আব্দুল্লাহ আল মারুফ নিজস্ব প্রতিবেদক।। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো তথ্য পাওয়ার পর তা যাচাই না করে বিশ্বাস কিংবা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানানো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তিনি বলেছেন, ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের ভিত্তিতে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া প্রকাশের ফলে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠী গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস উপলক্ষে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ‘ডিজিটাল যুগে সঠিক তথ্য নিশ্চিতকরণ: অপতথ্য রোধে তথ্য অধিকারের ভূমিকা’ শীর্ষক এই সভার আয়োজন করা হয়।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শরীফ উদ্দিনের সভাপতিত্বে সভায় জেলা প্রশাসক বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো তথ্য ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই এর সত্যতা যাচাই না করেই অন্ধভাবে বিশ্বাস করেন। বিশেষ করে নেতিবাচক তথ্য দ্রুত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অথচ তথ্যটি ভুল প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সামাজিক ও পারিবারিকভাবে অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়ে।
তথ্য শেয়ার বা মন্তব্য করার আগে ভাবার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানাতে এক সেকেন্ড লাগে। কিন্তু বাস্তব চিত্র কী, তথ্যটি সঠিক কি না এবং সেই প্রতিক্রিয়ায় কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না-এসব আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে।’
তথ্য যাচাইয়ের ওপর জোর দিয়ে মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা আরও বলেন, ভুল তথ্যের ভিত্তিতে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা পাল্টা প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিতে পারে। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রীয় ও গোষ্ঠীগত স্বার্থে তথ্য অপব্যবহারের বহু উদাহরণ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ডিজিটাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে তথ্য যাচাইয়ের গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে।
সরকারি কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রসঙ্গ টেনে জেলা প্রশাসক বলেন, ডিজিটাল যুগে কোনো কিছু আড়াল করে রাখার সুযোগ দিন দিন কমে আসছে। তাই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। পরিবেশ যেমন পরিষ্কার রাখতে হবে, তেমনি নিজের কাজকর্মও পরিষ্কার রাখতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার গোপনীয়তা রক্ষার পাশাপাশি জনগণের অধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, আইন ও নীতিমালা অনুযায়ী নিরাপত্তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোপনীয় তথ্য সুরক্ষিত রাখতে হবে; অন্যদিকে জনগণের অধিকার, নিরাপত্তা ও স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত তথ্যে নাগরিকদের অবাধ প্রবেশাধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। একটি স্বচ্ছ সমাজ প্রতিষ্ঠায় সরকারি কর্মকর্তা ও নাগরিক-উভয় পক্ষকেই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে জেলা প্রশাসক বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ ও পক্ষপাতের প্রভাব কমাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও নজরদারিতে প্রযুক্তির ব্যবহার এর বড় উদাহরণ। এরই ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে এআইনির্ভর ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তবে প্রযুক্তির ব্যবহার যতই বাড়ুক না কেন, মানুষের বিবেক, প্রজ্ঞা ও মানবিক মূল্যবোধের কোনো বিকল্প নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানুষ যদি আইন অনুযায়ী ও পক্ষপাতহীনভাবে দায়িত্ব পালন করে, তবে প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার প্রয়োজন কমে আসে। একে অপরকে দোষারোপ না করে মানুষের অধিকার, নিরাপত্তা ও শান্তি নিশ্চিত করার দিকে মনযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তথ্য গ্রহণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেকোনো প্রতিক্রিয়া জানানোর ক্ষেত্রে আবেগ বা অন্ধ অনুসরণের পরিবর্তে যুক্তি, বিবেক ও বিচারবোধ প্রয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক।