অবৈধ পার্কিং ও দখলদারিত্বের একই চিত্র দেখা যায়।সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নগরীর যানজট নিরসনে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) বিভিন্ন সময়ে সরু সড়ক চার লেনে উন্নীত করেছে, মিডিয়ান, প্রশস্ত ফুটপাত ও আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ করেছে এবং বিভিন্ন মোড় উন্নয়নে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে। উদ্দেশ্য ছিল যান চলাচলের গতি বৃদ্ধি, সময় ও জ্বালানি সাশ্রয় এবং নাগরিক দুর্ভোগ কমানো। কিন্তু অবৈধ দখল ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে এসব প্রকল্পের বড় অংশই প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি।ঘুরে দেখা গেছে, সম্প্রসারিত সড়কের এক বা একাধিক লেন দখল করে রাখা হয়েছে ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও কনটেইনারবাহী যানবাহনে। কোথাও হকারদের দোকান, কোথাও নির্মাণসামগ্রী, আবার কোথাও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালামাল ফুটপাত ও সড়ক দখল করে রেখেছে। ফলে চার লেনের সড়ক কার্যত সংকুচিত হয়ে পড়েছে এবং যানজট আগের তুলনায় আরও প্রকট হয়েছে।সংশ্লিষ্টরা জানান, নগরীতে ভারী যানবাহনের জন্য পর্যাপ্ত ট্রাক টার্মিনাল বা হোল্ডিং ইয়ার্ড না থাকায় চালকরা বাধ্য হয়ে রাস্তার পাশেই ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান রেখে দেন। বিশেষ করে বন্দর, ইপিজেড, আইসিডি ও শিল্পাঞ্চলমুখী সড়কগুলোতে এ সমস্যা সবচেয়ে বেশি। নিয়মিত নজরদারি ও আইন প্রয়োগের ঘাটতিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।এদিকে নগরীর অধিকাংশ ফুটপাতও এখন পথচারীদের জন্য ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। নিউমার্কেট, জিইসি মোড়, ওয়াসা মোড়, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, দুই নম্বর গেট, চাক্তাই, রাজাখালী, রহমতগঞ্জ ও আসকার দীঘির পাড় এলাকায় ফুটপাতজুড়ে দোকান, ভাসমান ব্যবসা ও মালামাল রাখার কারণে পথচারীদের সড়কে নেমে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।সংশ্লিষ্টদের মতে, সড়ক সম্প্রসারণের আগে কোথায় ট্রাক পার্কিং হবে, কীভাবে হকারদের পুনর্বাসন করা হবে এবং কীভাবে অবৈধ দখল রোধ করা হবে—এসব বিষয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি। ফলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও ব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি।নগর পরিকল্পনাবিদরা বলেন, শুধু রাস্তা প্রশস্ত করলেই যানজট কমে না। সড়কের একটি বড় অংশ যদি অবৈধভাবে দখল হয়ে থাকে, তাহলে উন্নয়নের সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। উন্নত নগরগুলোতে অন-স্ট্রিট পার্কিং কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকে এবং ভারী যানবাহনের জন্য পৃথক ট্রাক টার্মিনাল ও হোল্ডিং ইয়ার্ড থাকে। চট্টগ্রামে সেই অবকাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি।তাদের মতে, সড়ক ব্যবস্থাপনা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, কার্যকর পার্কিং নীতিমালা, হকার পুনর্বাসন এবং কঠোর আইন প্রয়োগ একসঙ্গে বাস্তবায়ন না হলে জনগণের অর্থে নির্মিত অবকাঠামোর প্রকৃত সুফল পাওয়া যাবে না। উন্নয়ন প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও যদি প্রশস্ত সড়ক অবৈধ পার্কিং ও দখলদারিত্বের কাছে হার মানে, তাহলে সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন থেকেই যায়। সড়ককে দখলমুক্ত রেখে পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে চট্টগ্রাম নগরীর যান চলাচল ব্যবস্থা অনেক বেশি গতিশীল হবে বলে মনে করছেন তারা।


মন্তব্য