দাবি পরিশোধে সাময়িক স্বস্তি এলেও ভবিষ্যৎ দায় এড়াতে দীর্ঘমেয়াদি অ্যাকচুয়ারিয়াল পরিকল্পনা ও কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।
কলমে মোঃ জসিম উদ্দিন।বাংলাদেশের বীমা খাত দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া দাবি, দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও আস্থার সংকটে ভুগছে। এই পরিস্থিতিতে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলো অত্যন্ত সময়োপযোগী। তবে শুধু তাৎক্ষণিক দাবি পরিশোধ নয়, বরং খাতের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় গভীর কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।
বর্তমান উদ্যোগ এবং কিছু মৌলিক প্রশ্ন:
আইডিআরএ প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার বকেয়া দাবি পরিশোধের যে অগ্রাধিকার দিয়েছে, তা প্রশংসনীয়। এরই মধ্যে কয়েকটি সমস্যাগ্রস্ত জীবনবীমা প্রতিষ্ঠানের ৩৭ কোটি টাকার বেশি দাবি পরিশোধ করা হয়েছে। তবে অ্যাকচুয়ারিয়াল (বীমা-গণিত) দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্ন হলো-আজকের দাবি মেটাতে গিয়ে কোম্পানির সম্পদ বা ট্রেজারি বন্ড নগদায়ন করা হলে তা ভবিষ্যতের দায় (Policyholder Liability) পূরণের সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে কি না। সম্পদ বিক্রির এই পদক্ষেপটি কোনো পূর্ণাঙ্গ পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার (Recovery Plan) অংশ হওয়া উচিত, নিজে থেকেই যেন পুরো পরিকল্পনা হয়ে না দাঁড়ায়।
নতুন ব্যবসা স্থগিতের প্রভাব ও তারল্য সংকট:
সমস্যাগ্রস্ত কোম্পানির নতুন ব্যবসা সাময়িক স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত আসতেই পারে। তবে এর ফলে কোম্পানির নির্দিষ্ট পরিচালনা ব্যয় (Fixed Cost) ও কর্মীদের বেতন চালু থাকলেও প্রিমিয়াম প্রবাহ কমে যেতে পারে। তাই পাঁচ, দশ ও পনেরো বছরের প্রক্ষিপ্ত নগদ প্রবাহ (Projected Cash Flow) এবং সলভেন্সি বা সচ্ছলতা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি, যাতে আজকের সমাধান আগামী দিনের নতুন সংকটে রূপ না নেয়।
কোম্পানিভেদে তিন ধরনের পৃথক কৌশল:
সব সমস্যাগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান এক নয়। তাই নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে তিনটি আলাদা পথ অনুসরণ করা উচিত:
পুনরুদ্ধার (Recovery): মৌলিকভাবে সক্ষম কিন্তু সাময়িক সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দেওয়া।পুনর্গঠন (Restructuring): প্রাতিষ্ঠানিক শাসন ও আর্থিক কাঠামো পরিবর্তন করা।সুশৃঙ্খল সমাধান (Orderly Resolution): দীর্ঘমেয়াদে টেকসই না হলে গ্রাহকের স্বার্থ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সম্পদ ও দায়ের সুশৃঙ্খল নিষ্পত্তি করা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভিজ্ঞতার আদলে বিশেষ সহায়তা:বাংলাদেশ ব্যাংকের তারল্য সহায়তা ও মুনাফার মডেল থেকে শিক্ষা নিয়ে বীমা খাতের জন্যও একটি পৃথক ‘ইনস্যুরেন্স রিকভারি অ্যান্ড লিকুইডিটি ফ্যাসিলিটি’ গঠন করা যেতে পারে। আইডিআরএর তত্ত্বাবধানে শর্তসাপেক্ষ ও সুদযুক্ত এই ঋণ সহায়তা কেবল যাচাইকৃত দাবি পরিশোধ এবং মৌলিকভাবে পুনরুদ্ধারযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাঁচাতে ব্যবহার করা যেতে পারে, যা কোনো নিঃশর্ত বেলআউট (Unconditional Bailout) হবে না।
তথ্যের স্বচ্ছতা এবং ডিজিটাল সংস্কার:
আইডিআরএর ‘ডাবল সার্ভার’ বন্ধ করা, ইউনিক পলিসি আইডি এবং রিক্স-বেসড সুপারভিশন চালুর উদ্যোগ অত্যন্ত কার্যকর পদক্ষেপ। সঠিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নির্ভরযোগ্য মূল্যায়ন এবং সুষম তদারকি নিশ্চিত করতে পারলে তবেই খাতের সুশাসন ফিরবে।
উপসংশেষ:বীমা ব্যবসা মূলত ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতির ব্যবসা। তাই শুধু বর্তমানের বকেয়া দাবি পরিশোধ করে আগুন নেভানোই যথেষ্ট নয়; ভবিষ্যতে যেন আর আগুন না লাগে, সে জন্য একটি টেকসই নিয়ন্ত্রক পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। গ্রাহকের স্বার্থ সুরক্ষা এবং খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাই হোক বর্তমান সংস্কারের মূল লক্ষ্য।
লেখক: মাস্টার অব অ্যাকচুয়ারিয়াল সায়েন্স (এমএএস), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; বীমা খাতের পেশাজীবী।