২৫শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৯ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ |
শিরোনাম:
‘আমার মৃত্যুর জন্য জামালগঞ্জের ইউএনও দায়ী’, ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে আলোচনায় এসিল্যান্ড সুনামগঞ্জের সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান এবং পুশইন প্রতিরোধে পৃথক দুটি জনসচেতনতামূলক সভা প্রধানমন্ত্রীর কাছে ১৭ বছর তৃণমূলের নির্যাতিত ও ত্যাগিদের মূল্যায়নের দাবীতে যুবদল নেতার খোলা চিঠি রাজশাহীতে সরকারি রাস্তা দখল নিয়ে সংঘর্ষ: সংবাদকর্মীসহ আহত ৩, চন্দ্রিমা থানায় এজাহার ঠাকুরগাঁওয়ে রুহিয়া মাটিতে বিদেশি ফল আনারকলি চাষে সফল উদ্যোক্তা রিমুন উপনির্বাচনে রুহিয়ায় বাবার পক্ষে ধানের শীষের প্রচারণায় মেয়ে ডা. ফাইজা পটিয়ায় নাস্তা কম হওয়ায় শ্বাশুড় বাড়ির নির্যাতনে ৩মাসের অন্ত:সত্বা গৃহবধূর মৃত্যু। সাতকানিয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১ উত্তেজিত জনতার বাসে আগুন ও ফায়ার সার্ভিস আটকে বিক্ষোভ পটিয়ায় মিনিট্রাকের ধাক্কায় পথচারী নিহত। পটিয়ায় লুট হওয়া চিনি লামা হতে উদ্ধার।
আন্তর্জাতিক:
অনুমোদন ছাড়াই কেরানীহাটে বাণিজ্য মেলা: অচল মহাসড়ক ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা নারীর নিরাপত্তায় পথ দেখাচ্ছে ‘সেইভ আওয়ার উইমেন’ সাতকানিয়ায় ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহে সংবাদ সম্মেলন। রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলা: ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশিদের সহায়তার দাবি এনসিপির নেপালে সাহসী সাংবাদিকতার জন্য শহীদুল ইসলাম বাবরকে ফুলেল শুভেচ্ছা সমাজসেবায় বিশেষ অবদান: স্বর্ণপদক ও সম্মাননা পেলেন নাহিদ উজ্জামান শিল্পী শিমলার মুকুটে নেপাল-বাংলাদেশ বন্ধুত্বের অনন্য স্বীকৃতি জিয়া ও খালেদা জিয়ার নামে থাকা ৫৩৪টিসহ ৫ হাজার বিদ্যালয় জাতীয়করণের দীর্ঘ দাবি। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে ফের ভাইরাল ‘থ্রি ইডিয়টস’-এর সেই চ্যালেঞ্জ জাতীয় শোক দিবস ১৫ আগস্ট; বাঙালির হৃদয়ে চির অমর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
     
             

প্রেক্ষাপট: ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে হিজবুল্লাহ, কীভাবে বদলে যাচ্ছে তাদের যুদ্ধকৌশল

  

হিজবুল্লাহ—লেবাননের সশস্ত্র একটি গোষ্ঠী। ইরানপন্থী হিসেবে পরিচিত। একসময় হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা ছিল মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম আলোচিত বিষয়। অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, এ গোষ্ঠী আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। সময়টা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের শেষের দিক। হিজবুল্লাহ তখন চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি পার করছে। হিজবুল্লাহ সদর দপ্তরে একের পর এক আঘাত হানা হয়। একটি, দুটি, তিনটি নয়; পরপর ৮০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় ইসরায়েল। হিজবুল্লাহর তখন চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি পার করছে। ধারণা করা হয়, ইসরায়েলিরা হাসান নাসরুল্লাহর অবস্থান শনাক্ত করে ফেলেছিল। মাটির ৬০ ফুট নিচেও তিনি নিরাপদ ছিলেন না। হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতাদের অনেকে নিহত হন। তাঁদের মধ্যে সংগঠনের প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ ছিলেন।

সংবাদমাধ্যমটি কথা বলেছে হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ সূত্র, লেবাননের রাজনীতিবিদ, সরকারি কর্মকর্তা ও কয়েকজন আরব কূটনীতিকের সঙ্গেও। তাঁদের প্রায় সবাই নাম–পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন। সামরিকভাবে বড় ধাক্কা খাওয়ার অল্প সময়ের মধ্যে হিজবুল্লাহ কীভাবে নিজেদের বাহিনীকে পুনর্গঠন করেছে, সেই বিষয়ে তাঁরা বিস্তারিত জানিয়েছেন। এমনকি হিজবুল্লাহর ভবিষ্যৎ নিয়ে অভ্যন্তরীণ আলোচনা নিয়েও তাঁরা কথা বলেছেন। ২০২৩ সালের পর থেকে লেবাননে ইসরায়েলিদের দুটি যুদ্ধে ইরানের ভূমিকা, হিজবুল্লাহর অর্থনৈতিক সংকট, শিয়াদের একটি অংশের অসন্তোষসহ নানা বিষয় উঠে এসেছে এসব ব্যক্তির কথায়, মতামতে।

পর্দার অন্তরালে থাকা হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের অনেকেই মনে করেন, ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলে হামলা চালানোটা বড় আর ঐতিহাসিক ভুল ছিল। সংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্র জানায়, হামলার সিদ্ধান্ত সরাসরি হাসান নাসরুল্লাহর কাছ থেকে এসেছিল। সূত্রটি বলে, একসময় হিজবুল্লাহর বিশাল রকেট ভান্ডার ছিল। হিজবুল্লাহর একটি সূত্র বলছে, এখন তাদের উদ্দেশ্য জেরুজালেমকে নয়, বরং লেবাননকে রক্ষা করা। ঘনিষ্ঠ সূত্রটি আরও বলে, নাঈম কাসেমের বিষয়ে অনেকেই বলেছিলেন, তাঁর ব্যক্তিগত ক্যারিশমার ঘাটতি রয়েছে। নাঈম কাসেমকে মহাসচিব করার সিদ্ধান্তটি শুরুতে অনেকের বিদ্রূপের মুখে পড়েছিল। অর্থাৎ তাঁরা নিজেদের মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)–এর বংশধর বলে দাবি করতেন। হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বলেছে, নাঈম কাসেম প্রমাণ করেছেন, তিনি সংগঠনকে ধরে রাখতে জানেন।

এমন পরিস্থিতিতে হিজবুল্লাহর বেঁচে থাকা কমান্ডারেরা মুঠোফোন ব্যবহার বন্ধ করে দেন। তাঁরা মোটরসাইকেল ও স্কুটারে করে যোগাযোগ রক্ষা করতে শুরু করেন। হিজবুল্লাহর কমান্ডারেরা মনে করছিলেন, সবকিছুই ফাঁস হয়ে গেছে। হাসান নাসরুল্লাহর মতো সর্বোচ্চ নেতা যদি নিরাপদ না থাকেন, তবে সাধারণ যোদ্ধাদের অবস্থা কী হবে—সেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে হিজবুল্লাহ তাদের সর্বশেষ বিকল্প পরিকল্পনাটি কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেয়। এটি এমন একটি কৌশল ছিল, যা আগে কখনো প্রকাশ্যে আসেনি। ওই সময় হিজবুল্লাহর কমান্ডারদের যোগাযোগের একমাত্র উপায় ছিল এভাবে সামনাসামনি দেখা করা। কোনো ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার না করে তারা নিজেদের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান শুরু করে।

আর এভাবেই শুরু হয় হিজবুল্লাহর ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা। ধ্বংসের মুখ থেকে উঠে আসে হিজবুল্লাহ। সংগঠনের কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। হিজবুল্লাহর এই ঘুরে দাঁড়ানোর যাত্রা সম্পর্কে ভালোভাবে জানেন এমন সাতজনের সঙ্গে কথা বলেছে মিডল ইস্ট আই। তাঁদের ভাষ্য, শুরুর দিকে বড় ধরনের সংশয় থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে হিজবুল্লাহ। ২০২৩ সালের পর থেকে লেবাননে ইসরায়েলিদের দুটি যুদ্ধে ইরানের ভূমিকা, হিজবুল্লাহর অর্থনৈতিক সংকট, শিয়াদের একটি অংশের অসন্তোষসহ নানা বিষয় উঠে এসেছে এসব ব্যক্তির কথায়।

চলতি মাসের শুরুর দিকে এ বিষয়টি নিয়ে ইসরায়েলের আর্মি রেডিও একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে দাবি করা হয়, হিজবুল্লাহর সামরিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে। এ বিষয়ে হিজবুল্লাহর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, সীমান্ত ও সম্পদ বিভাগের প্রধান এবং সাবেক সংসদ সদস্য নাওয়াফ মুসাওয়ি বলেন, তারা লড়াই চালিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর। তবে নাম–পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলা হিজবুল্লাহর কয়েকজন যোদ্ধার মতে, ইসরায়েলের ওই প্রতিবেদনে কিছুটা অতিরঞ্জন রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে ইরান এবং তাদের নেতৃত্বাধীন ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ জোট একটি কৌশল গড়ে তুলেছে। এ জোটে ইরান, সিরিয়া, ইরাক ও ইয়েমেনের হুথিরা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এই কৌশলের মূলে ছিলেন দুজন ব্যক্তি। দুজনই এখন প্রয়াত। তাঁদের একজন ইরানের জেনারেল কাসেম সোলাইমানি। অন্যজন হাসান নাসরুল্লাহ। সোলাইমানি ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম তদারকি করতেন। প্রয়োজনে সরাসরি নির্দেশনাও দিতেন। সোলাইমানি আর নাসরুল্লাহর কর্মতৎপরতার মিল বোঝাতে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র ২০১২ সালের একটি ঘটনার কথা তুলে ধরে। সূত্রটি জানায়, সোলাইমানির এমন প্রস্তাবের জবাবে নাসরুল্লাহ বলেছিলেন, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন। আমাদের সিরিয়ায় যাওয়া প্রয়োজন।’ ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ইরাকের রাজধানী বাগদাদে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় কাসেম সোলাইমানি নিহত হন। এ ঘটনাকে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছে হিজবুল্লাহ।

হিজবুল্লাহর অন্তত তিনটি সূত্রের দাবি, মূলত এ কারণে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস এককভাবে ইসরায়েলে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ইরানের নেতাদের মতো নাসরুল্লাহ নিজেও আশঙ্কা করছিলেন, বড় ধরনের হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। তবে হাসান নাসরুল্লাহর বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। এরপর বছরখানেক ধরে লেবানন–ইসরায়েল সীমান্তজুড়ে পাল্টাপাল্টি হামলা চালায় হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েল। এ সময়ে হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। এসব হামলা চলে পুরো ‘ব্লু লাইনে’। জাতিসংঘ নির্ধারিত এ সীমানা কার্যত লেবানন-ইসরায়েলের সীমান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।

যদিও হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা ইসরায়েলের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সেনাকে উত্তর সীমান্তে আটকে রাখতে সক্ষম হয়। এতে গাজার ওপর চাপ কিছুটা কমলেও হিজবুল্লাহর ক্ষয়ক্ষতি বাড়তে থাকে। দুপক্ষ শুরুর দিকে বেশকিছু অলিখিত সীমার মধ্যে থেকে হামলা চালায়। উভয় পক্ষের মধ্যে এমন এক ধরনের বোঝাপড়া ছিল যে, বেসামরিক এলাকায় হামলা করা হবে না। ধীরে ধীরে সেই সীমা অতিক্রম করতে শুরু করে ইসরায়েল। সেই সঙ্গে হিজবুল্লাহর প্রতিক্রিয়া কেমন হতে পারে, সেটিও তারা পরীক্ষা করতে থাকে। এর প্রতিক্রিয়ায় হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের মাউন্ট মেরনের একটি সামরিক ঘাঁটিতে ব্যাপক রকেট হামলা চালায়।

ছয় মাস পর হিজবুল্লাহর শীর্ষ সামরিক কমান্ডার ফুয়াদ শুকুর ইসরায়েলের হামলায় নিহত হন। এর জবাবে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ হিজবুল্লাহর পেজার ও ওয়াকিটকি নেটওয়ার্কে হামলা চালায়। হিজবুল্লাহর অন্তত দুটি সূত্রের দাবি, পাল্টা জবাবের পরিকল্পনার পুরোটা সময় আড়ি পেতে শুনেছিল ইসরায়েল। তাই আগেই তারা হিজবুল্লাহর যোগাযোগ ব্যবস্থায় ম্যালওয়্যার ঢুকিয়ে দেয়। ইসরায়েলের সমর্থকেরা এ অভিযানকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে আখ্যা দেন। অনেকেই একে জেমস বন্ড চলচ্চিত্রের ঘটনার সঙ্গে তুলনা করেন। এসব বিস্ফোরণে প্রায় ৪০ জন নিহত হন। আহত হন আরও কয়েক হাজার মানুষ। মোসাদের তৎকালীন প্রধান ডেভিড বার্নিয়া এই অভিযানের নেতৃত্ব দেন বলে ধারণা করা হয়।

হিজবুল্লাহর সূত্রগুলো স্বীকার করে নিয়েছে, এটি ছিল তাদের জন্য বড় ধরনের ধাক্কা। তবে তাদের দাবি, শেষ পর্যন্ত এই সংকট থেকে তারা শিক্ষা নিয়েছে। ১৭ সেপ্টেম্বর বিস্ফোরিত পেজারগুলো সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে। হিজবুল্লাহর সূত্রগুলোর মতে, প্রকৃত লক্ষ্য ছিল হিজবুল্লাহর কমান্ড কাঠামো ধ্বংস করা। সূত্রগুলোর দাবি, ২০২২ সাল থেকে হিজবুল্লাহর কাছে ত্রুটিযুক্ত পেজার সরবরাহ করতে শুরু করে ইসরায়েল–সমর্থিত একটি কোম্পানি। এ সংখ্যাগুলো মোসাদের একজন এজেন্টের আগে দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে মিলে যায়। তিনি দাবি করেছিলেন, ইসরায়েলের একটি বিশেষ ইউনিট এই অপারেশন পরিচালনা করেছে।

দ্বিতীয় দিনের হামলায় অন্তত ২৫ জন নিহত হন। আর প্রথম দিনের হামলায় নিহত হয়েছিলেন ১২ জন। হিজবুল্লাহর দুটি সূত্রের দাবি, তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় ইসরায়েল। কারণ, তাদের সন্দেহ ছিল হিজবুল্লাহ বিষয়টি ধরে ফেলেছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকেই হিজবুল্লাহ ও ইরান বুঝতে পারে, যুদ্ধ আর সীমিত রাখা সম্ভব হবে না। এর আগে হিজবুল্লাহর একটি পরিদর্শন দল তাদের পেজারগুলো নিয়ে বারবার সন্দেহ প্রকাশ করছিল। হিজবুল্লাহ–সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এ সিদ্ধান্ত ইসরায়েলকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করে। টানা ৬৬ দিন ধরে হিজবুল্লাহর এই ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

কিন্তু সেসব দিন পেছনে ফেলে নিজেদের নতুন করে সংগঠিত করেছে হিজবুল্লাহ।

তাঁরা কী বলছেন এবং কী করছেন—সবই জেনে যাচ্ছে।

এমনকি হাজারো পেজার ও ওয়াকিটকিতে বিস্ফোরক বসানো হয়েছিল।

তাঁরা লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলের হারেত হরেইক ও শিয়াহসহ বিভিন্ন এলাকায় জড়ো হন।

সম্মিলিতভাবে এই এলাকা ‘দাহিয়েহ’ নামে পরিচিত।

বেকারি, ব্যাংকের কোনো শাখা, এমনকি মুঠোফোনের দোকান—কোথায় দেখা করেননি তাঁরা।

দুই, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলের সম্ভাব্য স্থল অভিযান মোকাবিলার প্রস্তুতি শুরু করা।

এমনকি হিজবুল্লাহর সর্বোচ্চ নির্বাহী পরিষদ শুরা কাউন্সিলের ভেতরেও এ নিয়ে ভিন্নমত ছিল।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর উদ্ধার করা বলে দাবি করা কিছু অভ্যন্তরীণ নথির উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজায় হামাসের নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরুল্লাহকে সমন্বিত ও আকস্মিক হামলায় যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

এর লক্ষ্য চারদিক থেকে হুমকি সৃষ্টির মাধ্যমে ইসরায়েলকে ঘিরে ফেলা।

আরবিতে সাবলীল কাসেম সোলাইমানি বহু যুদ্ধের অভিজ্ঞ ছিলেন।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) অভিজাত কুদস ফোর্সের প্রধান ছিলেন তিনি।

এর মধ্যে ছিল ইরাকের শিয়া আধাসামরিক বাহিনী, ইয়েমেনের হুতিরাও।

সূত্রটির দাবি, ওই সময় নাসরুল্লাহকে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপের পরামর্শ দিয়েছিলেন সোলাইমানি।

উদ্দেশ্য ছিল, সিরিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সরকারকে সমর্থন দেওয়া।

‘ইউনিটি অব ফ্রন্টস’ কৌশলও ধীরে ধীরে গতি হারাতে শুরু করে।

ওই সফরের সময় তিনি নাসরুল্লাহকে জানান, তেহরান যুদ্ধে (গাজা যুদ্ধ) শুধু নৈতিক সমর্থন দিতে প্রস্তুত।

তাই তিনি ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর ইসরায়েলের দিকে সীমিত পরিসরে রকেট হামলার নির্দেশ দেন।

ওই সময়ে ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচারে বোমাবর্ষণ চলছিল।

তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন রাদওয়ান ফোর্সের বিশেষ অভিযান ইউনিটের প্রধান ইব্রাহিম আকিল।

আর সেটা সম্ভব না হলে যুদ্ধে জড়ানো একেবারে উচিত হবে না।

এ সময়ে দুপক্ষের মধ্যে ৭ হাজার রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন হামলা এবং বিমান ও কামানের গোলাবর্ষণ হয়।

ইসরায়েলের সীমান্তের দক্ষিণে নিহত হন ৭০ জন।

এতে গাজার পাশাপাশি আরেকটি ফ্রন্টে মনোযোগ দিতে হয় ইসরায়েলকে।

একই সঙ্গে উত্তরাঞ্চল থেকে প্রায় ৬০ হাজার ইসরায়েলি বাসিন্দাকে সরিয়ে নিতে হয়।

হিজবুল্লাহর প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ সতর্ক করে বলেছিলেন, বৈরুতের দাহিয়েহ এলাকায় হামলা হলে তার জবাব দেওয়া হবে তেল আবিবে হামলা চালিয়ে।

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে দাহিয়েহ এলাকায় ইসরায়েলি হামলায় হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতা সালেহ আল-আরুরি নিহত হন।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে এসে হিজবুল্লাহর নিরাপত্তা আর গোয়েন্দা ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশের ব্যাপকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

১৭ ও ১৮ সেপ্টেম্বর ইসরায়েল হাজারো পেজার ও শত শত ওয়াকিটকিতে বিস্ফোরণ ঘটায়।

হিজবুল্লাহর সরবরাহ ব্যবস্থায় ভুয়া কোম্পানির মাধ্যমে অনুপ্রবেশ করে যোগাযোগযন্ত্রে বিস্ফোরক বসিয়েছিল ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ।

হামলার স্মরণে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সোনার তৈরি একটি পেজার উপহার দেন।

অন্যদিকে পেজার মূলত বার্তা পাঠানো বা সদস্যদের ডেকে পাঠানোর কাজে ব্যবহৃত হতো।

এগুলোর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অযোদ্ধা কর্মকর্তাদের কাছে ছিল।

হামলার সময় এমন প্রায় ২ হাজার ৫০০টি পেজার ছিল।

ওয়াকিটকি নিয়ে অভিযানটি এক দশক ধরে অত্যন্ত গোপনে চলছিল।

দুটি সূত্রের দাবি, ১৮ সেপ্টেম্বরের অভিযানের সময় ১৫ হাজার ওয়াকিটকি গুদামে সংরক্ষিত ছিল।

তিনি দাবি করেছিলেন, ইসরায়েলের একটি গোপন ছদ্মবেশী কোম্পানি হিজবুল্লাহকে প্রায় ১৬ হাজার ওয়াকিটকি সরবরাহ করেছে।

ওই সময় হামলায় হাজারো পেজার ধ্বংসের পরদিন চালানো অভিযানে মাত্র কয়েক শ ওয়াকিটকি বিস্ফোরিত হয়েছিল।

১৯ সেপ্টেম্বর এ নিয়ে শীর্ষ নেতৃত্বের একটি বৈঠক হওয়ার কথা ছিল।

এগুলো নিরাপত্তাসংক্রান্ত অন্তত দুটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল।

তাই আরও পরীক্ষা–নিরীক্ষার জন্য কয়েকটি নমুনা ইরানে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।

এ অভিযানে শুধু হাসান নাসরুল্লাহ নন, তাঁর চাচাতো ভাই ও উত্তরসূরি হাশেম সাফিউদ্দিন নিহত হন।

এ পরিস্থিতিতে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন ইউনিটে লড়াই চালিয়ে যান হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা।

তাঁরা ইসরায়েলিদের অগ্রযাত্রা ধীর করে দেন।

দক্ষিণাঞ্চলে হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা যখন ইসরায়েলি বাহিনীকে ব্যস্ত রাখছিলেন, তখন ঘনিষ্ঠ এই মিত্রকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসে তেহরান।

এ কাঠামোয় হিজবুল্লাহর একেকজন কমান্ডারের বিপরীতে একজন করে সমকক্ষের ইরানি কর্মকর্তা থাকেন।

হিজবুল্লাহর বিভিন্ন ইউনিট ও বিভাগের প্রধান এবং তাঁদের উপপ্রধানেরা নিহত হওয়ার পর সেসব ইরানি কর্মকর্তারা শূন্যতা পূরণে লেবাননে আসেন।

হিজবুল্লাহর বিশ্বাস, তাদের টিকে থাকার সক্ষমতা ইসরায়েলকে বিস্মিত করেছিল।

হিজবুল্লাহর সূত্রগুলোর ভাষ্য, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ধারণা করেছিলেন, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চাপের মাধ্যমে এবার রাজনৈতিকভাবে হিজবুল্লাহকে দুর্বল করা যাবে।

এর ফলে সেনাদের জীবন আর ঝুঁকিতে ফেলতে হবে না।

অনেকে মনে করেন, হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা মাত্র ২০ শতাংশে নেমে এসেছে, কার্যত তারও কম রয়েছে।

একই সঙ্গে এই মতও জোরালো হয়, লেবাননকে পুরোপুরি ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হলে হিজবুল্লাহর অধ্যায়ের অবসান ঘটাতে হবে।

এই দুই দেশ মনে করত, হিজবুল্লাহর নেতৃত্বের উচিত সম্মানজনকভাবে সরে যাওয়ার সুযোগ নেওয়া।

এর মধ্যে সিরিয়ায় বাশার আল–আসাদের সরকারের পতন হিজবুল্লাহকে আরও দুর্বল করে দেয়।

আল–আসাদের সরকারকে টিকিয়ে রাখতে এক দশক ধরে লড়েছে হিজবুল্লাহ।

এতে হিজবুল্লাহ জনবল, অর্থ ও আরব বিশ্বের মানুষের সমর্থনের অনেকটা হারিয়েছে।

যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে বলা হয়েছিল, লিতানি নদীর দক্ষিণ থেকে হিজবুল্লাহর বাহিনী সরিয়ে নেওয়া হবে।

পরে বিভিন্ন দেশ ও লেবাননের রাজনৈতিক দলগুলো দাবি তোলে, হিজবুল্লাহকে আরও উত্তরে সরে যেতে হবে।

দাবি ওঠে, শুধু লিতানির দক্ষিণ নয়, উত্তর দিক থেকেও হিজবুল্লাহকে সরে যেতে হবে।

অথচ আমরা সবাই জানতাম, এটি মূল চুক্তির অংশ ছিল না।’ এই কঠোর অবস্থান হিজবুল্লাহকে আরও অনড় করে তোলে।

এমনকি জুনে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধেও তারা অংশ নেয়নি।

খোলা চোখে দেখে মনে হতে পারে, ১৫ মাসের যুদ্ধবিরতির সময় হিজবুল্লাহর সামরিক শাখা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে, পড়ছে।

এ সময়ে প্রায় ৩ হাজার বিমান ও ড্রোন হামলা এবং গোলাবর্ষণ করা হয়।

হিজবুল্লাহর বেশির ভাগ কমান্ডার এবং তাঁদের উত্তরসূরিদের হত্যার পর ইসরায়েল পরবর্তী স্তরের নেতৃত্বকেও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।

এদিকে ইসরায়েলি সেনা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সীমান্তে পাঁচটি সামরিক ঘাঁটি শক্তিশালী করে এবং সেগুলোর পরিসর বাড়ায়।

সীমান্তঘেঁষা শিয়া-অধ্যুষিত শহর ও গ্রামগুলো প্রায় পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

এত কিছুর পরও হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো পাল্টা জবাব দেখা যায়নি।

এতে অনেকের ধারণা হয়, দলটি হয় অনেক বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছে, নয়তো প্রতিরোধ গড়ে তোলার সাহস নেই।

কার্যকরভাবে পরিচালনা করাটাও কঠিন ছিল।

যুদ্ধ সেই দুর্বলতাকে আরও প্রকট করে তোলে।

হিজবুল্লাহর সূত্রগুলো জানিয়েছে, পুনর্গঠনের সময় প্রতিটি ইউনিট ও বিভাগকে একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করা হয়।

এ ক্ষেত্রে প্রয়াত হিজবুল্লাহ কমান্ডার ইমাদ মুগনিয়াহর গেরিলা যুদ্ধকৌশল অনুসরণ করা হয়।

প্রতিটি ইউনিটকেই আগেভাগে নির্ধারিত বিভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

যুদ্ধের সময় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশ ছাড়াই যাতে এসব ইউনিট কার্যকরভাবে অভিযান চালাতে পারে, সে লক্ষ্যে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা ছিল—গুলি শেষ না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা আর থাকবে না।

প্রয়োজন হলে যোদ্ধারা নিজেদের অবস্থান ছেড়ে পিছু হটতে পারবেন।

লেবাননের অনেক শিয়া মুসলিম তাঁকে অনুসরণ করতেন।

তবে হিজবুল্লাহ সে সময় ভিন্ন হিসাব কষেছিল বলে সূত্রটি জানায়।

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এখন ‘গেমিং ক্যাফের’ ছড়াছড়ি।

জেরুজালেম, তেহরান কিংবা কায়রো—সবখানেই দেখা যায় এমন দৃশ্য।

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন

You cannot copy content of this page