আব্দুল্লাহ আল মারুফ চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় জন্মনিবন্ধন ও তথ্য সংশোধনের নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং ব্যাপক অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। জন্মতারিখ বা বয়স সংশোধনের ক্ষেত্রে ২ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত উৎকোচ নেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ সংশোধনেও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। উপজেলা প্রশাসন-সংশ্লিষ্ট এই কার্যক্রমে সাতকানিয়া ভূমি কার্যালয়ের কম্পিউটার অপারেটর মুসার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণের চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।
সাতকানিয়ার ১৭টি ইউনিয়নের মধ্যে ৭ থেকে ৭টি ইউনিয়ন পরিষদ সূত্রে জানা যায়, জন্মনিবন্ধন সংশোধনের প্রতিটি আবেদনে অতিরিক্ত ৫০ টাকা এবং বয়স বা জন্মতারিখ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে খাতভেদে ২ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। টাকা পরিশোধ না করলে ফাইল আটকে রাখা, দীর্ঘসূত্রতা তৈরি এবং হয়রানির শিকার হতে হয় সেবাগ্রহীতাদের। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নাম ভাঙিয়ে চাপ প্রয়োগের অভিযোগও রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সচিব ও স্থানীয় সচেতন নাগরিক জানান, এ ধরনের অনিয়মে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, পাসপোর্ট তৈরি কিংবা জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের মতো জরুরি কাজে জন্মনিবন্ধন অপরিহার্য হওয়ায় বাধ্য হয়েই অনেকেই অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করছেন।
এওচিয়া ইউনিয়ন পরিষদ সচিব তিলক কান্তি দাশের কাছে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, তাঁর পরিষদের এক সেবাগ্রহীতার ফাইল জমা দিতে গেলে ৫ হাজার টাকার নিচে কাজ হবে না বলে সেটি ফেরত দেওয়া হয়। তবে মাদার্শা ইউনিয়ন পরিষদ সচিব রাকিবুল ইসলাম এ বিষয়ে মুখ খুলতে নারাজ হন এবং কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত কম্পিউটার অপারেটর মুসা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে উল্টো অভিযোগকারীর পরিচয় জানতে চান এবং প্রতিবেদককে তাঁর সাথে দেখা করতে বলেন।
অভিযোগের বিষয়ে সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাজীব দাশ পুরকায়স্থ জানান, অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার জন্য তিনি কাউকে কোনো ধরনের নির্দেশনা দেননি।
সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন-প্রশাসনিক ও সংবেদনশীল একটি সেবা কীভাবে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তার হাত থেকে একজন কম্পিউটার অপারেটরের নিয়ন্ত্রণে চলে গেল? কোন প্রশাসনিক আদেশে বা কার এখতিয়ারে মুসা এই অনুমোদন ও অর্থ লেনদেনের প্রক্রিয়ায় যুক্ত রয়েছেন, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্রেফ কারিগরি সহায়তার দায়িত্বে থাকা একজন কর্মীর এমন ক্ষমতাচর্চা প্রশাসনিক জবাবদিহিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
সার্বিক বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিয়ার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, জন্মনিবন্ধন একটি সরকার নির্ধারিত নাগরিক সেবা এবং এখানে অতিরিক্ত ফি আদায়ের কোনো সুযোগ নেই। সরকারি বিধিমালা ও জন্মনিবন্ধন আইন অনুযায়ী নির্ধারিত ফি ব্যতিরেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় বা অনিয়মের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট যেই হোক না কেন,তার বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃশ্যমান আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নাগরিক সেবা কোনো ব্যক্তিগত অনুগ্রহ নয়—তাই এ ধরনের অভিযোগের সুনির্দিষ্ট ও নিরপেক্ষ তদন্তপূর্বক দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।