আবদুর রাজ্জাক।। বিদ্যুৎ, গ্যাস, শিক্ষা ও খাদ্য—একটি দেশের মানুষের স্বাভাবিক ও নিরাপদ জীবনযাপনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চারটি মৌলিক খাত। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই চারটি খাতেই আজ নানা ধরনের সংকট, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ সামনে আসছে। তীব্র লোডশেডিং, গ্যাসের সংকট, শিক্ষাব্যবস্থায় নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং লাগামহীন নিত্যপণ্যের বাজার—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এতগুলো মৌলিক খাতে একসঙ্গে সংকট তৈরি হওয়ার পেছনে কারণ কী? সংকট মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কতটা কার্যকর? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—জনগণের দুর্ভোগের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিতা কোথায়?
## ১৮ ঘণ্টার লোডশেডিং: অন্ধকারে গ্রাম ও মফস্বল
দেশের বিভিন্ন গ্রাম ও মফস্বল এলাকায় বিদ্যুৎ সংকট মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। কোথাও কোথাও দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ উঠছে। তীব্র গরমের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন।
বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব শুধু ঘরবাড়িতে সীমাবদ্ধ নয়। কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, শিল্প-কারখানা এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও এর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিংকে কেন্দ্র করে জনঅসন্তোষ বাড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
যদি বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমে যায় এবং বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়, তাহলে বিষয়টি নিছক বিদ্যুৎ সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ থাকে না। এটি তখন ব্যবস্থাপনা ও জনআস্থার সংকটে পরিণত হয়।
প্রশ্ন হলো—বিদ্যুৎ খাতের এই পরিস্থিতি কেন আগে থেকে অনুমান করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলো না? সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কোথায়?
## দিকনির্দেশনাহীন শিক্ষাব্যবস্থা: অনিশ্চয়তায় শিক্ষার্থী-অভিভাবক
একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। অথচ শিক্ষাক্ষেত্রে বারবার নীতি পরিবর্তন, মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অস্পষ্টতা শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করছে।
কারিকুলাম ও মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে যখন বারবার পরিবর্তন আসে, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষার্থীরা। একজন শিক্ষার্থী কীভাবে প্রস্তুতি নেবে, কোন পদ্ধতিতে মূল্যায়িত হবে এবং তার ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবন কোন পথে এগোবে—এসব বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি।
শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সেই পরিবর্তন হতে হবে গবেষণাভিত্তিক, পরিকল্পিত এবং দীর্ঘমেয়াদি। বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন কিংবা পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া নতুন ব্যবস্থা চালু করলে তার নেতিবাচক প্রভাব পুরো প্রজন্মের ওপর পড়তে পারে।
তাই শিক্ষানীতির ক্ষেত্রে প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট ও স্থিতিশীল রোডম্যাপ—যেখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং পরিবর্তনের আগে যথাযথ প্রস্তুতি নিশ্চিত করা হবে।
## চুলায় গ্যাস নেই, কিন্তু বিল দিতে হচ্ছে নিয়মিত
গ্যাস সংকট এখন অনেক পরিবারের দৈনন্দিন দুর্ভোগের অন্যতম কারণ। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় রান্নাবান্না ব্যাহত হচ্ছে। বাধ্য হয়ে অনেক পরিবারকে এলপিজি সিলিন্ডার কিংবা অন্য বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে।
এর ফলে একই পরিবারের ওপর দ্বৈত আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে। একদিকে নিয়মিত গ্যাস বিল দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে গ্যাস না পাওয়ায় বিকল্প জ্বালানি কিনতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
একজন ভোক্তা যখন নিয়মিত বিল পরিশোধ করছেন, তখন তার স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা থাকে—তিনি নিয়মিত ও মানসম্মত সেবা পাবেন। সেবা নিশ্চিত না হলে সেই সেবার মান, বিল কাঠামো এবং ভোক্তা অধিকার নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
গ্যাস সরবরাহের ঘাটতির পেছনে যদি উৎপাদন, আমদানি, বিতরণ বা অবকাঠামোগত কোনো সমস্যা থাকে, তাহলে জনগণকে তার পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন। সংকটের কারণ গোপন না করে সমাধানের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রকাশ করাও জরুরি।
## আকাশছোঁয়া বাজারদর: খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটের পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। চাল, ডাল, তেলসহ প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ।
একটি পরিবারের আয় যখন ক্রমবর্ধমান খাদ্য ব্যয়ের পেছনে চলে যায়, তখন শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান কিংবা সঞ্চয়ের মতো অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় কমাতে হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি শুধু পারিবারিক অর্থনীতির ওপর নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বাজারে কোনো পণ্যের দাম বাড়ার পেছনে আন্তর্জাতিক বাজার, উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন ব্যয়, সরবরাহ ব্যবস্থা কিংবা মৌসুমি প্রভাব থাকতে পারে। কিন্তু অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি, কৃত্রিম সংকট কিংবা বাজারে অসাধু কারসাজির অভিযোগ থাকলে তা কঠোরভাবে তদন্ত করা দরকার।
বাজার নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত ও কার্যকর তদারকি, সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করা এখন অত্যন্ত জরুরি।
## সংকট চারদিকে, তাহলে জবাবদিহিতা কোথায়?
বিদ্যুৎ সংকট কেন দীর্ঘায়িত হচ্ছে? গ্যাস সরবরাহে সমস্যার স্থায়ী সমাধান কোথায়? শিক্ষাব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা ফিরবে কবে? নিত্যপণ্যের বাজারে সাধারণ মানুষের স্বস্তি নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা কোথায়?
এসব প্রশ্নের উত্তর জনগণের জানার অধিকার রয়েছে।
সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার দায়িত্ব শুধু সংকটের সময় বক্তব্য দেওয়া নয়; সংকট তৈরি হওয়ার আগেই তা চিহ্নিত করা, প্রস্তুতি নেওয়া এবং কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করাও তাদের দায়িত্ব।
জনগণ যখন বিদ্যুৎ, গ্যাস, শিক্ষা ও খাদ্যের মতো মৌলিক বিষয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে, তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নীরবতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। প্রয়োজন স্বচ্ছ তথ্য, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা এবং দৃশ্যমান জবাবদিহিতা।
## জনগণের স্বস্তিই হোক রাষ্ট্র পরিচালনার মূল লক্ষ্য
একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু বড় অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করা যায় না। একজন সাধারণ মানুষ তার ঘরে নিয়মিত বিদ্যুৎ পাচ্ছেন কি না, রান্নার জন্য গ্যাস পাচ্ছেন কি না, সন্তানের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারছেন কি না এবং পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য কিনতে পারছেন কি না—এসবও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
তাই বর্তমান সংকটগুলোকে বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবে না দেখে সমন্বিতভাবে মোকাবিলা করা প্রয়োজন। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং সর্বোপরি জবাবদিহিতা।
জনগণের কষ্টকে পরিসংখ্যানের আড়ালে না রেখে বাস্তবতার আলোকে সমাধান করতে হবে। কারণ রাষ্ট্রের সকল পরিকল্পনা ও নীতির চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের জীবনকে সহজ, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ করা।
জনগণ প্রশ্ন করছে—সংকটের সমাধান কবে?
আর সেই প্রশ্নের জবাব এখন দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষকেই দিতে হবে।