বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এখন আর কেবল ভারতকে কেন্দ্র করে নির্ধারণ করার সুযোগ নেই। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় এমন একমুখী নীতি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থ হতে পারে। এর অর্থ ভারতকে উপেক্ষা করা কিংবা বৈরিতায় জড়ানো নয়, বরং পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে কূটনৈতিক দিগন্ত বিস্তৃত করা। আজকের পৃথিবীতে বন্ধুত্বের চেয়ে স্বার্থ, আবেগের চেয়ে অর্থনীতি এবং স্থায়ী আনুগত্যের চেয়ে পরিবর্তনশীল অংশীদারিত্বই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশকে এখন দক্ষিণ এশিয়ার একটি প্রান্তিক রাষ্ট্র হিসেবে না থেকে বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির সক্রিয় কেন্দ্রে পরিণত হতে হবে। ভৌগোলিক অবস্থানের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার সময় এসেছে।
বঙ্গোপসাগর এখন বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহন এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ভারত একে তার কৌশলগত পরিসর মনে করলেও চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে প্রভাব বাড়াতে সচেষ্ট। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এই অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান সংহত করছে। বাংলাদেশের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ মাসে দেশের পণ্যবাণিজ্যে চীন ছিল সবচেয়ে বড় অংশীদার, যার পরেই রয়েছে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক কোনো একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব নয়। চীন থেকে শিল্পের যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি আসে, ভারত থেকে আসে তুলা ও খাদ্যপণ্য, আর যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজার হিসেবে টিকে আছে।
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্যবাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে প্রায় ৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তির কাঠামো এবং বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনার সমঝোতা প্রমাণ করে যে, সক্রিয় অর্থনৈতিক কূটনীতি বাজার সুরক্ষায় কতটা কার্যকর। বিশ্ব অর্থনীতি এখন মুক্তবাণিজ্যের আদর্শ থেকে সরে এসে সংরক্ষণবাদের দিকে ঝুঁকছে। বড় শক্তিগুলো শুল্ক, প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ এবং সরবরাহব্যবস্থাকে পররাষ্ট্রনীতির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের কূটনীতিকে কেবল রাষ্ট্রীয় সফর বা যৌথ বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে কেন্দ্রে আনতে হবে।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আবেগ নয়, বরং বাস্তব স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন। অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, রেল ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জামে চীন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হলেও ঋণের শর্ত, প্রকল্পের ব্যয়, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং পরিবেশগত প্রভাব যাচাই না করে কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত নয়। শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকট এবং মালদ্বীপে ভারত-চীনের প্রতিযোগিতার প্রভাব বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয়। নেপাল দুই বৃহৎ প্রতিবেশীর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করলেও ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। তাই বাংলাদেশের কোনো নির্দিষ্ট বলয়ে যোগ না দিয়ে বিষয়ভিত্তিক অংশীদারিত্বের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। বাণিজ্যে এক দেশ, প্রযুক্তিতে অন্য দেশ এবং জ্বালানিতে ভিন্ন কোনো অংশীদারের সঙ্গে কাজ করাই হবে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন।
ভারতবিরোধিতাকে পররাষ্ট্রনীতির বিকল্প হিসেবে হাজির করাও বিপজ্জনক। ভারতকে বাদ দিয়ে আঞ্চলিক যোগাযোগ, পানি ব্যবস্থাপনা বা সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তবে ভারতের সহযোগিতা প্রয়োজন বলেই বাংলাদেশের ন্যায্য দাবি বিসর্জন দিতে হবে এমন যুক্তিও গ্রহণযোগ্য নয়। তিস্তার পানিবণ্টনসহ অমীমাংসিত ইস্যুগুলোতে ন্যায্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতাকে নতুন করে ভাবতে হবে। সার্ক অকার্যকর হয়ে পড়লেও বিদ্যুৎ বাণিজ্য, জলবায়ু অভিযোজন এবং খাদ্য নিরাপত্তার মতো বিষয়ে সহযোগিতা বাড়ানো গেলে পুরো অঞ্চল উপকৃত হবে। প্রায় দুইশ কোটি মানুষের এই অঞ্চলে আন্তঃসংযুক্তির অভাব দূর করা এখন সময়ের দাবি।
পররাষ্ট্রনীতি কোনো সরকার বা বিশেষ গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়, এটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির নকশা। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকার আমূল বদলে গেলে বিদেশি অংশীদারদের কাছে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। তাই জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে রাজনৈতিক ঐকমত্য, পেশাদার কূটনৈতিক সক্ষমতা এবং শক্তিশালী গবেষণা প্রয়োজন। বাংলাদেশকে ভারত, চীন বা যুক্তরাষ্ট্রের চোখ দিয়ে বিশ্বকে না দেখে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে হবে। যে সম্পর্ক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, রপ্তানি বাড়াবে, প্রযুক্তি আনবে এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অক্ষুণ্ন রাখবে, সেটিই হবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ও বাস্তবসম্মত পথ।
পরিশেষে, ভারত বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী হিসেবে থাকবে, কিন্তু পররাষ্ট্রনীতির একমাত্র কেন্দ্র হতে পারে না। বাংলাদেশের কেন্দ্র হতে হবে বাংলাদেশ নিজেই। সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রেখে, কিন্তু কারও ওপর অতি-নির্ভরশীল না হয়ে বহুমুখী সহযোগিতার ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়াই হবে পরিবর্তিত বিশ্বে বাংলাদেশের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পথ। এই প্রক্রিয়ায় প্রতিটি সিদ্ধান্ত হতে হবে স্বাধীন এবং জাতীয় স্বার্থের অনুকূল। লেখক সহিদুল আলম স্বপন, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি, এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই বাংলাদেশের নতুন মানচিত্রের রূপরেখা তুলে ধরেছেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, সীমান্ত হত্যা, তিস্তার পানিবণ্টন, বাণিজ্যঘাটতি, অশুল্ক বাধা, আন্তঃসীমান্ত নদীর ব্যবস্থাপনা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি দুই দেশের সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরে অস্বস্তি সৃষ্টি করেছে।
বন্ধুত্ব তখনই টেকসই হয়, যখন সেখানে উভয় পক্ষের মর্যাদা ও স্বার্থের স্বীকৃতি থাকে।
একটি দেশ যদি সম্পর্ককে স্থায়ী প্রভাববলয় হিসেবে দেখে, আর অন্য দেশটি যদি নিজের নিরাপত্তার জন্য নীরব আনুগত্যকে কৌশল মনে করে, তবে সেই সম্পর্ক কখনো প্রকৃত অংশীদারিত্বে রূপ নেয় না।
বঙ্গোপসাগর এখন আর শুধু মাছ, গ্যাস কিংবা সমুদ্রবন্দরের বিষয় নয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও তার অংশীদাররা অবাধ নৌচলাচল এবং একটি উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিকের কথা বলছে।
জাপান মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরসহ অবকাঠামো ও শিল্পায়নে যুক্ত।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের আগ্রহ বাণিজ্য, শ্রমমান, সবুজ রূপান্তর ও মানবাধিকারে।
অর্থাৎ উৎপাদনের সরবরাহব্যবস্থা একদিকে, রপ্তানির বাজার অন্যদিকে।
বড় শক্তিগুলো মুখে নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার কথা বললেও নিজেদের শিল্প ও বাজার রক্ষায় তারা ক্রমেই সংরক্ষণবাদী হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা শুধু সামরিক নয়; এটি সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিরল খনিজ, বন্দর, ডিজিটাল অবকাঠামো ও বাজার নিয়ন্ত্রণের লড়াই।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ দেখিয়েছে, দূরের সংঘাতও বাংলাদেশের জ্বালানি, খাদ্য ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা সরাসরি প্রভাব ফেলে তেলের দাম, প্রবাসী আয় এবং সমুদ্রপথে।
কোন দেশ থেকে কাঁচামাল আসবে, কোথায় বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি হবে, নতুন কর্মসংস্থান কোন শিল্পে তৈরি হবে, প্রযুক্তি কোথা থেকে পাওয়া যাবে এবং সংকটের সময় খাদ্য ও জ্বালানির বিকল্প উৎস কী হবে এসব প্রশ্নই এখন আধুনিক কূটনীতির মূল বিষয়।
কিছু শর্ত বাংলাদেশের জন্য কঠিন এবং এসব চুক্তিতে অসমতার ঝুঁকিও রয়েছে।
তারপরও বিষয়টি স্পষ্ট রপ্তানি বাজার টিকিয়ে রাখতে কূটনৈতিক দর-কষাকষির বিকল্প নেই।
একই কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নে এলডিসি-পরবর্তী বাজারসুবিধা, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে নতুন বাজার অনুসন্ধান জরুরি।
শ্রীলঙ্কা দেখিয়েছে, দুর্বল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং অস্বচ্ছ বৈদেশিক ঋণ কীভাবে একটি রাষ্ট্রকে গভীর সংকটে ফেলতে পারে।
মালদ্বীপে ভারত ও চীনের প্রতিযোগিতা অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকেও বিভক্ত করেছে।
পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তাকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারেনি।
তিস্তার পানিবণ্টন, সীমান্তে প্রাণহানি বন্ধ, বাণিজ্যে সমতা এবং ট্রানজিট-ট্রান্সশিপমেন্টে পারস্পরিক লাভ নিশ্চিত করতে দৃঢ় আলোচনা প্রয়োজন।
দিল্লিকে বুঝতে হবে, বাংলাদেশের জনগণের আস্থা ছাড়া দুই দেশের সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
সার্কের অচলাবস্থার পাশাপাশি বিমসটেক, বিবিআইএন এবং ভারত মহাসাগরীয় আঞ্চলিক কাঠামোগুলোকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হবে।
মিয়ানমার সংকট ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনেও শুধু দ্বিপক্ষীয় আশ্বাসের ওপর নির্ভর না করে চীন, ভারত, আসিয়ান, জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ইসলামী সহযোগিতা সংস্থাকে সমন্বিত চাপের মধ্যে আনতে হবে।
বৈদেশিক চুক্তির লাভ-ক্ষতি জনগণের কাছে স্পষ্ট করাও জরুরি।
সূত্র: মানবজমিন


মন্তব্য