আব্দুল্লাহ্ আল মারুফ চট্টগ্রাম।
নামে গবেষণা কেন্দ্র হলেও বাস্তবে সেখানে নেই কোনো গবেষণার কার্যক্রম। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অলস সময় কাটানোর সুযোগে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার কেঁওচিয়ায় বন গবেষণা কেন্দ্রের প্রায় ৬০০ একর পাহাড়ি ও সমতল ভূমি বেদখল হয়ে গেছে। প্রভাবশালী মহলের দখলবাজি, রোহিঙ্গাদের অবৈধ বসতি এবং নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের আখড়ায় পরিণত হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ এই সরকারি প্রতিষ্ঠানটি।জানা গেছে, সাতকানিয়ার কেঁওচিয়া বাইতুল ইজ্জত এলাকায় অবস্থিত বন গবেষণা কেন্দ্রের সিলভিকালচার রিসার্চ বিভাগের মোট আয়তন ১০৮৪ একর। কেঁওচিয়া থেকে পার্শ্ববর্তী ছদাহা ইউনিয়নের সাড়াশিয়া মৌজা পর্যন্ত বিস্তৃত এই গবেষণা কেন্দ্রটি বর্তমানে অভিভাবকশূন্য। ১০৮৪ একর জমির মধ্যে প্রায় ৬০০ একর জমি ইতিমধ্যে স্থানীয় প্রভাবশালী ও দখলদারদের কব্জায় চলে গেছে। এসব জমিতে গড়ে উঠেছে বসতবাড়ি, মাছের খামার, পোলট্রি ফার্মসহ নানা স্থাপনা। এমনকি দখলকৃত ভূমির দখলস্বত্ব হাতবদল ও বিক্রিরও অভিযোগ রয়েছে।স্থানীয়দের অভিযোগ, বিগত সরকারের আমলে কিছু অসাধু রাজনৈতিক নেতা ও বন বিভাগের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে সরকারি এই সম্পদ লুটে নেওয়া হয়েছে। হরিণতোয়া অংশসহ গবেষণা কেন্দ্রের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে রোহিঙ্গা বসতি। স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ ইসমাইল ও ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইসমাইল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বন বিভাগের লোকজনের চরম উদাসীনতা ও আঁতাতের কারণেই আজ এই পরিণতি হয়েছে। প্রশাসনিক কঠোর পদক্ষেপ ছাড়া এই সরকারি সম্পদ রক্ষা করা অসম্ভব।অনুসন্ধানে জানা যায়, হরিণতোয়া এলাকার তথাকথিত রোহিঙ্গা পাড়ার নেতা সানাউল্লাহ, দিল মুহাম্মদ ও ছিদ্দিকের বিরুদ্ধে মানব পাচার এবং ভুয়া তথ্য দিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরির গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এখান থেকে রোহিঙ্গারা দেশজুড়ে অপরাধমূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে এলাকাবাসীর আশঙ্কা। মূল ক্যাম্পাসেও দখলদারদের থাবা পড়েছে এবং অনেকে গোপনে নামজারিও করে ফেলেছেন।সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট (BFRI) চট্টগ্রামের পরিচালক মোহাম্মদ তারিফুল বারী বলেন, দালদারদের কোনোমতেই থামানো যাচ্ছে না। মূল ক্যাম্পাসেও দখলদাররা হানা দিয়েছে। জনবল সংকটের কারণে আমরা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। সরকারি জমি রক্ষার্থে স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতা খুবই জরুরি।কেঁওচিয়া বন গবেষণা কেন্দ্র সিলভিকালচার রিসার্চ বিভাগ বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তা মো: আনিছুর রহমান জানান, তারা যখনই এসব জবরদখলকৃত বনভূমি উদ্ধার করতে উদ্যোগী হন, তখনই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন ক্ষমতাসীন মহল থেকে তাদের কাছে ফোনকল আসে। তিনি আরও বলেন, ২০১৬ সালে কেঁওচিয়া বন গবেষণা চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই প্রায় ৩০০ একর জায়গা আমরা দখলে নিয়েছি। প্রয়োজনীয় জনবল ও লজিস্টিকের অভাব এবং প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপসহ বিভিন্ন কারণে তারা বন গবেষণা কেন্দ্রটি রক্ষা করতে কঠিন হচ্ছে।স্থানীয় সংবাদকর্মী বেলাল উদ্দিন মনে করেন, সরকারি এই বন সম্পদ রক্ষায় অবিলম্বে উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক তদন্ত এবং কঠোর উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা জরুরি।উল্লেখ্য, সারা দেশে বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের ২১টি গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে শুধু চট্টগ্রামেই রয়েছে ৬টি (সাতকানিয়ার কেঁওচিয়া, ফটিকছড়ির হাজারীখিল ও হেঁয়াকো, রাঙ্গুনিয়ার ইছামতি, মীরসরাইয়ের হিংগুলি এবং সীতাকুণ্ড)। বাকি ১৫টি কেন্দ্র দেশের অন্যান্য জেলায় অবস্থিত।সাতকানিয়ার সচেতন মহলের দাবি, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য কেঁওচিয়া বন গবেষণা কেন্দ্রের বেদখল হওয়া জায়গা উদ্ধার করে এবং রোহিঙ্গাদের বসবাড়ি উচ্ছেদ করে ক্যাম্পে পাঠিয়ে হোক।