আব্দুল্লাহ আল মারুফ,(চট্টগ্রাম)
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার চরতী ইউনিয়নে ৪০ হাজার টাকা পাওনাকে কেন্দ্র করে মারধর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইয়াবা কারবারের অপপ্রচার এবং পরবর্তীতে বালুর পয়েন্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনাকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে চরম উদ্বেগ ও ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটিকে স্রেফ ‘মাদক সংক্রান্ত বিরোধ’ হিসেবে প্রচারের চেষ্টা করা হলেও, অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে পুরোনো পাওনা টাকা, এলাকাভিত্তিক প্রভাব বিস্তার এবং লাভজনক বালুর পয়েন্ট দখলের মূল যোগসূত্র।বর্তমানে সংঘর্ষে আহত এক পক্ষ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকলেও, অপর পক্ষ বসতভিটা ও বিপুল পরিমাণ সম্পদ হারিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে রয়েছে।বৃহস্পতিবার ২২ অক্টোবর সকালে সরজমিনে পরিদর্শন গিয়ে স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ঘটনার সূচনা ঘটে গত ২০ অক্টোবর চরতী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের দরগাহ পাড়া সোনাইছড়ি এলাকায়। দুবাই প্রবাসী গিয়াসউদ্দিনের দাবি, একই এলাকার প্রবাসী সালমান আকবরের কাছে তাঁর প্রায় ৪০ হাজার টাকা পাওনা ছিল। সম্প্রতি সুইপুরা বাজারে গিয়াসউদ্দিন পাওনা টাকা চাইতে গেলে সালমান আকবর, রোহান ও তাঁদের সহযোগীরা তাঁর ওপর চড়াও হন এবং বেধড়ক মারধর করেন।পরদিন রাতে গিয়াসউদ্দিনের ছোট ভাই রিয়াজউদ্দিন সুইপুরা বাজারে গেলে তাঁকেও কাঠ ও কাঠের তক্তা দিয়ে বেধড়ক পেটানো হয়। মারধরের একপর্যায়ে তাঁকে পাশের একটি পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে তুলে বাজারের একটি বেঞ্চে বসিয়ে ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যেখানে রিয়াজকে ‘ইয়াবা কারবারি’ হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, তাঁদের অপদস্থ করতে এবং বালুর ব্যবসা হাতছানি দিতেই এই নাটক সাজানো হয়েছে।গিয়াসউদ্দিন ও রিয়াজউদ্দিন আতঙ্কে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেলে, তাঁদের পরিচালিত বালুর পয়েন্টে ডাম্পার নিয়ে জোরপূর্বক বালু তুলতে যান গিলমান আকবর ও তাঁর লোকজন। খবর পেয়ে রিয়াজউদ্দিন ঘটনাস্থলে পৌঁছালে উভয় পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা ও হাতাহাতি শুরু হয়। সংঘর্ষের একপর্যায়ে গিলমান আকবর গুরুতর আহত হন। তিনি বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সংঘর্ষকালে একটি গাড়িও ভাঙচুর করা হয়।স্থানীয়দের অভিযোগ, আহত গিলমান আকবর এর আগেও ইয়াবাসহ সাধারণ মানুষের হাতে আটক হয়েছিলেন, যার ভিডিও এখনো সামাজিক মাধ্যমে রয়েছে।সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। গিয়াসউদ্দিনের পরিবারের অভিযোগ, প্রতিপক্ষের লোকজন তাঁদের আনুমানিক ৫০ লক্ষ টাকা মূল্যের পানবরজ কেটে গুঁড়িয়ে দেয়, দুটি গরু লুট করে নিয়ে যায় এবং একটি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে তাঁদের সরাসরি দৃশ্যমান ১৪ থেকে ১৬ লাখ টাকার ক্ষতিসহ সর্বমোট ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি সাধন হয়েছে।অভিযোগের বিষয়ে ভুক্তভোগী গিয়াসউদ্দিন বলেন,পাওনা টাকা চাওয়াই আমাদের জন্য কাল হলো। তারা প্রভাবশালী হওয়ায় উল্টো আমাদের মাদক কারবারি বানিয়ে ভিডিও ছড়াল এবং আমাদের বালুর পয়েন্ট দখল করতে চাইল। এখন আমাদের বাড়িঘর ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে, আমরা ভয়ে আত্মগোপনে আছি।পরবর্তীতে রিয়াজউদ্দিনকে স্থানীয় কিছু লোক ধরে মারধর করে পুলিশে সোপর্দ করে। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মুমূর্ষু অবস্থায় রিয়াজকে উদ্ধার করে সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসার জন্য পাঠায়।পরে পরিস্থিতি অবনতি হলে হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক
তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের রেফার করে।সুইপুরা বাজারের এক ব্যবসায়ী বলেন, গিয়াসউদ্দিন ও রিয়াজউদ্দিনের সাথে সালমানদের ঝামেলা অনেক দিনের। সিসিটিভি ফুটেজ দেখলেই বোঝা যাবে বাজারে প্রথম কে কাকে মেরেছে। ভিডিও বানিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ছেড়ে দেওয়াটা একটা কৌশল ছিল।আরেক স্থানীয় অধিবাসী জানান, “গিলমান আকবরদের বিরুদ্ধেও এলাকায় জোর জবরদস্তির অভিযোগ আছে। এমনকি গিলমানকে অতীতে স্থানীয়রা ইয়াবাসহ ধরেছিল বলেও গুঞ্জন রয়েছে। উভয় পক্ষেরই আসল রহস্য নিরপেক্ষ তদন্তে বেরিয়ে আসবে।ঘটনার বিষয়ে স্থানীয় ৯ নম্বর ওয়ার্ডের গ্রাম পুলিশ আবদু ছবুর জানান, “টাকা-পয়সার লেনদেন এবং বালুর পয়েন্ট নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যেই দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এটি কেবল একতরফা মাদকের ঘটনা নয়। এলাকায় বালুর ব্যবসা ও প্রভাব খাটানো নিয়েই ঘটনাটি এতদূর গড়িয়েছে।চরতী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হানিফ চৌধুরী বলেন,ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। সুইপুরা বাজারে মারধর এবং বালুর পয়েন্টে সংঘর্ষের খবর পেয়ে আমি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিরপেক্ষ তদন্তের অনুরোধ জানিয়েছি। কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না। মাদকের কোনো সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা পুলিশ তদন্ত করে দেখবে।মামলার বাদী মোহাম্মদ হারুনের বক্তব্য নিতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।সাতকানিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরিফুল ইসলাম ছিদ্দিকী জানান,সুইপুরা বাজারের ঘটনা ও বালুর পয়েন্টে সংঘর্ষের বিষয়ে পুলিশ অবগত রয়েছে এবং এ নিয়ে মামলা দায়ের হয়েছে। সংঘর্ষে আহত একজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সিসিটিভি ফুটেজ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিও বিশ্লেষণ করে ঘটনার প্রকৃত সত্য উন্মোচন করা হবে। মামলার প্রথম আসামীকে স্থানীয়রা মারধর করে মুমূর্ষ অবস্থাযয় পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে,,অন্যায়ভাবে কারও ওপর হামলা বা সম্পত্তি নষ্টের ঘটনা ঘটলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, নিরপেক্ষ তদন্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমেই অপপ্রচারের পেছনের মূল উদ্দেশ্য এবং বালুর পয়েন্ট দখলের প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে।