আব্দুল্লাহ আল মারুফ, চট্টগ্রাম।
শারদীয় দুর্গোৎসবের আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে চান চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, দেশের প্রতিটি নাগরিক ও সম্প্রদায় যে পুরোপুরি নিরাপদে বসবাস করছে এবং স্বাধীনভাবে নিজেদের ধর্মীয় উৎসব পালন করছে—সেই বার্তাটিই এখন বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দিতে হবে।আজ সোমবার চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে আয়োজিত এক প্রস্তুতিমূলক ও আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক বিশেষ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক এসব কথা বলেন। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত এ সভায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং উৎসবের সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।উৎসবকে কেন্দ্র করে কোনো মহল যাতে গুজব বা অপপ্রচার চালিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাঁয়তারা করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার তাগিদ দেন জেলা প্রশাসক। তাঁর মতে, তুচ্ছ কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে কেউ যেন এই আনন্দঘন উৎসবকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে না পারে, সেদিকে প্রশাসন ও আয়োজক কমিটিগুলোকে সজাগ থাকতে হবে।জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পূজা উদ্যাপন কমিটি এবং স্বেচ্ছাসেবকদের যৌথ ও সমন্বিত প্রচেষ্টায় দুর্গোৎসব পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হবে। উৎসবের আনন্দ যেন কোনোভাবেই বিষাদে রূপ না নেয়, সে বিষয়েও তিনি সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।নতুন প্রজন্মের মাঝে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, উদারতা ও ঐতিহ্য ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর জোর দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের মনটাকে একটু বড় করতে হবে। আমরা যদি নিজেরা উদার না হই, তবে আমাদের আগামী প্রজন্ম কী শিখবে?’ শান্তিপূর্ণভাবে পূজা উদযাপনে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাসও দেন তিনি।সভায় চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম জানান, এবার চট্টগ্রাম মহানগরের বাইরে জেলাজুড়ে স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে মোট ২ হাজার ২৮৭টি পূজামণ্ডপে পূজা উদযাপিত হবে। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৮০০টি মণ্ডপের প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হবে।আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি রোধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন পুলিশ সুপার। তিনি জানান, বিভ্রান্তিকর বা উসকানিমূলক কোনো তথ্য ছড়ানো হলে তা কঠোর হাতে দমন করা হবে এবং এ বিষয়ে পুলিশের সাইবার ইউনিট সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখবে। কোনো বিভ্রান্তি ছড়ালে পূজা কমিটিগুলোকে দ্রুত সত্য তথ্য সামনে আনার আহ্বান জানান তিনি।প্রতিটি পূজামণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবকদের রোস্টার ভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টন এবং তাদের সহজে শনাক্তকরণের জন্য নির্দিষ্ট পোশাক, কটি বা আর্মব্যান্ড ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকদের তালিকা ও মোবাইল নম্বর স্থানীয় থানায় জমা দিতে হবে।প্রতিমা পরিবহন থেকে শুরু করে বিসর্জন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। সম্ভব হলে দিনের আলোতেই প্রতিমা মণ্ডপে আনা এবং সূর্যাস্তের আগেই বিসর্জন পর্ব শেষ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।বিসর্জন ঘাটগুলোতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া বিসর্জনে ব্যবহৃত যানবাহনের ফিটনেস এবং চালকদের শারীরিক সক্ষমতা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। মণ্ডপ স্থাপন বা জায়গা-জমি সংক্রান্ত কোনো পুরনো বিরোধ থাকলে তা পূজার আগেই স্থানীয়ভাবে মিটিয়ে ফেলার তাগিদ দেওয়া হয়।জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সভায় বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।