আব্দুল্লাহ আল মারুফ চট্টগ্রাম।। দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে বিনা বেতনে দেশের অজপাড়াগাঁয়ে কোমলমতি শিশুদের পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন বাদ পড়া ৫০০০ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ২০ হাজার শিক্ষক। দীর্ঘদিন ধরে মানবেতর জীবনযাপন করা এই শিক্ষকসমাজ ও বিদ্যালয়গুলোকে দ্রুত জাতীয়করণের আওতায় আনার জোরালো দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব সাদ্দাম হোসেন রুহান মন্ডল বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বঞ্চনার ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা:
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাদ পড়া এই ৫০০০ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৫৩৪টি বিদ্যালয় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নামে প্রতিষ্ঠিত। অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক বৈষম্যের শিকার হয়ে এই প্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয়করণ থেকে বাদ পড়েছিল।
তিন পার্বত্য জেলা ও ছিটমহল এলাকাসহ এসব বিদ্যালয়ে বর্তমানে প্রায় ৮ লক্ষাধিক শিশু পড়াশোনা করছে। তবে সরকারি সুযোগ-সুবিধার বাইরে থাকায় এসব এলাকার শিশুরা উপবৃত্তি বা মিড-ডে মিলের মতো সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে বিদ্যালয়গুলো আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিয়মিত প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। এছাড়া ২০১২ সালের ২৭ মের পূর্বে এসব বিদ্যালয়ের নামে জমি রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয়েছে।
যোগ্যতা ও দীর্ঘ আন্দোলন: এই ৫০০০ বিদ্যালয়ের প্রায় প্রতিটি শিক্ষক অনার্স, মাস্টার্স বা ডিগ্রি পাস করা অত্যন্ত মেধাবী ও শিক্ষিত। নিজেদের পেশাগত স্বীকৃতি ও বঞ্চনা ঘুচাতে ২০১৭ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত তারা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ও সংগ্রাম চালিয়ে আসছেন।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশের প্রতিটি জেলায় গড়ে ৭৯টি করে বিদ্যালয় জাতীয়করণের আওতায় আসার কথা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেও আন্দোলন ও নানা ধাপ পেরিয়ে গত ২০২৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে ৫০০০ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের চিঠি ইস্যু করা হয়। পরবর্তীতে ২৮ ফেব্রুয়ারি একটি কনসালটেশন কমিটি গঠিত হয় এবং মাঠ পর্যায়ে ১১টি জেলা ও উপজেলায় যাচাই-বাছাই শেষে এই ৫০০০ বিদ্যালয়ের সত্যতা পাওয়া যায়।
শিক্ষকদের মানবেতর জীবনযাপন:
দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে বেতন-ভাতা না পাওয়ায় এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা চরম অর্থনৈতিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। সংসার চালাতে কেউ বাধ্য হয়ে টিউশনি করছেন, কেউ অটো রিক্সা চালাচ্ছেন, আবার কেউ রাতে পার্টটাইম সিকিউরিটি গার্ডের কাজ করছেন। অর্থের অভাবে তারা অসুস্থ বাবা-মার চিকিৎসা করাতে পারছেন না এবং সন্তানদের ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়াতে ব্যর্থ হচ্ছেন।
ইতিমধ্যে বিনা বেতনে চাকরি করতে করতে অনেক শিক্ষক অর্থাভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন। আবার অনেকেই বিনা বেতনে অবসরে গেছেন। বয়সের শেষ প্রান্তে এসে এই শিক্ষকগণ অন্য কোনো পেশায় যাওয়ার সুযোগও হারাচ্ছেন।
সরকারের প্রতি আকুল আবেদন: বর্তমান সরকারের কাছে শিক্ষক সমাজের আকুল আবেদন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নামে প্রতিষ্ঠিত ৫৩৪টি বিদ্যালয়সহ দেশের এই ৫০০০ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ২০ হাজার শিক্ষকের চাকরি দ্রুত জাতীয়করণ করা হোক। এর মাধ্যমে শিক্ষক পরিবারগুলোর দুই মুঠো ডাল-ভাতের ব্যবস্থা হবে এবং সমাজে শিক্ষকতার মতো মহান পেশা নিয়ে তারা সম্মানের সাথে বেঁচে থাকতে পারবেন।