এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রাম >>> শ্রমিকদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর। বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) সকালে নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন বন্দর পরিদর্শনে পৌঁছালে বন্দরের ৪ নম্বর গেটে আন্দোলনরত শ্রমিকরা তার গাড়িবহর আটকে বিক্ষোভ করেন।বন্দর সূত্র জানায়, উপদেষ্টার আগমনকে কেন্দ্র করে শ্রমিকদের বিক্ষোভ আরও তীব্র আকার ধারণ করে। তারা গেট এলাকায় অবস্থান নিয়ে স্লোগান দেন এবং গাড়িবহর আটকে দিয়ে তাদের দাবি আদায়ের চেষ্টা করেন।এদিকে চলমান সংকট নিরসনে জরুরি বৈঠকে বসছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। বৃহস্পতিবার সকালে বন্দর কর্তৃপক্ষের কনফারেন্স রুমে অনুষ্ঠিতব্য এ বৈঠকে নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন উপস্থিত থাকার কথা ছিল। বৈঠকে বন্দরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতিনিধিদের অংশ নিতে বলা হয়েছিল।বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) এ সংক্রান্ত একটি চিঠি জারি করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনাকারী সিডিডিএলের পরিচালক যেন বৈঠকে একজন বা দুজন শ্রমিক প্রতিনিধিকে পাঠান।উল্লেখ্য, বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গত শনিবার থেকে শ্রমিকরা আন্দোলনে নামেন। প্রথমে টানা তিন দিন প্রতিদিন আট ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালনের পর তারা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির ঘোষণা দেন।এর ফলে বন্দর জেটিতে কনটেইনার ও পণ্য হ্যান্ডলিং, ইয়ার্ড থেকে পণ্য সরবরাহ ও হস্তান্তর এবং জাহাজ চলাচল কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে আন্দোলন আরও কঠোর হয়েছে। শ্রমিকরা বন্দরের বিভিন্ন প্রবেশদ্বারে অবস্থান নিয়ে ট্রাফিক, ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যালসহ বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বন্দরে প্রবেশে বাধা দিচ্ছেন।আজকের বৈঠকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার অতিরিক্ত পরিচালক, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) আঞ্চলিক কমান্ডার, চট্টগ্রাম নৌ অঞ্চলের কমান্ডার, কোস্টগার্ডের জোনাল কমান্ডার এবং নেভি ইন্টেলিজেন্সের কর্মকর্তাদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।বন্দরকেন্দ্রিক এই অচলাবস্থার দ্রুত সমাধান হবে কি না—সেদিকে নজর রাখছে সংশ্লিষ্ট মহল।বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) বেলা পৌনে ১১টার দিকে বন্দর ভবনের কাছে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। উপদেষ্টা ঢাকা থেকে সকালে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে সরাসরি বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হন।নৌপরিবহন উপদেষ্টার আগমনের খবরে সকাল থেকেই আন্দোলনরত শ্রমিক-কর্মচারীরা বন্দর ভবনের আশপাশে জড়ো হন। চার নম্বর জেটিগেট থেকে কাস্টমস মোড় পর্যন্ত এলাকায় তারা অবস্থান নেন। এ সময় পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে ছিল।পৌনে ১১টার দিকে উপদেষ্টার গাড়িবহর কাস্টমস মোড়ে পৌঁছালে শ্রমিক-কর্মচারীরা স্লোগান দিতে দিতে সামনে এসে গাড়ি আটকে দেন। তারা ‘ভুয়া ভুয়া’ এবং ‘গো ব্যাক অ্যাডভাইজার, গো ব্যাক’সহ নানা স্লোগান দেন। এতে কিছু সময়ের জন্য পুরো এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।প্রায় ১৫ মিনিট পর পুলিশ নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে গাড়িবহরকে বন্দর ভবনের ভেতরে প্রবেশ করায়। মূল ফটক দিয়ে ঢোকার সময় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। তবে একপর্যায়ে শতাধিক শ্রমিক-কর্মচারী স্লোগান দিতে দিতে ভবনের ভেতরে ঢুকে পড়েন।গাড়ি থেকে নেমে ভবনে প্রবেশের সময়ও নৌপরিবহন উপদেষ্টার সামনে বিক্ষোভ চলতে থাকে। পরে পুলিশ ও বন্দরের নিরাপত্তারক্ষীদের সহায়তায় তিনি দ্রুত ভবনের ভেতরে গিয়ে বৈঠকে যোগ দেন।এদিকে, চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ডাকে চলমান অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে বৃহস্পতিবারও বন্দরের সব ধরনের অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বহির্নোঙর থেকে জেটিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ আছে। পণ্য খালাসের অপেক্ষায় থাকা জাহাজগুলো জেটিতে আটকে রয়েছে।নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধের দাবিতে গত শনিবার থেকে টানা কর্মবিরতি পালন করছেন চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা।অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির ষষ্ঠ দিনেও অচল অবস্থায় রয়েছে দেশের প্রধান চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর।বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকে বন্দরে কোনো ধরনের পণ্য ওঠানামা হচ্ছে না। গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ সব হ্যান্ডলিং যন্ত্রপাতি বন্ধ থাকায় পুরো কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। অচলাবস্থায় উদ্বেগ জানিয়েছেন এই বন্দর ব্যবহারকারীরা।দিকে, কর্মবিরতির কারণে নতুন কোনো জাহাজ বন্দরে ভিড়তে পারেনি। ফলে বুধবার পর্যন্ত বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ জাহাজের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৬টিতে। পণ্য ডেলিভারি বন্ধ থাকায় বন্দর এলাকার ভেতরে ও বাইরে হাজারো ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান আটকা পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে যানজট এড়ানোর লক্ষ্যে কর্তৃপক্ষ নতুন করে কোনো ভারী যানবাহন বন্দরে ঢুকতে দিচ্ছে না।নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শ্রমিক ও কর্মচারীরা প্রথমে ৩১ জানুয়ারি থেকে কয়েক ধাপে কর্মবিরতি পালন করেন। ৩ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা থেকে শুরু হওয়া ২৪ ঘণ্টার কর্মসূচি বুধবার সকাল থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে রূপ নেয়। ফলে আমদানি পণ্য খালাস ও রপ্তানি পণ্য জাহাজীকরণ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।রমজানের আগে ভোগ্যপণ্যবাহী বিপুল সংখ্যক কনটেইনার বন্দরে আটকে পড়ায় বাজারে পণ্যের সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, এই অচলাবস্থা দীর্ঘ হলে পণ্যের দাম বাড়ার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।আমদানিকারকরা বলছেন, প্রতিদিনই তাদের অতিরিক্ত স্টোর রেন্ট ও নানা ধরনের মাশুল গুনতে হচ্ছে। রপ্তানিকারকদের অভিযোগ, সময়মতো পণ্য পাঠাতে না পারায় অর্ডার বাতিল এবং বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।











মন্তব্য