বাংলাদেশের যেকোন মিডিয়াতে কেএনএফকে নিয়ে আলোচনা বা বিশ্লেষণ করতে গেলেই অবস্হাদৃষ্টে মনে হচ্ছে যে একটি বিষয়বস্তু হিসেবে বিশ্লেষকগণের কাছে চলে আসে তা হল কুকি-চিন জনগোষ্ঠীদের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়-জ্ঞাপন এবং তাদের জনসংখ্যাতাত্বিক বিষয়। দেশের বিজ্ঞ মহলও এ নিয়ে যথেষ্ট সংশয়ে পড়েননি তা নয়। কুকি-চিনদের উদ্ভূদ সমস্যা নিয়ে রাষ্ট্রের উচ্চ মহল কিংকর্তব্যবিমূঢ়তায় একেবারেই পড়েননি তাও নয়। তাদের মতে এত কম সংখ্যক জনগোষ্ঠী নিয়ে সশস্ত্র আন্দোলন কিভাবে করছে বা সম্ভবপর হয়! বিশেষজ্ঞ মহলের মাথায় আসেনি যে কুকি জনগোষ্ঠীদের অঞ্চলে (বর্তমানের পার্বত্য চট্টগ্রামে) ব্রিটিশ সৈন্যদের ইনভেশনের পর ১৮ শ শতাব্দী থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিরাট ডেমোগ্রাফিক পরিবর্তন হয়েছিল! সেই ট্রানজিশন কিভাবে হল, আর কেনই বা তা হল এটি হয়তো রাষ্ট্রের অধিকর্তাদের কাছে এক অবিদিত বিষয়। এ জনসংখ্যাগত বিবর্তনের কারণ সম্পর্কে একটু ইতিহাসের দিকে তাকালেই তো স্পষ্ট হয়ে যায় অর্থাৎ এই পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলাটি চট্টগ্রাম জেলা থেকে পৃথক হয়ে কেন সৃষ্টি হল, কিভাবে সৃষ্টি হল এবং কোন কারণে হল তা জানবার চেষ্টা করলেই তো খুব সহজে জানা যায়- পাহাড়িয়া অঞ্চলে কালক্রমে কুকিদের জনসংখ্যাগত ট্রানজিশনের ইতিহাসও। কুকি-চিন জনগোষ্ঠীরা যখন সরকারের কাছে অনভিপ্রেত জিওগ্রাফিক চেঞ্জ নিয়ে অভিযোগ তুলে ঠিক তখনই রাষ্ট্রের বিজ্ঞ মহল কুকি জনগোষ্ঠীর ডেমোগ্রাফি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে থাকে অর্থাৎ সেই জনগোষ্ঠীর সংখ্যা আসলে কত ইত্যাদি ইত্যাদি। এতে আশ্চার্যান্বিত হবার কিছু নেই। কারণ, অদ্যাবধি পাহাড়ের নৃতাত্ত্বিক সম্পর্কে এবং তাদের দুঃখ-কষ্টের গল্প, নিপীড়ন-অত্যাচারের কাহিনী নিয়ে এবং ক্ষুদ্রতর নৃগোষ্ঠীদের দেশ ত্যাগের ইতিহাস নিয়ে রাষ্ট্রের উদ্যোগে কোন গবেষকগণ বা সংস্হা সমূহ যখন গবেষণাই করেনি তাহলে দেশের বিজ্ঞ মহল বা নীতিনির্ধারকগণ এসব তথ্য জানবেন কি করে? এ সম্পর্কে অভিজ্ঞ হবেন কি করে? তাছাড়া এ দেশের বিশেষত এ পার্বত্য অঞ্চলের গণমাধ্যম গুলো তো নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রচার করেই না, তাহলে দেশের আপামর জনগণ সঠিক তথ্য জানবে কি করে?শুধু এ বছরের মধ্যেই রেমাক্রি প্রাংসা অঞ্চলে কয়েকটি গ্রাম জনশূন্য হয়েছে। নির্যাতিত জনগণ কয়েক হাজার লোক দেশ ত্যাগ করে ভারতের মিজোরাম রাজ্যে প্রবেশ করে আশ্রয় নিয়েছে। সেই হিসাব কে রেখেছে?রাষ্ট্রের বিজ্ঞ মহলের শুধু জনশুমারীর কর্তৃক গণনা করা ভোটার তালিকা অনুযায়ী জনসংখ্যাতত্বের উপর ঘাটাঘাটি করা ছাড়া তাদের কি জানবেন? এসব গবেষণা করে কি মনে হয় সত্য উদ্ঘাটিত হবে? অবশ্যই না। যাই হোক, কেএনএফ-এর “স্ট্যাস্টিক অ্যাকাউন্ট”-এ সবকিছু রেকর্ডে রক্ষিত আছে। ৭১ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে পালিয়ে গিয়ে এসব পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে আশ্রয় নেয়া জনগন বেশির ভাগ বম, পাংখোয়া এবং লুসাই জনগোষ্ঠীর। তারা জন্মগত সকলই বাংলাদেশী।
বাংলাদেশের লেখক-গবেষক এবং সরকারের জনশুমারীতে বম কুকি জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যাকে সবসময় কম দেখানো হয়েছে। দেখানো হয় সেই সংসদ নির্বাচনের ভোটার তালিকা অনুযায়ী। তুলে ধরা হয়নি মুল জনসংখ্যা আসলে কত এবং সংখ্যাগত ক্রমহ্রাসমানের কারণ। এটা সঠিক যে, ১৯৪৭ সাল থেকে যে বম কুকিদের সংখ্যা ক্রমহ্রাসমান হচ্ছে, হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরো কমে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, বম এবং খুমি জনগোষ্ঠীরা বৃটিশ আমল থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধের ফলে, শান্তিবাহিনী এবং সেনাবাহিনীর মধ্যকার সশস্ত্র সংঘর্ষের কারণে, ২০২২ সাল থেকে বম জনগোষ্ঠীর উপর সেনাবাহিনীর অবর্ণনীয় নির্যাতনের ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছেড়ে ভারতের মিজোরাম এবং বার্মার পালেতুয়া অঞ্চলে বিরাট অংশ দেশাম্তরিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য, বৃটিশ আমলে তথা ১৮শ শতাব্দীতে কুকি বিদ্রোহের সময় পার্বত্য চট্টগ্রামে শুধু পুরোণো কুকি তথা-বম, লাখের বা সেন্দু, লুসাই, পাংখুয়া) জনগোষ্ঠীর গ্রামের সংখ্যা কয়েক হাজার ছিল যেটি বৃটিশ প্রশাসনামলের রিকর্ডেভূক্ত আছে। এক সময় কুকিরা পার্বত্য চট্টগ্রামে অন্যান্য আদিবাসীদের থেকে সংখ্যায় বৃহৎ ছিল। ১৭৯৯ সালে ম্যাকগ্রে নামে একজন ইউরোপীয় সার্জন কুকিদের কিছু বিবরণ তুলে ধরেছিল। তার বিবরণ অনুযায়ী কুকিরা ছিল তদানীন্তন পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাসিন্দা এবং তাদের গ্রামের সংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচশ থেকে দু’হাজার। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে বম কুকিদের গ্রামের সংখ্যা একশো’র চেয়ে কম, লাখেরদের গ্রাম আর নেই। পাংখোয়াদের গ্রাম দু-একটি মাত্র আছে। লাখের কুকি জনগোষ্ঠীরা স্থানান্তরিত হয়েছে বর্তমানের সাইহা অঞ্চলে। বান্দরবন জেলাধীন খুমিদের একটি মৌজার হেডম্যানের অস্তিত্ব একেবারেই বিলুপ্ত। বর্তমানে সাজেক পাহাড় অঞ্চলে লুসাই কুকিদের গ্রাম কয়েকটি মাত্র। সাজেক অঞ্চলের একটি মৌজার অস্তিত্ব আর নেই। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ-এর মতে, এ সাজেক অঞ্চলে যে মৌজাটি ছিল সেই মৌজাটির অস্তিত্ব আজ খোঁজ মিলেনি। এ নিয়ে রাষ্ট্র বেশি ঘাটাঘাটি করা উচিত নয়, নাহলে মামলাও রুজু হতে পারে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এবং অনুপ্রেশকারী বৃহৎ জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। তার মতে এ অঞ্চলটি কুকি জনগোষ্ঠীদের অধ্যূষিত অঞ্চল ছিল, কালক্রমে রাষ্ট্রের অস্তিত্ববিহীন কার্যকলাপের কারণে কুকি জনগোষ্ঠীদের অস্তিত্ব হুমকির মূখে পড়ে। আর এভাবে অনেকেই এদেশ ছেড়ে পাড়ি জমেছে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে। ব্রিটিশ বিদ্রোহী কুকি আন্দোলনের পর ভারতের পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে চলে যায়। কারণ কুকিরা কখনো চায়না নিজভূমিতে দূঃশাসনে পরাধীন হয়ে বসবাস করতে আর এটাও চায় না কোন জনগোষ্ঠী এসে তাদের অঞ্চলে অরাকজকতা সৃষ্টি করুক। তারা চায় স্বাধীন আর সুশাসন। সে দুটি ধারা অনুপস্থিত দেখা দিলেই নীরবে-নিভৃতে হলেও তারা দেশ ত্যাগ করবে। আর যদি তা না হয় তারা সশস্ত্র বিদ্রোহের মাধ্যমে দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে দূর্ধর্ষ প্রতিরোধ গড়ে তুলবে এবং তাদের পূর্ব-পুরুষদের ভূমি উদ্ধার করবার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা চালাবে। সেই পন্হায় সশস্ত্র আন্দোলনে নেমেছে কেএনএফ। গবেষণায় দেখা যায়, বর্তমানে মার পাড়া, পুকজিং, পহুলদুংসেই, পহাইলেং সহ সাইহা এবং মামিট জেলার বিভিন্ন গ্রামে চলে গিয়ে বসতি গড়ে তোলে। আর লংত্লাই জেলার সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন সময়ে পালিয়ে যাওয়া বম কুকিদের বসবাস দেখা যায়।
বর্তমানে মিজোরামে বসবাস করা বাংলাদেশী অর্থাৎ ৪৭-এর দেশ বিভাগের পর থেকে ৭১ মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে শুধু বম ও পাংখোয়া জনগোষ্ঠী সংখ্যা প্রায় ৬০-৭০ হাজারের মতো রয়েছে যাদের পৈতৃক নিবাস আজকের বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম। আজও তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় অঞ্চলকে নিজেদের পূর্ব-পুরুষদের শিকারী ভূমি বা চারণক্ষেত্র হিসেবে দাবী করছে। তাদের মধ্যে এখনো অনেকেরই তাদের ভারতের পরিচয়পত্র বা আধার-কার্ড নেই, তাদের মতে তারা বাংলাদেশী। অনেকেই শুদ্ধ বাংলা বা চাটগাঁইয়া ভাষা ভালমত বলতে পারে। মিজোরামের সীমান্তবর্তী উপশহর এবং গ্রামগুলোতে তাদের বসবাস। একদিন সেই একটি গ্রামে আমার যাওয়া হল। সাক্ষাৎ হল এক বৃদ্ধ লোকের সাথে, তার রয়েছে অনেক সন্তান-সন্ততি। সে বলল, তার আসল বসতি গ্রাম রাঙ্গামাটি জেলার সীমান্তবর্তী একটি গ্রামে, সে গ্রামটি অস্তিত্ব আজ আর নেই। সে নিজেকে গর্ব করে বলতে লাগল “আমি তো বাংলাদেশী”। তাও অনর্গলভাবে শুদ্ধ বাংলা ভাষায় কথা বলছে। এভাবে তার মত হাজার হাজার পরিবার রয়েছে তাদের জন্ম বাংলাদেশের। আমি চিন্তা করলাম সেই জন্যই তো পার্বত্য চট্টগ্রামের ডেমোগ্রাফি ব্যাপক আকারে পরিবর্তিত হয়েছে। আর আমাদের কুকি জনগোষ্ঠীর সংখ্যাতো বছরের পর বছর ক্রমহ্রাসমান হচ্ছে যা আদমশুমারীতেই স্পষ্ট হয়ে উঠে।
এখানে বম জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যাগত সম্পর্ক নিয়ে বেশি ঘাটাঘাটি করা বাংলাদেশের যেকোন বিজ্ঞ মহলের উচিত নয়। কেননা, এটা রাজনৈতিক ইতিহাসের সাথে জড়িত৷ এটা বাংলাদেশ সরকারের বরাবর দাখিল করা কেএনএফ এর দাবিতে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে কুকি-চিন সমস্যা সমাধানে আসতে হলে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এবং এর পরবর্তী সময়ের সেনাবাহিনী এবং শান্তিবাহিনীর মধ্যকার সশস্ত্র সংগ্রামের কারণে হাজার-হাজার পরিবার ভারতের মিজোরামে পালিয়ে আশ্রয় নিয়ে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করে। আবার ২০২২ সাল থেকে কেএনএফ কুকি-চিন জনগোষ্ঠীদের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের ডাক দিলে বম কুকি জনগোষ্ঠীর শত-শত পরিবার পাড়ি জমিয়েছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের মিজোরাম রাজ্যে। বম সহ কুকি-চিন জনগোষ্ঠীর যুবক-যুবতী ধীরে ধীরে এদেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। কারণ এ জন্মভূমি তাদের জন্যে আর নিরাপদ নয়। অনেকেই গেরিলা জীবন বেছে নিয়েছে আর সরকার কেএনএফ এর দাবির প্রতি সদিচ্ছা না থাকলে সশস্ত্র আন্দোলন ব্যাপক আকারে জোরদার হতে পারে।
এই পার্বত্য চট্টগ্রামে কুকি-চিন জনগোষ্ঠীদের জনসংখ্যা বিবর্তনের জন্যে দায়ী রাষ্ট্র! কুকি-চিন জনগোষ্ঠীদের অনগ্রসরতার জন্যেও দায়ী রাষ্ট্র! আজকের কুকি-চিন জনগোষ্ঠীর সমস্যা উদ্ভবের কারণও শাসকগোষ্ঠীই দায়ী থাকবে! তাই, দুঃসাহসিক যোদ্ধা জাতি কুকি জনগোষ্ঠীরা যে কতজন বর্তমানে আছে, সেই ছোট সংখ্যা নিয়েই তারা তাদের পৈতৃক ভিটা-জায়গা উদ্ধারের জন্যে সশস্ত্র সংগ্রাম করে যাচ্ছে এবং যাবেই। তাদের এ সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশ সরকার এগিয়ে না আসলে কুকি জনগোষ্ঠীরা তাদের সশস্ত্র শাখা নিয়ে রাষ্ট্র বাহিনীর সাথে নিয়মিত রক্তাক্ষয়ী সংঘর্ষ সংঘটাবে তা অনিবার্য। যে যুদ্ধটির ফলে উভয়পক্ষের কারোরই লাভবান হবেনা। বরং ক্ষতিগ্রস্ত হবে এ দেশ আর এ পাহাড়িয়া অঞ্চল।
গবেষণায় সুস্পষ্ট হয়ে উঠে, কুকি-চিন জনগোষ্ঠীদের সমস্যার সমাধানের একমাত্র উপায় অনগ্রসর ও বিলীয়মান কুকি জনগোষ্ঠীদেরকে এ অঞ্চলের মূল ভূমিপুত্র হিসেবে তাদের রাজনৈতিক দাবী শীঘ্রই মেনে নেয়া আর দেশ ও জাতি মঙ্গলের স্বার্থে কুকি-চিন স্বায়ত্তশাসিত টেরিটোরি প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে পাহাড়ে আবার শান্তি ফিরিয়ে আনা।
সংগ্রহীত পোস্ট